বিজ্ঞাপন

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ১৭ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টার আটকে রেখে হেনস্তা ও নির্যাতন করা হয়। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাঁকে শাহবাগ থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত পৌনে ১২টার দিকে তাঁর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। মামলার বাদী হন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী।

শুনানিতে রোজিনা ইসলামের আইনজীবীরা বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন, সৃজিত ও উদ্দেশ্যমূলক। জামিন পাওয়ার অধিকার তিনি সংরক্ষণ করেন। এটা তাঁর প্রাপ্য।

তবে মামলার ধারাগুলো জামিন–অযোগ্য বলে দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষ। সরকারি কৌঁসুলি বলেছেন, স্পর্শকাতর বিষয়ে তথ্য চুরি করে রোজিনা ইসলাম নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, যা অপরাধ। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, যে কাজটি করেছেন তা অন্যায়। এমন ভিডিও টেপ আদালতে দাখিল করবেন এবং তা যাচাই-বাছাই করে আগামী সপ্তাহে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আরজি জানান।

এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত মঙ্গলবার রোজিনা ইসলামকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়েছিল। পুলিশ তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে। রোজিনার আইনজীবীরা তাঁর জামিন চান। আদালত রিমান্ডের আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আর জামিন আবেদনের ওপর অধিকতর শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন রাখেন। এই আদেশের পর রোজিনা ইসলামকে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে পাঠানো হয়। গতকাল বেলা পৌনে একটার দিকে শুনানি শুরু হয়, চলে প্রায় দুইটা পর্যন্ত।

জামিনের পক্ষে যুক্তি

মামলায় উল্লেখিত দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারা ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারার প্রসঙ্গ টেনে শুনানিতে রোজিনা ইসলামের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, এজাহারে চুরির কথা বলা হয়েছে। যদি কেউ বলে, আসামি ডকুমেন্ট বা প্রোপার্টি চুরি করেছে, তাহলে অবশ্যই এর বর্ণনা থাকতে হবে। কিন্তু এজাহারের কোথাও সেই বর্ণনা নেই। জব্দতালিকায় দেখা যায়, কথিতমতে ডকুমেন্টস কিংবা মোবাইল ফোনসহ যা কিছুই থাকুক না কেন, তা রোজিনা ইসলামের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়নি। রোজিনার এই আইনজীবী বলেন, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ধারা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ এবং ৫ ধারা হচ্ছে শত্রুভাবাপন্ন কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বা তথ্য হস্তান্তর। কিন্তু এই মামলার এজাহারে এই দুই ধারার কোনো উপাদান নেই। তিনি বলেন, এ আইনের ১২ ধারা অনুসারে, যদি ৩ ধারার কোনো অপরাধ না হয়ে থাকে, তাহলে বাকি ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য। সুতরাং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী জামিনযোগ্য ধারা হওয়ায় রোজিনা ইসলামের জামিনে মুক্তি পাওয়ার আইনত অধিকার আছে।

আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী আরও বলেন, এটি তাঁর প্রতি কোনো দয়া, অনুকম্পা বা কোনো সহানুভূতি নয়। এটি তাঁর প্রাপ্য। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে, জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, রোজিনা একজন নারী, মা এবং অসুস্থ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী একজন নারী জামিন পাওয়ার অধিকারী। তিনি অসুস্থ, এজাহারে কথিতমতে কোনো ডকুমেন্ট চুরির বর্ণনাও নেই, এমনকি তা তাঁর কাছ থেকে উদ্ধারও হয়নি; গুপ্তচরবৃত্তির কোনো অভিযোগ নেই, কোনো রংফুল কমিউনিকেশনের অভিযোগও নেই; তাই তিনি জামিন পাওয়ার যোগ্য।

শুনানিতে রোজিনা ইসলামের আরেক আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো বলেন, আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে মামলাটি করা হয়েছে। অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি হয়নি, এটিই হচ্ছে আশঙ্কা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে রোজিনা ইসলামের করা প্রতিবেদনের শিরোনাম তুলে ধরে তিনি আদালতকে বলেন, রোজিনা ইসলামকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একজন শত্রু ভাবে। শত্রু ভাবে বলেই তারা তাঁকে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে পুলিশে দেয়। তাই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। এই সময়ে অভিযোগ সৃজন করা হয়েছে। সচিবালয় থেকে শাহবাগ থানা মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। হেঁটে গেলেও ১০ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এখানে ছয় ঘণ্টার যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ নেই।

আইনজীবী আশরাফ–উল আলম আদালতকে বলেন, প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে তাঁকে ওই কক্ষে নানা রকম হয়রানি এবং মানসিক-শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের অনেকগুলো ভিডিও ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। জব্দতালিকা তৈরি করা হয়েছে সাড়ে সাতটায়। অথচ ঘটনার সময় ২টা ৫৫ মিনিট। ঘটনাস্থলে পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন। তাহলে তাঁর কাছ থেকে সঙ্গে সঙ্গে জব্দ করা হলো না কেন? তাই ঘটনাটি সম্পূর্ণ সাজানো, মিথ্যা ও বানোয়াট।

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, একজন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মনগড়া গল্প সাজানো হয়েছে। যিনি এজাহার করলেন, তিনি ওই ভবনেই বসেন না। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও নন। আর রীতি হচ্ছে, অসুস্থ ও নারী—দুই বিবেচনায় আদালত জামিন দিতে পারেন।

রোজিনা ইসলামের আরেক আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, এজাহার অনুযায়ী ঘটনাস্থল হচ্ছে সচিবের একান্ত সচিবের দপ্তর। অথচ মামলাটি করেছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী। উনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এজাহারে বলা হচ্ছে জনৈক রোজিনা ইসলাম। অথচ রোজিনা ইসলাম এক যুগের বেশি সময় ধরে সাংবাদিক হিসেবে প্রথম আলোতে কাজ করছেন। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবেদনের জন্য তিনি জাতীয়–আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। তাই তাঁকে জনৈক বলা অবিশ্বাস্য। এতে প্রতীয়মান হয়, মামলাটি বানানো।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে আইনজীবী আব্দুর রশীদ বলেন, নিষিদ্ধ এলাকা বলতে সরকারের গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষিত নিষিদ্ধ এলাকা হতে হবে। রোজিনা ইসলাম যেখানে গিয়েছেন, সেটি গোপনীয় শাখা নয়। তাই এই আইনে মামলাই হয় না। তিনি বলেন, ২০১১ সালে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সঠিক তথ্য প্রকাশের কারণে তথ্য প্রকাশকারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোনো বিভাগীয় মামলা করা যাবে না।

রোজিনার পক্ষে আইনি সহায়তা দিতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনজীবী মশিউর রহমান, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মিজানুর রহমান, মহিলা পরিষদের দিপ্তী সিকদার, শাম্মী আক্তার। এ ছাড়া আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন সুমন কুমার রায়, মাহবুবুল হক, আবদুর রহীম।

default-image
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হেমায়েত উদ্দীন খান ■ অনুমতি ছাড়া তথ্য নেন তিনি ■ অভিযোগ জামিন অযোগ্য ■ আগামী সপ্তাহে আদেশের আরজি

রাষ্ট্রপক্ষ যা বলল

সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. হেমায়েত উদ্দিন খান শুনানিতে বলেন, তিনি বিদেশ থেকে টিকা আনার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্তের অনুলিপি ও গোপনীয় নথি নিয়ে লুকিয়ে রাখেন। সেখানকার কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তিনি এসব নেন ও পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মামলার সব ধারা জামিন–অযোগ্য। অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় শাস্তি ১৪ থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড। তাই এই মামলার বিচার হবে জজ আদালতে। তিনি বলেন, রোজিনা ইসলাম ঘটনাস্থলে একটি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। সেই ভিডিও টেপটি আদালতের কাছে দাখিল করা হবে। তা দেখার পর সিদ্ধান্ত দেওয়ার আরজি জানান তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আরও বলেন, জামিন আবেদনকারী মহিলা হলে কী হবে, তিনি যে কাজটি করেছেন, তা বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার জরুরি ভিত্তিতে চীন ও রাশিয়া থেকে টিকা আনার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে ধরনের কাগজপত্র উনি নিজের দখলে রেখে অফিশিয়াল সিক্রেটস বিঘ্নিত করেছেন। সাংবাদিক সমাজের প্রতি কোনো আক্রোশ নেই। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার সব সময়ই সাংবাদিকদের পাশে আছেন। ভিডিও ফুটেজ দেখে আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন যদি আদেশ দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তাঁর দাবি, আসামি যদি জামিনে মুক্ত হন, তাহলে মামলার সাক্ষীদের চরমভাবে প্রভাবিত করবেন।

default-image
রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী ■ মামলটি ত্রুটিপূর্ণ ■ রোজিনা নারী, মা এবং অসুস্থ ■ জামিন তাঁর প্রাপ্য

জবাব ও প্রত্যুত্তর

রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের জবাবে রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ গতানুগতিক বক্তব্য রেখেছেন। ইতিপূর্বেও বলেছি, এজাহারে কোথাও আসামির বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ নেই। অন্যান্য যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো জামিনযোগ্য।’ তিনি বলেন, এই মামলাটি আইনতভাবে ত্রুটিপূর্ণ, যা আইনের কার্যক্রমের অপব্যবহার।

এহসানুল হক সমাজী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ এখন একটা ভিডিওর কথা বলছেন। সাক্ষ্য আইনের ২৪ ও ২৫ ধারা অনুযায়ী, পুলিশের কাছে দেওয়া কোনো স্বীকারোক্তি, মুচলেকার আইনত মূল্য নেই। রাষ্ট্রপক্ষ যে ভিডিওর কথা বলছেন, সেটির বিচারিক নথিতেও নেই। জামিনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ এটা করছেন।

এহসানুল হক সমাজী বলেন, কোনো মামলার জব্দতালিকা করতে হলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী করতে হয়। আইন অনুসরণ না করে জব্দতালিকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে কেন এই কল্পকাহিনি বানানো হয়েছে? কারণ, রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতটা সোচ্চার, সহায়তাস্বরূপ এই সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের কোভিডের সমস্ত বিষয়কে আমরা প্রশংসা করি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক ও সাংবাদিক অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। রোজিনা ইসলাম সচিবালয়ে গিয়েছিলেন তথ্য সংগ্রহ করতে। যে কারণে আপামর জনসাধারণ রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। রোজিনা ইসলাম কোনো অজামিনযোগ্য অপরাধ করেননি। তাই রাষ্ট্রপক্ষের আমদানি করা তথ্যের ভিত্তিতে জামিন নামঞ্জুর করার কোনো সুযোগ নেই।

এ পর্যায়ে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. হেমায়েত উদ্দিন খান বলেন, আটকের পর আসামি সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সমস্ত কথা স্বীকার করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই ভিডিও ফুটেজ আদালতের কাছে হাজির করা হবে। তাই জামিন বিষয়ে আদেশ আগামী সপ্তাহে দেওয়ার আরজি করছি। শুনানি শেষে আদালত বলেন, উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনলাম। নথি পর্যালোচনা করে দ্রুত আদেশ দেওয়া হবে। এর পর বিকেল চারটায় রোববার আদেশের দিন ধার্য করার তথ্য জানানো হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন