বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু এসব উদ্যোগ গ্রাহক বাড়াতে পারেনি। বরং কমেছে। বিটিটিবি থেকে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডে (বিটিসিএল) পরিণত হওয়া এই সেবা প্রতিষ্ঠানটির টেলিফোন গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৩৯০টিতে। ২০১২-১৩ অর্থবছরেও বিটিসিএলের গ্রাহক ছিল ৯ লাখের কিছু বেশি।

বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, টেলিফোন সেবার মান বাড়াতে বিটিসিএল নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সংযোগের জন্য আবেদন থেকে শুরু করে বিল দেওয়া পর্যন্ত পুরো কাজই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির পরিবর্তন হওয়ার কারণে গ্রাহকের টেলিফোনে আগ্রহ কম। তিনি বলেন, এখন শুধু টেলিফোন সেবা দিয়ে চলা যাবে না। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে হবে।

অবশ্য টেলিফোন ছাড়াও বিটিসিএল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইজিডব্লিউ, কল আদান–প্রদান বা আইসিএক্স, গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট, ডোমেইনসহ বিভিন্ন সেবা দেয়। যদিও সব মিলিয়ে তাদের রাজস্ব আয় কমছে। বছর বছর বড় অঙ্কের লোকসান দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

টেলিফোনটি ‘পড়েই থাকে’

রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা জাকিয়া আকতারদের বাসায় তিন দশক আগে টেলিফোন সংযোগ নেওয়া হয়। এখনো সংযোগ আছে। তবে ব্যবহার কম।

জাকিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে কথা বললে বা পরিচিত কারও বাসায় টেলিফোন থাকলে হয়তো কল করা হয়। তবে সেটাও খুবই কম। বলতে গেলে টেলিফোনটি পড়েই থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম, প্রায়ই সংযোগ অচল থাকত। অভিযোগ জানালেও কাজ হতো না। মানুষ হয়তো প্রযুক্তির পরিবর্তনের পাশাপাশি বিরক্তির কারণেও টেলিফোন সংযোগ রাখেনি।

বিটিসিএল ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে তাদের টেলিসেবা অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকদের অভিযোগ নেওয়া শুরু করেছে। অ্যাপে অভিযোগ জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে দাবি বিটিসিএলের। গ্রাহকেরাও বলছেন, তাঁরা টেলিসেবা অ্যাপে ভালো সেবা পেয়েছেন। অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ফোনের অ্যাপ স্টোর গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটির মূল্যায়ন নম্বর বা রেটিং ভালো, ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ২। সেখানে গ্রাহকদের ইতিবাচক মূল্যায়ন বা পজিটিভ রিভিউ বেশি। এ ছাড়া গ্রাহকের অভিযোগ জানতে তাদের কল সেন্টারও রয়েছে।

অবশ্য গ্রাহক বাড়াতে এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারেনি। মানুষের আগ্রহও বাড়াতে পারেনি। কারণ, তত দিনে হাতে হাতে মুঠোফোন এসে গেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাবে, দেশে মুঠোফোন গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটির বেশি। ১৯৯৩ সালে দেশে মোবাইল ফোন সেবা চালু হয়। বিপরীতে কমতে থাকে টেলিফোন সেবা। এখন যাঁদের বাসায় টেলিফোন রয়েছে, তাঁরাও কথা বলেন মূলত মুঠোফোনে।

ঢাকার রাজারবাগের রাজিয়া হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদি কখনো লাগে, তাই টেলিফোন সংযোগটি রেখে দিয়েছি।’

এদিকে ইন্টারনেট টেলিফোন (আইপি) সেবাদাতারা বলছেন, করপোরেট পর্যায়ে তাঁদের গ্রাহক বাড়ছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ৪০ থেকে ৫০টি প্রতিষ্ঠান এখন ইন্টারনেটভিত্তিক টেলিফোন সেবা দেয়। খরচ কম হওয়ায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয়ে এ সেবা বেশি নেওয়া হয়। তিনি বলেন, আইপি থেকে আইপিতে কথা বলতে কোনো খরচ নেই। আইপি থেকে মুঠোফোনে কথা বলতে প্রতি মিনিটে কলচার্জ ৪০ পয়সার মতো।

বিটিসিএল জানিয়েছে, মাসে ১৫০ টাকা বিলের আওতায় তাদের টেলিফোন থেকে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ ‘আনলিমিটেড’, মানে হলো যত কথাই হোক, বিল একই। তবে মুঠোফোনে কল করলে মিনিটে ব্যয় ৫২ পয়সা। এর ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) রয়েছে। বিটিসিএলের টেলিফোন সংযোগ নিতে ঢাকায় ১ হাজার, বিভাগীয় শহরে ৬০০ এবং জেলা ও উপজেলায় ৩০০ টাকা করে জামানত দিতে হয়।

ইন্টারনেট গ্রাহকও কম

বিটিসিএল টেলিফোন সংযোগের পাশাপাশি ইন্টারনেট সেবা দেয়। বিভিন্ন প্যাকেজের মূল্য মাসিক ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা। তাদের সেবা ৬৪টি জেলা শহরে। করোনাকালে তাদের গ্রাহক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যদিও সংখ্যায় তা মাত্র ৩০ হাজারের মতো। বিপরীতে বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ১ কোটির বেশি।

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশে সেবা দেয়, এমন বেসরকারি বড় আইএসপির গ্রাহক এক লাখের আশপাশে। বিটিসিএল সেই অর্থে বড় সেবাদাতা নয়। তিনি বলেন, বিটিসিএল সাধারণ গ্রাহক কম পায়। তারা মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সেবা দেয়। গ্রাহকদের যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো জনবলও বিটিসিএলের নেই।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে বিটিসিএলের জনবল ছিল ১০ হাজারের বেশি। এখন তা সাত হাজারের কম।

রাজস্ব আয় কমছে

টেলিফোন সেবা থেকে বিটিসিএলের রাজস্ব আয় কমছে। কমতির ধারা অন্য কিছু খাতেও। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব মিলিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিটিসিএলের রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৭১৬ কোটি টাকার কিছু বেশি, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও প্রায় ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা ছিল।

বিটিসিএল ২০১৭-১৮ অর্থবছরে টেলিফোন সেবা থেকে রাজস্ব আয় করে প্রায় ২২৬ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সবচেয়ে বেশি আয় কমেছে ইন্টারনেট গেটওয়ে সেবা থেকে। এ খাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয় ছিল প্রায় ৭৬৯ কোটি টাকা, যা দুই অর্থবছর পর কমে ৩৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বিটিসিএলের আয়ের তৃতীয় বড় উৎস ইন্টারনেট ডেটা সেবা। এ খাতে আয় কিছুটা বেড়েছে।

আইজিডব্লিউ ও ইন্টারনেট সেবা থেকে আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা হলো, আইজিডব্লিউতে তাদের আয়ের উৎস আন্তর্জাতিক কল। সরকার কল রেট বা মূল্যহার কমিয়ে দেওয়ায় আয় কমেছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের দাম কমানোর কারণেও তাদের আয় কমেছে। অবশ্য তারা আশা করছে, গ্রাহক বাড়ায় এ বছর আয় অনেক বাড়বে।

লোকসান বাড়ছে

সব মিলিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিটিসিএলের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩২৪ কোটি টাকা। এর আগের চার অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান ছিল ৪৩৩ কোটি টাকা। আর সবচেয়ে কম ছিল ১৮৩ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, বছর বছর প্রতিষ্ঠানটি একটা বড় অঙ্কের লোকসান দিচ্ছে।

সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, বিটিসিএলের অনেক সম্পদ। যেগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থপনা করা হয়নি। সম্পদের অবচয় ব্যয়ের এটি অন্যতম কারণ। এ কারণে লোকসান হয়। তিনি দাবি করেন, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক না হলেও তাদের কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলতে হয় না।

অবশ্য হিসাববিদেরা বলছেন, যেকোনো কোম্পানিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব অবচয় ধরেই হয়। অবচয়সহ লোকসান হলে প্রতিষ্ঠানটিকে লোকসানিই বলতে হবে। এ বিষয়ে দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, স্থায়ী সম্পদের বিপরীতে বছর বছর অবচয় ধরা হিসাববিজ্ঞানের নীতি। এটা ছাড়া হিসাব হয় না। তিনি বলেন, বিটিসিএল এখন দাবি করতে পারে তারা সরকারের কাছ থেকে টাকা নেয় না। কিন্তু কোনো সম্পদ সংগ্রহ বা লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজন হলে তারা টাকা পাবে কই।

‘সরকারি প্রতিষ্ঠান দেরি করে ফেলে’

টেলিযোগাযোগ খাতের আরেক সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটকও ভালো করতে পারছে না। চারটি মোবাইল অপারেটরের মধ্যে তাদের গ্রাহক ও রাজস্ব আয় একেবারেই নগণ্য।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে। ব্যবসার ক্ষেত্রে যে ধরনের মানসিকতা প্রয়োজন, তা থাকে না। তিনি বলেন, যুগের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিবর্তন দরকার, তা করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান দেরি করে ফেলে।

গ্রাহকের সামনে এখন অনেক বিকল্প রয়েছে বলে উল্লেখ করে আলমাস কবীর আরও বলেন, বিটিসিএলকে লাভবান করতে হলে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করে সেবা ও পণ্যের মান বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন