উৎসবের কেন্দ্রগুলো দুর্দশায়

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪টি কমিউনিটি সেন্টার এখন মানুষের ব্যবহারের বাইরে। চালু আছে ১৯টি। সেগুলোর কয়েকটির জায়গা দখল করেছে সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন

আবর্জনায় ভরা মেঝে। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বেচারাম দেউড়ির মৌলভী বাজার কমি​উনিটি সেন্টারের চিত্র l সাজিদ হোসেন
আবর্জনায় ভরা মেঝে। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বেচারাম দেউড়ির মৌলভী বাজার কমি​উনিটি সেন্টারের চিত্র l সাজিদ হোসেন

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩টি কমিউনিটি সেন্টার আছে। কম ভাড়ার এই সেন্টারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এলাকাবাসী ব্যবহার করতে পারছে না। কয়েকটিতে পুলিশের থানা, র‍্যাব বা করপোরেশনের দপ্তর। কয়েকটি বন্ধ। এদিকে চালু সেন্টারগুলোর বেশির ভাগে দখলের দৌরাত্ম্য, হালও খারাপ।
দুটি কমিউনিটি সেন্টারের পুরোটা আর তিনটির আংশিক জায়গাজুড়ে পুলিশের থানা আছে। দুটি সেন্টারজুড়ে আছে র‍্যাবের কার্যালয় আর তিনটিজুড়ে চলছে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়। দুটি সেন্টার জরাজীর্ণ হয়ে বন্ধ আছে। আরও চারটি বন্ধ নির্মাণ বা সংস্কারকাজের জন্য। একটি সেন্টার এক যুগেও চালু করা হয়নি। এভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) হিসাবে, মোট ১৪টি সেন্টার এখন মানুষের ব্যবহারের বাইরে।
চালু আছে ১৯টি সেন্টার। সেগুলোর বেশ কয়েকটিতে জায়গা দখল করেছে সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন। আর খোদ করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, লোকবল ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি আছে।
এলাকার লোকজন বিভিন্ন সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালনের জন্য এসব কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিতে পারেন। ভাড়া দিনের বেলার জন্য ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা, রাতের বেলার জন্য ৫০০ টাকা করে ভাড়া বাড়ে।
এ ছাড়া ডিএসসিসির তিনটি মিলনায়তন আছে। যার একটি (ব্রিটিশ আমলের নর্থব্রুক হল) আপাতত বন্ধ। এগুলোর ভাড়া ১০ থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে দক্ষিণেই কমিউনিটি সেন্টারের সংখ্যা বেশি। বেশির ভাগ অনেক পুরোনো ভবন। বিভিন্ন এলাকায় বন্ধ ও চালু ২১টি সেন্টার ঘুরে এগুলোর বেহাল অবস্থা দেখা যায়।
পুলিশ-র‍্যাবের ব্যবহার
পুলিশ ও র‍্যাব মাসিক ভাড়ায় সাতটি কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করছে। ওয়ারী থানা ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে হাজী আব্দুর রহীম কমিউনিটি সেন্টারের তৃতীয় তলার একাংশ ও চতুর্থ তলা ভাড়া নিয়ে চলছে। করপোরেশন থানাকে মাসে প্রায় ৮৮ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছে। এখন নিচতলা ও দোতলার একাংশ আর ছাদ থানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ওয়ারীর এই কমিউনিটি সেন্টারের গেটের সামনে পুলিশের দুটি গাড়ি আর অনেকগুলো মোটরসাইকেল। এক চিলতে উঠোনে পুলিশের জব্দ করা ১০-১২টি মোটরসাইকেল। প্রবেশপথে ইতস্তত রাখা আরও কয়েকটি মোটরসাইকেল। একতলার হলঘরে পৌঁছতে হয় এসব পেরিয়ে। দুজনকে ভেজা কাপড়ে হল পার হতে দেখা গেল। দারোয়ান বললেন, তাঁরা আনসার সদস্য, দ্বিতীয় তলায় থাকেন।
ওয়ারী থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. আলীম হোসেন শিকদার প্রথম আলোকে বলেন, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে থানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যতটুকু ব্যবহার করি, ততটুকু স্কয়ার ফিট হিসেবে ভাড়া দিই।’
তবে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, থানা বিনা ভাড়ায় বাড়তি জায়গা ব্যবহার করছে। জায়গাগুলো ব্যবহার না করার জন্য তাগাদা দিয়ে চারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।
সেন্টারটির তত্ত্বাবধায়ক নুরুল ইসলাম খান বলছেন, থানা বসার আগে এখানে মাসে ২০টির বেশি সামাজিক অনুষ্ঠান হতো। এখন অনুষ্ঠান হয় ১০টিরও কম। সেন্টারের আয় কমে গেছে।
ফজলুল করিম কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় বংশাল থানা। ভাড়া মাসে ৯০ হাজার টাকা। যে দুটি সেন্টারের সম্পূর্ণ ভবন ভাড়া নিয়ে থানা চলছে, তার একটি সেন্ট্রাল রোড-সংলগ্ন ভূতের গলি কমিউনিটি সেন্টার। তিনতলা ভবনটি সংস্কারের পর মাসিক প্রায় ৬০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছে কলাবাগান থানা।
পল্টন কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় গত রোজার ঈদের পর থেকে পুলিশের কিছু সদস্য থাকছেন৷ তৃতীয় তলায় কমিউনিটি সেন্টার। সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার জন্য পল্টন মডেল থানায় বাড়তি পুলিশ রাখা হয়েছে। এখানে পুলিশের ওই সদস্যরা সাময়িকভাবে থাকছেন৷’
নয়াপল্টনের অধিবাসী মাহমুদুল হক পাঁচ বছর আগে পল্টন সেন্টারে ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করেছিলেন। তিনি বলছেন, এখন জায়গাটা অপরিষ্কার থাকে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয়। এর চেয়ে বেসরকারি সেন্টারগুলো ভালো।
২০০৭ সাল থেকে টিকাটুলীতে রাজধানী মার্কেটের পেছনে মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ কমিউনিটি সেন্টারের পুরো ভবনটিজুড়ে চলছে র‍্যাব-৩-এর কার্যালয়। অপারেশনস অফিসার আবদুল করিম বললেন, র‍্যাব-৩ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে এখানে অফিস চালাচ্ছে। তাঁর কথা, র‍্যাব জনস্বার্থেই কমিউনিটি সেন্টারটি ব্যবহার করছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তালিকায় এখনো এটি কমিউনিটি সেন্টার। করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলছেন, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত র‍্যাব-৩ সেন্টারটির ভাড়া বাবদ মাসে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩০৫ টাকা দিত৷ গত জানুয়ারিতে করপোরেশন ভাড়া বাড়িয়ে মাসিক ৫ লাখ টাকার কিছু বেশিতে এক বছর মেয়াদি নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেয়। তবে সে চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি। ভাড়াও বকেয়া আছে।
ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন বলছেন, কমিউনিটি সেন্টারগুলো র‍্যাব-থানা বা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য নয়। এলাকার নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষজন এগুলো ব্যবহার করে। নাগরিক বাড়ছে, চাহিদাও বাড়ছে। তবে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থারও প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন, ‘এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। তারা যাতে নিজের জায়গায় ফিরে যেতে পারে, সে ব্যাপারে আলাপ করছি।’
দখলের দৌরাত্ম্য: কমিউনিটি সেন্টারগুলোর মোট ২০টিতে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিস আছে। এগুলো বৈধ বরাদ্দ৷ তবে অনেকগুলোতে কাউন্সিলরের অফিসের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী বা সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনও নিয়মিত বসার জায়গা করে নিয়েছে। এর জন্য তারা করপোরেশনকে কোনো ভাড়া দেয় না৷
মৌলভীবাজার কমিউনিটি সেন্টারটিতে খোদ আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড অফিস। সেন্টারের বাইরের দেয়ালের গায়ে সংগঠনের নাম ঝুলছে।
যাত্রাবাড়ীর চন্দনকোঠা পঞ্চায়েত কমিউনিটি সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক বললেন, গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর থেকে সেন্টারে যুবলীগের একটি কার্যালয় চলছে। তাঁর মতে, এ কারণে এলাকাবাসী সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য সেন্টারটি ব্যবহার করতে উৎসাহ পায় না।
সেগুনবাগিচা মাল্টিপারপাস কমিউনিটি সেন্টারের ভবনটি তৈরি হওয়ার পর এক যুগ পেরিয়েছে। পাঁচতলা ভবনটির চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় কমিউনিটি সেন্টার হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো চালু হয়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে, বাণিজ্যিক গ্যাস-সংযোগের অভাবে সেন্টারটি খোলা যাচ্ছে না। এখানে তৃতীয় তলায় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসের পাশে বড় ঘরটিতে কয়েকজন যুবক আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাঁরা বললেন, এটা যুবলীগের স্থানীয় কার্যালয়।
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ বললেন, কমিউনিটি সেন্টারের জায়গায় রাজনৈতিক দলের অফিস বা কার্যক্রম চালানো অবৈধ। অন্যদিকে বিবিধ কাজে ভাড়া দেওয়ায় এমন সেন্টার করার উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। তিনি আরও বললেন, নতুন করে থানা বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না।
সুযোগ-সুবিধা কম: আফিরউদ্দিন সরদার কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় মুগদা থানা। নিচতলায় সেন্টারের হলঘর। তত্ত্বাবধায়ক শহীদুল ইসলাম বলেন, সেন্টারের কাজ কোনোরকমে চলছে। মানুষ ভাড়া নেয় কম। এলাকার একজন গৃহিণী বলেন, তাঁরা এখন বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো বাড়ির ছাদেই করে থাকেন। তা ছাড়া মানুষ বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টার বেশি ব্যবহার করে। সেগুলোর ভাড়া বেশি, তবে করপোরেশনের সেন্টারের তুলনায় সেগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সুযোগ-সুবিধাও বেশি।
সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টারের প্রবেশপথটি অপরিষ্কার৷ উঠানে কিছু মোটরসাইকেল রাখা৷ সেন্টারে অবস্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসের একজন কর্মচারী বললেন, ‘এগুলো এলাকাবাসীর মোটরসাইকেল৷ সরাতে বলার উপায় নেই৷’ দ্বিতীয় তলায় এক কোনায় ভাঙা চেয়ার আর ময়লা কাপড়ের স্তূপ। তাঁর মতে, সেন্টারটি মানুষ ভাড়া নেয়, তবে আগের চেয়ে কম।
যাত্রাবাড়ীর ধলপুর কমিউনিটি সেন্টার ও চন্দনকোঠা পঞ্চায়েত কমিউনিটি সেন্টার দুটিতে দারোয়ান ও তত্ত্বাবধায়কেরা বললেন, ইদানীং সামাজিক অনুষ্ঠান কমই হয়। ভূতের গলির কমিউনিটি সেন্টারটি একসময় সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো। ঝুঁকিপূর্ণ বলে ভবনটি পরিত্যক্ত হয়। তারপর আট বছর আগে সংস্কার করে কলাবাগান থানা এ ভবন ভাড়া নেয়। এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হোসেন হায়দার বলছেন, আগামী বছর ভবনটি ভেঙে ছয়তলা কমিউনিটি সেন্টার তৈরি হবে এবং তখন থানা থাকবে না।
ডিএসসিসির চলতি বছরের বাজেটে কমিউনিটি সেন্টারের জন্য ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মেয়র সাঈদ খোকন প্রথম আলোকে বলেন, নাগরিকদের মধ্যে সেন্টারগুলোর চাহিদা আছে। মন্ত্রণালয় ছয়টি নতুন ও আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তিনি আশা করছেন, এক মাসের মধ্যে প্রস্তাব পাস হয়ে যাবে। তবে নির্মাণকাজ শেষ হয়ে সেন্টার শুরু হতে চার বছর লেগে যাবে।
সেন্টারগুলো দেখভাল করে ডিএসসিসি সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক বিভাগ। এ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা শফিউল আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, সেন্টারগুলোর মানোন্নয়নের চেষ্টা চলছে। আরেকজন কর্মকর্তা বলছেন, বাজেটে সেন্টারের খাতে বরাদ্দটি যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া সেন্টার ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত লোকবল নেই।
পুরান ঢাকার মহল্লাপ্রধানদের ঐতিহ্যবাহী এক পরিবারের সদস্য এবং ঢাকা কেন্দ্রর পরিচালক আজিম বখ্শ সরদার বলছেন, ব্যবস্থাপনা অবশ্যই ভালো করতে হবে। তবে করপোরেশন একা পারবে না, স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
ধূপখোলা রোডের বাসিন্দা আশরাফুল আলম বলছেন, এলাকাভেদে বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি। মানসম্মত হলে নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নাগরিকেরা অবশ্যই সিটি করপোরেশনের সেন্টারগুলো ভাড়া নিতে আগ্রহী হবে৷
আজিম বখ্শ বলেন, কমিউনিটি সেন্টারগুলো সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য করা। এখন বিয়েশাদি ছাড়া অন্যকিছু হয় না, তাতেও মানুষ স্বস্তি পায় না। তাঁর মতে, সেন্টারগুলো কোনো সংস্থাকে মাস ভিত্তিতে ভাড়া দেওয়া উচিত না। তা ছাড়া, মহল্লাবাসীর খেলাধুলা ও মেলামেশার জায়গা রেখে এগুলো নির্মাণ করা দরকার।