default-image

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে আছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারীর কথা। ইতিহাস বিচারে সংকলনটি নানা দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে। প্রকাশ পাওয়ার পরপরই সংকলনটি বাজেয়াপ্ত করেছিল বাঙালির জাতিসত্তাবিরোধী পাকিস্তান সরকার। এ সংকলনের সম্পাদক ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকাশ করেছিলেন পুঁথিপত্র প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সুলতান। তাঁর সহযোগী হিসেবে ছিলেন এম আর আখতার মুকুল। অবশ্য সংকলনের কোথাও তাঁর নাম ছিল না।

হাসান হাফিজুর রহমান আর মোহাম্মদ সুলতান—দুজনই ছিলেন এ দেশের বামপন্থী প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রথম সারির সক্রিয় যোদ্ধা। উল্লেখ্য, পুঁথিপত্র প্রকাশনীর কার্যালয়টি বই প্রকাশনার দোকানমাত্র ছিল না, ছিল বামপন্থী নেতা-কর্মীদের প্রায় দিন-রাতের মিলন ও মন্ত্রণাস্থল। প্রায় সর্বক্ষণই এটি থাকত পুলিশের গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারিতে। সংকলনটি ছাপা হয়েছিল পুরান ঢাকার পাইওনিয়ার প্রেস থেকে, কঠোর গোপনীয়তার ভেতর দিয়ে। এই প্রেসের তখনকার কর্ণধার এম এ মুকিতও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে বামপন্থার অনুসারী ছিলেন। তাঁর এই প্রেস থেকেই আরেকটি বিখ্যাত রম্য-ব্যঙ্গ সাময়িকী অগত্যা ছাপা হতো। অগত্যার সম্পাদক ছিলেন ফজলে লোহানী।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সেই ঐতিহাসিক সংকলনের প্রচ্ছদপট এঁকেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। রেখাঙ্কন করেছিলেন মুর্তজা বশীর ও অন্যান্য। এই ‘অন্যান্য’ আর কেউ নন, প্রখ্যাত শিল্পী বিজন চৌধুরী। পাকিস্তানের তখনকার বৈরী ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে শিল্পী বিজন চৌধুরীর নাম প্রিন্টার্স লাইনে উল্লেখ করা হয়নি বেশ ভাবনাচিন্তা করেই। যুক্তফ্রন্ট সরকার ১৯৫৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংকলনটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। তা–ও দুই বছর পর, অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে। তখন আবার সেটিকে প্রকাশ করা হয়েছিল নতুন উদ্যমে।

বিজ্ঞাপন

একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনটি দুটি কারণে আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার অঙ্গীভূত অংশ। প্রথমত, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম সাহসী সাহিত্যিক স্মরণিকা, যাতে স্থান পেয়েছিল সেই আন্দোলনভিত্তিক রিপোর্টাজ, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা ও গান।

সংকলনটিতে সেই যুবা বয়সে যাঁরা এসব লেখা লিখেছিলেন, আমরা দেখেছি পরবর্তীকালে তাঁরাই আমাদের দেশের সাহিত্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠছেন।

প্রতিটি শাখায় তাঁদের অবদান আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রকে দিয়েছে দৃঢ় ভিত্তি। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সাহিত্যের সমগ্র জগৎটি। লেখকেরা ছিলেন প্রধানত শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গনি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম (আজিজ মিসির), আতোয়ার রহমান, মুর্তজা বশীর, সালেহ আহমদ ও কবিরউদ্দিন আহমদ। শেষোক্ত দুজন ছদ্মনামে এ সংকলনে লিখেছিলেন। তাঁদের নাম উদ্ধার করা যায়নি। তবে তাঁরা যে বামপন্থী নেতা–কর্মী ছিলেন, এ কথা বলেছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক।

শুধু তা–ই নয়, ১৯৫৮ সালে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের কঠোর সামরিক শাসনের প্রতিবাদে একুশের প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারীর পথ অনুসরণ করে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হতে শুরু করে একুশের সংকলন। বিশ শতকের ছয় ও সাতের দশকজুড়ে এ ধরনের সংকলনের প্রকাশ হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। এটি যেন একটি রেওয়াজে পরিণত হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রকাশিত হতে থাকে গণজাগরণমূলক লেখা নিয়ে দৃষ্টিনন্দন সব সংকলন। যেমন ছয়ের দশকের শুরুতেই ‘সৃজনী সাহিত্য ও শিল্পীগোষ্ঠী’ প্রকাশ করে ‘পলাশ ফোটার দিন’ (১৯৬২) ও ‘থেমে নেই’ (১৯৬৩)সহ পর্যায়ক্রমে অনেক সংকলন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৪ সালে প্রথম প্রকাশ করে ‘পদক্ষেপ’ নামে একটি সংকলন। এরপর একুশের সংকলন প্রকাশ করা ছাত্র ইউনিয়নের ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। একের পর এক সংগঠনটি প্রকাশ করে ‘বিক্ষোভ’, ‘সূর্যজ্বালা’, ‘ঝড়ের খেয়া’, ‘নিনাদ’ ও ‘জয়ধ্বনি’ ইত্যাদি নামের সংকলন।

সেই সঙ্গে ‘সংস্কৃতি সংসদ’ ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনও একুশের সংকলন প্রকাশে অগ্রসারিতে ছিল। এসব সংকলনে প্রকাশিত রচনা যেমন চলমান আন্দোলনে প্রাণাবেগের সঞ্চার করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে আন্দোলনকারীদের, তেমনি আমাদের সাহিত্যের বিকাশেও রেখেছে অপার অবদান। এ সবকিছুরই উৎস ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারী।

অবশ্য বিশ শতকের সাতের দশকের পর থেকে একুশে সংকলন প্রকাশের ধারা ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে। এর জায়গা দখল করে নেয় আমাদের দেশের দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা ও ক্রোড়পত্রগুলো।

ভাষার এই মাসে আমরা যেমন এই সংকলনের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করি, তার কাছে আমাদের ঋণ স্বীকার করি, তেমনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এই সংকলনের সম্পাদক, প্রকাশক, কবি ও লেখকদেরও। একমাত্র অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র রচয়িতা শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছাড়া, উল্লিখিত সংকলনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িতদের আর কেউ বেঁচে নেই। কিন্তু আমাদের সাহিত্য–সংস্কৃতির জগতে তাঁরা সঞ্জীবিত রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন