জন্মকথা
একটি অবিশ্বাস্য রূপকথা
লেখক–সংগঠক মফিদুল হক বললেন, পত্রিকার নাম হতে পারে ‘প্রথম’। পরে এ প্রস্তাবের কথা শুনে আরেক লেখক–সংগঠক আবুল মোমেন ‘প্রথম’ শব্দটির পরে যুক্ত করলেন ‘আলো’।
এ যেন এক রূপকথা। প্রথম আলো যেভাবে শুরু হলো, ধীরে ধীরে অবয়ব পেল এবং আজকের জায়গায় এসে পৌঁছাল—পেছন ফিরে তাকালে বাস্তবের চেয়ে রূপকথাই মনে হয় বেশি। এই পত্রিকার ধারণা ও কল্পনা, অসম্ভব দূরদৃষ্টিপূর্ণ ও প্রতিভাবান কিছু মানুষের সংযোগ, অকল্পনীয় শত জোগাড়–যন্তর আর একঝাঁক মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রম একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছিল কী এক শুভক্ষণে। তবু সব সাফল্য কি আর হাতে গুনে গুনে অঙ্ক করে বলা যায়? কিছু অধরা মায়াবী অলৌকিকের স্পর্শও হয়তো কোথাও রয়ে গেছে।
মাস মনে নেই। ১৯৯৮ সালের জুন বা জুলাই হবে। মতি ভাই—আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমান বললেন, ‘নতুন একটি পত্রিকা করার উদ্যোগ নেব নাকি আবার—যে রকম পত্রিকা করার স্বপ্ন আমরা দেখি?’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের পতনের পর সংবাদপত্রের ঘটনা নতুন খাতে বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কোনো কারণ না দেখিয়েই পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করার কালো আইনটি সাংবাদিকদের দাবির মুখে বাতিল করেছে সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আসন্ন গণতন্ত্রের ভোরে তরুণ পেশাজীবী সাংবাদিকদের মনে সত্যিই অনেক আশার স্বপ্ন। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত নতুন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার উসকে দিয়েছে সে আশাকে। কিন্তু এরপর নতুন উদ্যোগ যেমন হয়েছে, সেসব হোঁচট খাওয়ার ঘটনাও কম ঘটেনি। মতিউর রহমানের প্রস্তাব তাই একই সঙ্গে আশা ও শঙ্কার দোলাচল নিয়ে এল।
সাক্ষাতে সব শঙ্কা মুহূর্তে মুছে দিয়েছিলেন লতিফুর রহমান, ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান, প্রথম আলোর প্রধান বিনিয়োগকারী। বলেছিলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতাই হবে নতুন পত্রিকার প্রধান শক্তি। তবে এ স্বাধীনতার প্রধান সুরক্ষা হবে পত্রিকাটির ব্যবসায়িক সফলতা। নতুন এ পত্রিকাকে হতে হবে দেশের শীর্ষতম দৈনিক। তিনি বললেন, ‘বিজয়ী অশ্বকে কে বিরক্ত করতে চায়, বলুন?’
সম্পাদকীয় স্বাধীনতা? বাংলাদেশের পত্রিকার জগতে এটাই তো রূপকথা। বাংলাদেশের জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাসে পত্রপত্রিকার ভূমিকা আলোতে লেখার মতো। স্বাধীনতার আগে উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলোও সে সংগ্রামে লিপ্ত। কিন্তু স্বাধীনতা–উত্তর সময়ের দাবি তো একটি বস্তুনিষ্ঠ ও দলনিরপেক্ষ পত্রিকা। একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো দেশে, নিষ্প্রভ হলো সে বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধু সপরিবার নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর সে বাস্তবতা ডুবে গেল দেড় দশকের সামরিক শাসনের অন্ধকারে।
যাহোক, শুরু হয়ে গেল নতুন পত্রিকার আয়োজন। সে কী উন্মাদনাভরা সময়!
নতুন পত্রিকার নাম কী হবে? প্রথম ঠিক হলো ‘দৈনিক একুশে’। এই নামে প্যাড ছাপিয়ে নিয়োগপত্রও দেওয়া হলো বেশ কিছু। অচিরেই জানা গেল নতুন একটি টেলিভিশন আসছে একুশে নামে। আবার নতুন নামের খোঁজ। নাম তো আর পাওয়া যায় না। লেখক–সংগঠক মফিদুল হক বললেন, পত্রিকার নাম হতে পারে ‘প্রথম’। সিঙ্গাপুরভিত্তিক পত্রিকা দ্য ফার্স্ট তাঁর মাথায় থেকে থাকবে হয়তো। পরে এ প্রস্তাবের কথা শুনে আরেক লেখক–সংগঠক আবুল মোমেন ‘প্রথম’ শব্দটির পরে যুক্ত করলেন ‘আলো’। ‘প্রথম আলো’ নামটি অনেকেই পছন্দ করলেন। কারও মনে আবার ঘোর সংশয়। শুরুতে সংশয়ীদের সংখ্যাই বোধ করি বেশি ছিল। প্রথম আলো, এ–ও কি হতে পারে কোনো পত্রিকার নাম? কিন্তু সেটাই হলো এবং সব শঙ্কা দূর করে দেশজুড়ে দিনে দিনে আদৃতও হয়ে উঠল কেমন!
নতুন পত্রিকা শুরুর আগে পরিকল্পনার ও কাজের যেন কোনো শেষ নেই। কত পৃষ্ঠার হবে পত্রিকা? তত দিনে রঙের দাবিও চলে এসেছে—রঙিন পাতার বরাদ্দ হবে কয় পাতা? পরিকল্পনা চলল মূল পত্রিকার সঙ্গে প্রতিদিনই ফিচার ক্রোড়পত্র দেওয়ার—পরিবারের সবাইকেই কিছু না কিছু তো দিতে হবে। এসব ব্যাপারে আমাদের ভাবনা ছিল অতি সতর্ক ও রক্ষণশীল। লতিফুর রহমান অভয় দিয়ে বললেন যা দরকার হয়, সেভাবেই ভাবতে। স্বপ্ন সংকুচিত রেখে তো দেশের শীর্ষতম পত্রিকা করা যাবে না।
আরও এল এর পরিবেশনার দিক। নতুন পত্রিকার মাস্টহেড, পৃষ্ঠাসজ্জা, নানা রকমের লোগো। সে নিয়ে অবশ্য আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কারণ, সঙ্গে আছেন এসব বিষয়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম রূপকার শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। কত যে অভিনব সজ্জা–পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এলেন। পুরু ও বলিষ্ঠ লিপিতে তৈরি করে নিয়ে এলেন প্রথম আলোর মাস্টহেড। তার ওপরে বসানো পাঁচটি মোটা রেখার রশ্মি বিচ্ছুরিত দিনের প্রথম সূর্যের এক সহজ রূপায়ণ। তখন কি ভাবা গিয়েছিল, সূর্যের এই রূপই সবার কাছে হয়ে উঠবে প্রথম আলোর অবিকল্প পরিচয়চিহ্ন?
কাইয়ুম চৌধুরী নিজের কল্পনা উজাড় করে দিয়েছিলেন। পৃষ্ঠাসজ্জায় কত যে নতুন নতুন চিন্তা! প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামের ওপরের অংশ গাঢ় নীল থেকে হালকা হতে হতে নেমে গেছে নিচে। এখানে যাবে ছোট ছোট লঘু সংবাদ। ভেতরের একেক পাতা স্বাভাবিকভাবেই একেক বিষয়ে বরাদ্দ। সেগুলোর সৃজন–পরিকল্পনাও অভিনব। প্রতি পাতায় বরাদ্দ বিভাগগুলোর নাম তিনি চলতি রীতিতে পৃষ্ঠার শিরোদেশে দেননি। দিয়েছেন প্রথম কলামের ওপরের অনেকটা অংশজুড়ে, বিভাগের নাম উল্লম্ব করে সাজিয়ে। নানা পরিবর্তনের ধারায় সে পৃষ্ঠাসজ্জা এখন পাল্টেছে। কিন্তু সেটাই তো অভিনব সূচনা।
আরও কত কিছু যে এল! ছোট এই লেখায় সব ধরাও যাবে না। নতুন পত্রিকার নতুন চেহারার জন্য দরকার নতুন ফন্ট। প্রথম আলোর নামে নাম মিলিয়ে তৈরি হলো ‘আলো’ নামে সেই ফন্ট। তৈরি করে দিল কম্পিউটার ভিলেজ। অনলাইন তথ্যমাধ্যমের ধারণা, অন্তত বাংলাদেশে, তখনো দিগন্তরেখার ওপারে। কিন্তু সম্পাদক মতিউর রহমানকে কে যেন এর অস্পষ্ট ধারণাটি দিতেই লুফে নিলেন তিনি। না, পত্রিকার প্রথম দিন থেকেই শুরু হতে হবে অনলাইনে প্রথম আলোর তথ্য বিতরণ। এ রকম কত কী!
১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলো নামে নতুন যে পত্রিকাটি আলোর মুখ দেখল, তার প্রস্তুতি ছিল এক মাসের সামান্য কিছু বেশি। আইসিবিএ ভবনের দোতলার ছোট্ট পরিসরে, মাত্র ১০৫ জন কর্মী নিয়ে।
মনে পড়ছে, পত্রিকা প্রকাশের এক মাস আগে, ৩ অক্টোবর, আইসিবিএ ভবনের ছাদের মিলনায়তনে একটি প্রীতি সম্মিলনীর আয়োজন করা হয়েছিল। বিকেল থেকে সন্ধ্যা। কে না এসেছিলেন সেখানে! দেশের নানা ক্ষেত্রের নক্ষত্র–সমাবেশ ঘটে গিয়েছিল সেদিন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রগতিশীল ভাবুক সরদার ফজলুল করিম, কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মুজিবুল হক, সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমান, সাংবাদিক এবিএম মূসা, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সৈয়দ আলী কবীর, অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক, সংগীতশিল্পী নিলুফার ইয়াসমীন। কে নয়? নাম বলে শেষ করা যাবে না।
১৯৯৮ সালের ২০ অক্টোবর থেকে পত্রিকা প্রকাশের আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন একটানা ছাপানো শুরু হলো প্রথম আলোর ডামি কপি। আস্তে আস্তে দিন চলে এল। প্রথম পত্রিকা ছাপানো হবে কোথায়? শুধু প্রথম দিনটাতেই নয়, ট্রান্সকমের নিজস্ব ছাপাখানা হওয়ার আগপর্যন্ত দীর্ঘদিন এ বিড়ম্বনা ছিল প্রথম আলোর নিত্যসঙ্গী। কত জায়গাতেই না ছাপানো হয়েছে এ পত্রিকা—জনকণ্ঠ, বাংলাবাজার, মুক্তকণ্ঠ, আল মুজাদ্দেদ, ডায়ালগ ইত্যাদি পত্রিকার ছাপাখানায়। পত্রিকার ছাপার সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তিন–চারটি ছাপাখানাতেও একযোগে কাজ চলেছে।
তবে প্রথম সংখ্যাটি ছাপা হয়েছিল জনকণ্ঠ পত্রিকার প্রেসে। ছাপা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কপি। মধ্যরাতে ছাপাখানায় উৎসুকদের মধ্যে উত্তেজনা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন লতিফুর রহমান, শাহনাজ রহমান, কাইয়ুম চৌধুরী ও মতিউর রহমান। সাক্ষী হতে গিয়েছিলেন অসামান্য ব্যক্তিগত আবেগ ও ঐতিহাসিক ক্ষণের।
তখন কে জানত, সেদিন যে পত্রিকাটির জন্ম হয়েছিল, ভবিষ্যতে সেটি বাংলাদেশের সংবাদক্ষেত্রের বহু মাইলফলক পার হয়ে যাবে? শুধু পার হয়ে যাবে না, সৃষ্টিও করবে? এ পত্রিকাই একদিন ইতিহাস সৃষ্টি করল আকাশচুম্বী সংখ্যার পাঠকের। দেড় কোটির বেশি ফেসবুক অনুসারী নিয়ে ঢুকে গেল বিশ্বের প্রথম ১০ সংবাদমাধ্যমের তালিকায়।
অ্যাসিড–সন্ত্রাসের শিকার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এক দিনের বেতন দিয়ে তহবিল গড়েছিলেন প্রথম আলোর সাংবাদিকেরা। কালেক্রমে বিচিত্র পথে ছুটল তার কার্যক্রম—মাদকবিরোধী তৎপরতায়, অসহায় মানুষের ত্রাণে, দরিদ্র মেধাবীদের শিক্ষাবৃত্তিতে, স্কুল প্রতিষ্ঠায়। রূপ নিল প্রথম আলো ট্রাস্ট। প্রথম আলোর তরুণ, রুচিমান ও উদ্যমী পাঠকেরা দেশজুড়ে গড়ে তুলল বন্ধুসভা। লিপ্ত হলো সাংস্কৃতিক ও মানবিক সহায়তাধর্মী উদ্যোগে।
বিপুল আকারে ছড়িয়ে পড়ল প্রথম আলোর শিক্ষা, শিল্প ও বিনোদনধর্মী কর্মকাণ্ডও। সারা দেশের তরুণ মেধাবীদের নিয়ে গণিত অলিম্পিয়াড, মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কার, ভাষা প্রতিযোগ, নানা স্তরের বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বর্ষসেরা বই, বর্ণমেলা—আরও কত কী!
দৈনিক পত্রিকার বাইরেও বাঁধ ভাঙল প্রকাশনার। বেরোল কিশোরদের মাসিকপত্র কিশোর আলো, মাসিক বিজ্ঞানপত্র বিজ্ঞানচিন্তা, পেশাজীবনে প্রবেশের সহযোগী পত্রিকা চলতি ঘটনা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তামূলক ত্রৈমাসিক পত্র প্রতিচিন্তা। প্রতিটি পত্রিকারই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও পাঠকবৃত্ত, প্রতিটিই সফল।
আর প্রথমা প্রকাশন তো এল, দেখল, জয় করল। ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু। এরই মধ্যে এর অর্জন ৬২০টি বই আর ৪৩টি শ্লাঘা করার মতো পুরস্কার। তবে তার চেয়েও বড় অর্জন লেখক ও পাঠকের অনাবিল আস্থা।
কিন্তু সেসব তো অন্য রূপকথার গল্প। সে গল্প হবে অন্য কোনো দিন।
সাজ্জাদ শরিফ প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক