default-image

এ সময় আমাদের স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন মন্দিরের কর্মী অপু ধর। ঋষিধাম দেখতে এসেছি শুনে তিনি প্রীত হলেন। বললেন, গুরুদেব এখন প্রার্থনায় মগ্ন। একটু পর তাঁর সঙ্গে কথা বলা যাবে। আমি বললাম, চলুন এই ফাঁকে আমরা একটু চারদিক দেখে নিই। প্রায় ৩২ একর জায়গাজুড়ে ঋষিধাম। এর সবটা এক বেলায় ঘোরা সম্ভব নয়। এই মন্দিরের একপাশজুড়ে রয়েছে জঙ্গল কোকদণ্ডী পাহাড়। পাহাড়টি ঢেকে আছে বনাঞ্চলে। একসময় বিচিত্র সব বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল এখানে। সহজে বেড়ে উঠত দুর্লভ সব গাছপালা। একসময়ের গভীর এই অরণ্যে এখন মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে। অবৈধ দখলও আছে। বনভূমি কমতে শুরু করেছে। ঋষিধাম যেন সেই ক্ষয়িষ্ণু বনভূমির স্মৃতি ধরে রাখতে তার চারপাশটা নিবিড় করে রেখেছে গাছপালায়। লোকমুখে শোনা যায়, একসময় এখানে চন্দনগাছও ছিল। ১৯৭১ সালে রাজাকারেরা সেগুলো কেটে নিয়ে যায়। এখনো রয়েছে বহু প্রাচীন গাছ।

ঋষিধামের মূল ভবন ও এর চারপাশের অন্যান্য স্থাপনার সৌন্দর্য, চারপাশের চোখজুড়ানো প্রকৃতির জন্য শুধু মানুষ এখানে আসে না। এই মন্দিরের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এখানে তিন বছর পরপর কুম্ভমেলা হয়। সেই মেলায় সারা দেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা স্নান করেন এখানে। তখন হাজারো মানুষের মিলনে এক অপূর্ব দৃশ্যের সূচনা হয় বাঁশখালীতে। মানুষের আনাগোনা চলে দিনরাত। মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। কোথাও চলে যোগাসন শিক্ষা। মন্দিরে ঢোকার মুখে পাশের মাঠে চলে মেলা। মেলায় চলে বেচাকেনা। নাগরদোলায় চলে শিশুদের উচ্ছ্বাস। মাঠের একদিকে চলে প্রসাদ বিতরণ।

পুরো এলাকারই চেহারা পাল্টে যায়। দেশি মানুষের ভিড়ে দেখা যায় দেশ-বিদেশ থেকে আসা সন্ন্যাসীদের। চারপাশের গ্রামেও উৎসবের আবহ নিয়ে আসে এই কুম্ভমেলা। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের আর কোথাও এ রকম কুম্ভমেলা হয় না। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র কুম্ভস্নানের স্থান। সমগ্র ভারতবর্ষেও মাত্র চারটি স্থানে এই মেলা হয়। সেখানকার হরিদ্বার, প্রয়াগ, নাসিক ও উজ্জয়িনীতে প্রতি তিন বছর পরপর কুম্ভমেলাও প্রচুর লোকসমাগম হয়। সে হিসাবে কুম্ভস্নানের একমাত্র স্থান হিসেবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের কোকদণ্ডী গ্রামের প্রায় ৭০ বছর বয়সী ঋষিধামের গুরুত্ব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অপরিসীম। একইভাবে কৌতূহলী পর্যটকের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজ থেকে ৭৫ বছর আগে কোকদণ্ডীর ঘন অরণ্যের পাশে মোহন্ত অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ নামের এক ঋষি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তখনকার দিনে ভারতের চারটি বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে কুম্ভস্নানে তীর্থে যাওয়া কঠিন ছিল। যাঁরা সেই তীর্থে যেতে পারতেন না, মূলত তাঁদের জন্যই তিনি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিন বছর পরপর ভারতের কুম্ভমেলাগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে মাঘ মাসের ত্রয়োদশী তিথিতে ঋষিধামে কুম্ভমেলা বসে।

অপু ধরের সঙ্গে মন্দির এলাকার বড় বড় গাছ, বিশাল বিশাল বাঁশঝাড়ের ভেতর এগিয়ে যেতে যেতে দেখলাম তরুছায়ার নিচে স্বচ্ছ জলে ভরা তিন তিনটি দিঘি। ঠাকুরমার দিঘি, মধুকুম্ভ দিঘি ও দধিকুম্ভ দিঘি। দুই একর আয়তনের ঠাকুরমার দিঘিতেই হয় পুণ্যস্নান। ঠাকুরমার দিঘির পাড়ে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশ দেখছিলাম, তখনো বাতাসে ভাসছিল কোকিলের গানের সুর। অপু বললেন, এখন কত শান্ত-নির্জন। বনের পাখির ডাকও ভেসে আসে। অথচ কুম্ভস্নানের সময় এই এলাকা হাজারো পুণ্যার্থীর পদচারণে মুখর থাকে।

ঘোরাঘুরির পর আমরা মন্দিরের ভেতরে ঢুকি। তখন ঋষিধামের বর্তমান মোহন্ত স্বামী সুদর্শনানন্দ পুরী মহারাজের প্রার্থনা শেষ। তিনি আমাদের পরম আদরে অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি বলেন, এখানে এসে মানুষ সাধুসঙ্গ লাভ করে, আধ্যাত্মিক কথা শোনে, তীর্থের জলধারায় অবগাহন করে। তাঁর অমৃতকথায় আমরা মোহিত হলাম। মনে হলো অশান্ত পৃথিবীর মধ্যে এক টুকরা শান্তি যেন থির হয়ে আছে ঠাকুরমার দিঘির পাড়ে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন