বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ ৩২০ কিলোমিটার। আর চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে কক্সবাজার ১০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই পথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেনই চলতে পারবে। দোহাজারি থেকে কক্সবাজার পর্যন্তও মিশ্র গেজ রেললাইন নির্মিত হচ্ছে। অর্থাৎ এই পথে রেললাইন বসানো শেষ হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দ্রুতগতির ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথের কিছুটা সংস্কার করতে হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ঢাকা-কক্সবাজার পথে দ্রুতগতির ট্রেন পরিচালনার জন্য নতুন ইঞ্জিন-কোচ কেনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে অত্যাধুনিক ইঞ্জিন-কোচ কেনার প্রকল্প নেওয়া হয়। নতুন লাইন নির্মাণের পর এসব ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে চাইলে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ট্রেন চালানো যাবে।

বর্তমানে দেশে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ট্রেন চালানো হয় না। মূলত লাইনের দুর্বলতা ও পুরোনো ইঞ্জিন–কোচের কারণে বেশি গতিতে ট্রেন চালানো হয় না।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই রেলপথ পর্যটন খাত ছাড়াও কক্সবাজারের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে এই অঞ্চলের মৎস্য সম্পদ, লবণ, রবারের কাঁচামাল এবং বনজ ও কৃষিজ পণ্য পরিবহনব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক সহজ হবে। আগের চেয়ে কম খরচে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন মৎস্যজীবী ও কৃষকেরা।

বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প অঞ্চলসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা প্রকল্পের কাজ চলছে। চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ ও দ্রুত করার জন্য কর্ণফুলী নদীর তলদেশে চলছে টানেলের নির্মাণকাজ। এর পাশাপাশি রেললাইন স্থাপিত হলে কক্সবাজারে যাতায়াতব্যবস্থা সহজ হবে। এর ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশা করছে সরকার।

রেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পটি ১১ বছর আগে নেওয়া। অনেক আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। সময়মতো বাস্তবায়ন হলে সুফল আরও আগেই পাওয়া যেত, ব্যয়ও কমত।

শুরুতে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। প্রায় ১৫ কিলোমিটার রেললাইন যাচ্ছে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে। ফলে নানা বিধিনিষেধে কাজ করতে হয়েছে।
মফিজুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক

যেভাবে এগোচ্ছে প্রকল্পের কাজ

রেলওয়ের প্রকল্পসংক্রান্ত নথি অনুসারে, ২০১০ সালে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে প্রথমে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। কক্সবাজার থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার অংশের কাজ হচ্ছে না। মিয়ানমার সম্মত নয় বলে সরকার এই অংশের কাজ পরে বাস্তবায়ন করবে।

২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালে। তখন প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা ঠিক করা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এখন আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। প্রায় ১৫ কিলোমিটার রেললাইন যাচ্ছে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে। ফলে নানা বিধিনিষেধে কাজ করতে হয়েছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক খুঁটি সরাতে সময় লেগেছে। এ জন্য কাজে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হয়েছে বলে অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত হয়নি। তিনি বলেন, এখন সেভাবে আর জটিলতা নেই। আগামী বছরের জুনে রেলপথ ট্রেন চলাচল উপযোগী হয়ে যাবে।

দুই ভাগে প্রকল্পের কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে। একটি অংশ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। আরেকটি অংশ করছে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।

প্রকল্পের প্রথম ভাগ দোহাজারি থেকে চকরিয়া পর্যন্ত। দ্বিতীয় ভাগ চকরিয়া থেকে কক্সবাজার।

প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চকরিয়া থেকে কক্সবাজার অংশে ২০টি সেতুর মধ্যে ১৭টির কাজ শেষ হয়েছে। কালভার্টের কাজ প্রায় শেষ। সাড়ে ১২ কিলোমিটার পথে রেললাইনও বসানো হয়েছে।

তবে দোহাজারি-চকরিয়া অংশে কাজ কিছুটা পিছিয়ে আছে। এই অংশে ১৯টি সেতুর মধ্যে ৩টির কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হয়েছে। বাকিগুলোর নির্মাণকাজ চলমান আছে। বেশির ভাগ কালভার্টের কাজ শেষ হয়েছে।

কক্সবাজারের আইকনিক স্টেশনসহ সব মিলিয়ে ৯টি স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে এই রেলপথে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের পথে আইকনিক স্টেশনের পরের স্টেশনটি রামু। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে ইসলামাবাদ, ডুলাহাজারা, চকরিয়া, হারবাং, লোহাগড়া, সাতকানিয়া ও দোহাজারী রেলস্টেশন।

রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেলপথ বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় মাটির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই অংশে রেললাইন বসেছে ১৪ কিলোমিটার পথে।

রেললাইনের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে রেললাইন নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা শত বছরের পুরোনো। ৯০ বছর আগে রেললাইন নির্মাণ করা হলেও তা দোহাজারীতে গিয়ে থেমে যায়। বর্তমান দোহাজারী-কক্সবাজার ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য, পর্যটননগরী কক্সবাজারে যাতায়াত সহজ করা। পাশাপাশি মিয়ানমারসহ ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করা।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের আর্থসামাজিক গুরুত্ব সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এই রেললাইন কক্সবাজার হয়ে ঘুমধুম যাওয়ার পর মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত চলে যাওয়ার কথা। এখন আপাতত কক্সবাজার পর্যন্ত হবে। শুধু কক্সবাজারের জন্য চিন্তা করলে এই রেললাইন খুব একটা খারাপ হবে না। ওই অংশে রেল যোগাযোগ ছিল না। এখন তা হবে। দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করলে বাংলাদেশের জন্যও ভালো হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন