বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ভাষা হিসেবে বাংলার কথা যে আমরা ভাবতে পারি নাই, এমনকি আজকাল যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলায় উচ্চশিক্ষার কোনো প্রস্তাবকে ক্ষতিকর ভাবা হয়, তার এক কারণ আমাদের ঔপনিবেশিক অতীত। উপনিবেশে ‘জ্ঞান’ আসে ওপার থেকে; মনস্তাত্ত্বিকভাবে উপনিবেশিত মানুষ জ্ঞানের উৎপাদক হিসেবে নিজেদের ভাবতে পারে না এবং মনিবের জ্ঞান রপ্ত করতে পারাকেই সাফল্যের পরাকাষ্ঠা ভাবে। ইতিহাস পরিষ্কার সাক্ষ্য দিচ্ছে, উনিশ শতকের কলকাতায় এ ঘটনাই ঘটেছিল; আর ভারতের অন্য জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে শিক্ষা-প্রক্রিয়ার দিক থেকে বাংলা অঞ্চলের বেশ কতকটা ফারাক ছিল। তবু বলতেই হবে, ভারত ইংরেজি ভাষাকে অবলম্বন করে উচ্চশিক্ষায় বেশ অনেক দূর সফল হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষদের জন্য ভারতের উদাহরণ ভালো রকম মায়া বা ঘোর তৈরি করেছে।

কেন একই ঔপনিবেশিক অতীতের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ভারত ইংরেজি ভাষায় উচ্চশিক্ষার বন্দোবস্ত করে অনেকটাই সফল হলো, আর বাংলাদেশ সে সাফল্য পেল না, তার নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জরুরি। আপাতত আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গে দুটো কথা বলে রাখা দরকার। এক. ভারতের সাফল্যের ধরন জাপান বা চীনের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেখানে পুরো ব্যাপারটা উচ্চবর্ণ ও উচ্চশ্রেণির মামলা; এবং ভারতের আধুনিকায়ন বা উচ্চশিক্ষার বিস্তার তাদের বড়জোর তিরিশ কোটি মানুষকে স্পর্শ করতে পেরেছে। জীবনযাপনগত সর্বজনীন সূচকে ভারত যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেশ তলানিতে থাকে, তার পেছনে তাদের শিক্ষা ও ভাষা-পরিস্থিতির ভূমিকা কী, তা মূল্যায়নের সময় এসেছে। দুই. ভাষা-পরিস্থিতির দিক থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আদতে কোনো তুলনাই চলে না।

বিজ্ঞাপন

বাংলায় উচ্চশিক্ষার বন্দোবস্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের দ্বিধা ও অনীহার দ্বিতীয় কারণ, জ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রের যে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক, আমাদের জ্ঞানচর্চায় তার কোনো প্রতিফলন ঘটে নাই। সোজা কথায়, আমরা বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কাজকর্ম চালানোর প্রয়োজনে জ্ঞানচর্চায় ঢুকি নাই। বাংলাদেশের যেকোনো শিক্ষানির্ভর প্রকল্পে, যেমন সেতুর কাজ, খনির কাজ, নদীশাসন, উৎপাদন, প্রযুক্তি ইত্যাদি যেকোনো খাতে একরাশ বিদেশির নাম পাওয়া যায়। দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরনের কাজকর্মের উপযোগী জনশক্তি তৈরি করছে, তার কোনো আলামত বাস্তব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।

ওগুলো অবশ্য অনেক বড় ব্যাপার। যে মিনি করপোরেট ধাঁচের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা নিম্ন-মাঝারি উৎপাদনকেন্দ্রগুলো আমাদের দেশে আছে, পরিসংখ্যান বলছে, সেগুলো চালানোর পরিচালনাগত বা প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েটও আমাদের উচ্চশিক্ষা থেকে পয়দা হয় না। এসব কাজের জন্যও দেদার বিদেশি আমদানি করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণ ও রাষ্ট্রচালনা এবং সমাজ-অধ্যয়নের ব্যাপারগুলো আমাদের পক্ষ থেকে দেখভাল করছে বিশ্বব্যাংক বা অনুরূপ অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান। তার মানেই হলো, আমরা আসলে জ্ঞান-উৎপাদনের কাজ শুরুই করি নাই। কাজেই উচ্চশিক্ষার ভাষার প্রসঙ্গটি ‘উন্নত’ জাতিগুলোর মতো করে ভাবতে হয় নাই।

দুনিয়ার উন্নত দেশগুলো জাতীয় ভাষায় উচ্চশিক্ষার বন্দোবস্ত করেছে; আর আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রধানত ইংরেজিকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। আমরা সেই উন্নতির নামেই জাতীয় ভাষা বাদ দিয়ে ইংরেজিকে অবিকল্প করে তুলেছি। এখন সময় এসেছে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লাভক্ষতির হিসাবনিকাশ করার। এত এত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ভাষায় পড়াশোনার পরেও জগতের উদ্ভাবনী ক্ষমতার তালিকায় আমরা কেন তলানিতে, আর কেনই–বা এমনকি ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে সক্ষমতার দিক থেকেও আমরা একেবারে নিচের সারিতে, তা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা দরকার।

অনেকেই মনে করেন, উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহারের জন্য বাংলা ভাষার যথেষ্ট প্রস্তুতি নাই। প্রয়োজনীয় পরিভাষা নাই। প্রথম কথাটা ডাহা মিথ্যা। বাংলা কেবল দুনিয়ার বিপুল পরিমাণ মানুষের ভাষাই নয়, সব ধরনের কাজে ব্যবহৃত হবার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভাষা। আর পরিভাষার অজুহাত তোলা স্রেফ পদ্ধতিগত অজ্ঞানতার পরিচায়ক। অনেকেরই ধারণা, পরিভাষা ‘অনুবাদ’ করে, বইপুস্তক লিখে, তারপর কাজে নামতে হবে। এ ধারণার বশেই আমাদের একাডেমিগুলো বিপুলসংখ্যক ‘বাংলা পরিভাষা’ তৈরি করে পুস্তক ছাপিয়ে সেগুলোকে গুদামজাত করেছে। এ ধারণাটা আমাদের জ্ঞানজগতে এতটা প্রতাপশালী হয়েছে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে। উপনিবেশে অনুবাদকেই জ্ঞান ভাবা হয়। আর সে কারণেই বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা পরিভাষা প্রণয়নের প্রধান দায়িত্ব পালন করেছেন। আদতে বাংলা-জ্ঞানের সাথে বাংলা পরিভাষার সম্পর্ক অতি গৌণ। পরিভাষা মোটেই ভাষার ব্যাপার নয়, বিষয় বা ডিসিপ্লিনের ব্যাপার। আর পরিভাষা রচনা করবেন সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনের চর্চাকারীরা। তা–ও আগে পরিভাষা নির্মাণ করে পরে চর্চা শুরু করারও কোনো ব্যাপার নাই। বরং চর্চার মধ্য দিয়েই পরিভাষা তৈরি হতে থাকবে। একই সাথে অনুবাদও হবে চর্চার অংশ হিসেবে। পরিভাষা ও অনুবাদের দোহাই দিয়ে উচ্চশিক্ষায় বাংলা চালুর বিরোধিতা করা কুসংস্কার মাত্র। তত্ত্ব বা অনুমান বাদ দিয়ে অন্য সফল ভাষাগুলোর উদাহরণ বিশ্লেষণ করলেই কথাটা বোঝা যাবে।

আমাদের সমস্যা আসলে আরও গোড়ায়। আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেই জাতীয় ভাষাকে শিক্ষার বাইরে রেখে দিয়েছি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় আমাদের দরকার সর্বজনীনভাবে জাতীয় ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা, আর দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখানোর পর্যাপ্ত বন্দোবস্ত করা। তাহলে উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় ভাষার কুশলী ব্যবহার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই আমরা জাতীয় ভাষায় সৃষ্টিশীল ও মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার দেখা পাব। যাদেরকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে ঈর্ষা করে করে আমরা দিন গুজরান করি, উন্নতির নামে তাদের অবলম্বিত পথের অনুসরণ না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন