বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একই সময়ে প্রসব–পূর্ব প্রথমবার সেবা নিতে যাওয়া মায়েদের হার ২৬ শতাংশ কম ছিল। দ্বিতীয়বার ২৫ শতাংশ, তৃতীয়বার ২৬ শতাংশ এবং চতুর্থবার ছিল ২৪ শতাংশ কম।

গত বছর গর্ভধারণের পর একবারও চিকিৎসকের কাছে যাননি কমলা খাতুন (১৮)। পাঁচ মাস আগে বাড়িতে বয়স্ক খালার হাতে পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এটি তাঁর প্রথম সন্তান। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার হোগলা ইউনিয়নের মহেশপট্টি গ্রামের বাসিন্দা মো. সোহেলের স্ত্রী তিনি। মুঠোফোনে কমলা প্রথম আলোকে বললেন, ‘হাসপাতালে গেলে খরচ আছে। গরিব মানুষ; দিন আনি, দিন খাই।’ বাড়িতে প্রসবে কোনো জটিলতা হতে পারত, ভয় লাগেনি? কমলার জবাব, ‘ভয় কিসের! গ্রামে কতজনের হচ্ছে!’

সরকারি তথ্য অনুসারে, দেশে এখনো ৫০ শতাংশ প্রসবের ঘটনা ঘটে বাড়িতে। প্রসবকালীন জটিলতা এড়ানো এবং মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসে প্রসবের ওপর জোর দিয়ে আজ ২৮ মে পালিত হচ্ছে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। এবারের স্লোগান ‘করোনাকালে গর্ভকালীন সেবা নিন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু রোধ করুন’।

করোনাকালে মাতৃমৃত্যু বাড়া ও সেবা নেওয়া কমে যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্য সার্ভিসেস) মোহাম্মদ শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, করোনাকালে প্রসবকালীনসহ সব ধরনের চিকিৎসাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে ভয় থেকে চিকিৎসা নিতে আসেনি। আবার অনেকে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি হতে পারেননি। অনেক সময় সেবাদানকারীদেরও পাওয়া যায়নি। ফলে বাড়িতে প্রসব হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

মোহাম্মদ শরীফ বলেন, এই বৃদ্ধি সরকারের মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনার যে চেষ্টা, তা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

মাতৃমৃত্যুর দুই রকম তথ্য

দেশে মাতৃমৃত্যুর হার নিয়ে দুই রকম তথ্য রয়েছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সরকারের জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) করা বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ (বিএমএমএস) ২০১৬ অনুসারে, দেশে এক লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। তবে ওই সময় ওই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর দাবি করে, এ সংখ্যা ১৭২। ২০১০ সালে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ছিল ১৯৪। সবশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৯’ অনুসারে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ১৬৫। গ্রামে এ হার ১৯১, শহরে ১২৩।

■ সরকারি হাসপাতালে ২০১৯ সালে ৯৬৭ জন ও ২০২০ সালে ১ হাজার ১৩৩ জন মায়ের প্রসবকালীন মৃত্যু হয়েছে। ■ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৮২ জন মায়ের।

ইউনিয়ন পর্যায়েও কমেছে সেবা নেওয়া

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ধাত্রিবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর মাধ্যমে বাড়িতে এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে প্রসবসেবা দিয়ে থাকে। এই অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বাড়িতে ৯ শতাংশ এবং কেন্দ্রে ৪ শতাংশ প্রসবসেবা কম নিয়েছেন মায়েরা।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্য সার্ভিসেস) মোহাম্মদ শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও ৮৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, করোনাকাল শুরুর আগে গত বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে যথাক্রমে ৭২ ও ৭৫ হাজারের বেশি মা প্রসব–পূর্ব প্রথমবার সেবা নিয়েছিলেন। করোনাকাল শুরুর সময় মার্চে তা ৬৩ হাজারে নেমে আসে। এপ্রিল ও মে মাসে অর্ধেকের কম যথাক্রমে ৩২ হাজার ও ৩১ হাজারে নেমে আসে। সেপ্টেম্বর থেকে এ সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সবশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে ৫৫ হাজারের বেশি মা সেবা নিয়েছেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা নেওয়ার হার এখনো করোনাকালের আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। গত বছর করোনাকালের আগের দুই মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে সেবা নেওয়ার হার ১৩ শতাংশ কম। স্বাভাবিক প্রসব ১৬ শতাংশ এবং সিজারিয়ান সেকশন ২৫ শতাংশ কম হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে অন্তত দুবার প্রসব–পরবর্তী সেবা নেওয়ার হারও ২২ ও ২৯ শতাংশ কমেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এখনো দুটি শিশুর একটির জন্ম হচ্ছে বাড়িতে। সনাতন পদ্ধতিতে প্রসব হলে মা ও শিশুর জীবন রক্ষা করা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে যায়। করোনাকালে গত বছরের একটা সময়ে গর্ভকালীন সেবা পাওয়া ও নিরাপদ প্রসব বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশে মাতৃমৃত্যুর উচ্চ হার রয়েছে। এই অবস্থায় ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০–এ নামিয়ে আনা কঠিন হবে।

বাড়িতে প্রসবে ঝুঁকি বেশি

রাজধানী ঢাকায় বাস করেও বাড়িতে চাচির হাতে পুত্রসন্তান প্রসব করেছেন নাসিমা আক্তার (২০)। স্বামী মো. আশিক রিকশাচালক। ভাটাটার কুড়াতলী বস্তির বাসিন্দা নাসিমা প্রথম আলোকে বলেন, ছয় মাস আগে জন্ম নেওয়া এটি তাঁর প্রথম সন্তান। করোনাকালে গর্ভধারণের সময় স্বামী বেকার ছিলেন। খুব টানাটানির মধ্যে থাকায় তিনি হাসপাতালে যাওয়ার চিন্তা বাদ দেন। তবে গর্ভধারণের সময়ে দুবার চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, তাঁর চাচি ব্র্যাকের ধাত্রী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

বিএমএসএস জরিপ ২০১৬ অনুসারে, মাতৃমৃত্যুর ৫৪ শতাংশ ঘটে থাকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনির কারণে। ২০১০ সালে ৩১ শতাংশ মাতৃমৃত্যু হতো রক্তক্ষরণে, ২০১৬ সালে এ হার একই ছিল। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে খিঁচুনি ও গর্ভপাতে মৃত্যুর হার বেড়েছে। খিঁচুনি ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশ এবং গর্ভপাত ১ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি ফেরদৌসী বেগম প্রথম আলোকে বলেন, গর্ভধারণের পর থেকে প্রসব পর্যন্ত একজন মাকে অন্তত চারবার সেবা নিতে হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নতুন নির্দেশনায় এ সেবা অন্তত আটবার নিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বাড়িতে প্রসবে ঝুঁকি থাকে। অনেক মায়ের প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্রপাতি থাকায় যেকোনো প্রসবকালীন জটিলতায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বাড়িতে যা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রসব সেবা নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সেবাকেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা, চিকিৎসা সক্ষমতা ও মাতৃসেবায় স্বাস্থ্যসেবাদানকারীর সংখ্যা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন