বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ মৌলিক স্যানিটেশনের সুবিধা পেত ২০১৫ সালে। ৫ বছর পর এসে তা দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশে। গত ৫ বছরে এ খাতে পাকিস্তান, নেপাল ও ভারত—এই তিন দেশের অগ্রগতি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ৫ বছর আগে পাকিস্তানের ৫৯ শতাংশ মানুষ এ সেবার মধ্যে ছিল। ৫ বছর পর তা দাঁড়ায় ৬৮ শতাংশে। নেপালে ১৮ শতাংশ বেড়ে মৌলিক স্যানিটেশনের কভারেজ দাঁড়িয়েছে ৭৭ ভাগে। ভারতে মৌলিক স্যানিটেশন ৫ বছর আগের চেয়ে ১৪ ভাগ বেড়ে ৭১ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান। দেশটির জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ মৌলিক স্যানিটেশন-সুবিধা পাচ্ছে।

জেএমপি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ২২ শতাংশ মানুষ এখনো অনুন্নত শৌচাগার ব্যবহার করে। স্বাস্থ্যের উন্নয়নে একে একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে এ হার যথাক্রমে ২, ৩ ও ১৪ শতাংশ।

নীতিনির্ধারক মহল এক ধরনের পরিসংখ্যান নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। এই আত্মতৃপ্তি যে অমূলক, তা জেএমপির এ প্রতিবেদন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
হোসেন জিল্লুর রহমান, অর্থনীতিবিদ

নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্যানিটেশনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গত ৫ বছরে উল্লেখ করার মতো তেমন উন্নতি করেনি। বাংলাদেশে নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবহারের হার ৩৯ শতাংশ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো এগিয়েছে জোর কদমে। ভারত ৫ বছরে ৩৬ থেকে ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে। নেপালের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবহারের সুযোগ পায়।

সুপেয় পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে। এ হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।

কিন্তু মলের জীবাণু, আর্সেনিক ও অন্যান্য দূষণমুক্ত নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও পাইপের মাধ্যমে সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে। পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ হওয়া পানিকে বেশি নিরাপদ এবং শহরের নাগরিক সুবিধার অংশ বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ পাইপের পানি পায়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এ ক্ষেত্রে নেপালের অগ্রগতি বাংলাদেশের চেয়ে তিন গুণ, ৫০ শতাংশ। ভারতে এ হার ৪৪ আর পাকিস্তানের ২৬ শতাংশ। ২২ শতাংশ নিয়ে আফগানিস্তানের বর্তমান হারও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের গ্রামের মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ সরবরাহের পানি পায়। শহরে এ হার ৩৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপালের গ্রামাঞ্চলে সরবরাহের পানি প্রাপ্তির হার সবচেয়ে বেশি। দেশটির ৪৯ শতাংশ মানুষ সরবরাহের আওতায় আছে। ভারতের গ্রামে এ হার ৩২ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৫ শতাংশ।

পানিবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ মনে করেন, পানি ও স্যানিটেশন খাতে কিছু অগ্রগতির পর এর গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে ওয়াশ খাতে (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) তেমন জোর দেওয়া হয়নি।

সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থার মতো স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে পাকিস্তান। দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষ এ সুবিধা পায়। ভারত ও নেপালে এ হার ৬৮ ও ৬২ শতাংশ। বাংলাদেশের গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। গ্রামাঞ্চলের মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যবিধির সুবিধা পায়। ভারত ও নেপালে এ হার ৬০ ও ৫৯ শতাংশ। পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশি, ৭৪ শতাংশ।

কয়েক বছর ধরে বাজেটে পানি ও স্যানিটেশন খাতের বরাদ্দ নিয়ে গবেষণা করছেন অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘নীতিনির্ধারক মহল এক ধরনের পরিসংখ্যান নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। এই আত্মতৃপ্তি যে অমূলক, তা জেএমপির এ প্রতিবেদন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।’

মাসিক ব্যবস্থাপনায় ভালো খবর

নারীদের মাসিক ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা ও অবকাঠামোর দিক থেকেও বাংলাদেশ ও নেপাল প্রায় একই অবস্থানে আছে। তবে বৈশ্বিক এই প্রতিবেদনে ২৩০টি দেশ পানি ও স্যানিটেশন-বিষয়ক উপাত্ত দিলেও মাসিক ব্যবস্থাপনার তথ্য-উপাত্ত মাত্র ৪১টি দেশ দিতে পেরেছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে মাসিক ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সব তথ্য দিতে পেরেছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন