করোনার সংক্রমণ এড়াতে অনলাইন যেন ভরসার জায়গা

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনার এই দুঃসময়ে অনেক ব্যবসাই যেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছে, সেখানে অনলাইনের ছোট ছোট ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোর অবস্থা তেমন একটা খারাপ নয়। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে মার্চ–এপ্রিল মাসে হোঁচট খেলেও ঈদুল ফিতরের আগে অর্থাৎ মে মাসে ধীরে ধীরে ব্যবসায় ফিরে আসতে শুরু করেন উদ্যোক্তারা। আর জুন থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। 

ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ ভাইরাস সংক্রমণের এই সময়ে অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী অনেকেই আবার তাঁদের নিয়মিত পণ্যে এনেছেন পরিবর্তন। ঈদুল আজহার আগে কোনো কোনো উদ্যোক্তার বেচাকেনা আগের স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি ছিল।

অনলাইনের এই উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই ফেসবুক পেজভিত্তিক ব্যবসা চালান। করোনার সময়ে এমন উদ্যোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে। কেউ হয়তো চাকরি হারিয়ে, আবার কেউ বাড়তি আয়ের জন্য অনলাইন উদ্যোক্তার কাতারে নাম লিখিয়েছেন। নারী উদ্যোক্তাদের ফেসবুক গ্রুপ উইমেন অ্যান্ড ই–কমার্সের (উই) সদস্যসংখ্যা বাড়ার হার বলে দেয় প্রচুর নারী নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন অনলাইন উদ্যোগের সঙ্গে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত উই গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬। ঈদের আগে এক সপ্তাহেই যুক্ত হয়েছিলেন এক লাখের বেশি উদ্যোক্তা। 

শুরুটা ভালো ছিল না
সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরির জেরিন তাসনিমের কথা ধরা যাক। নিজেদের তৈরি নকশার বাইরে ক্রেতার ফরমাশমতো গয়নাও তাঁরা এখন বানিয়ে দিচ্ছেন। জেরিন বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানার কর্মীদের কাজ করাতে গিয়ে যদিও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় খানিকটা বেড়ে গেছে, তবু গয়না বিক্রিতে এর কোনো প্রভাব যাতে না পড়ে তাই নতুন ফরমাশ নেওয়া শুরু করেছি।’ মার্চের শুরুতে গয়না কেনার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ একেবারেই কমে যায়। তবে এপ্রিলে পয়লা বৈশাখের আগে চিত্রটা একটু বদলাতে থাকে। ঈদুল ফিতরের আগে আগে আবার বিক্রি বাড়তে থাকে, তবে জুন থেকে ঈদের আগ পর্যন্ত প্রায় আগের মতোই ক্রেতাদের ফরমাশ আসতে শুরু করেছে বলে জানালেন জেরিন।

ঘর সাজানো এবং নিত্যব্যবহার্য কিছু পণ্যের ওপর লোকজ শিল্প নিয়ে কাজ করে বিস্কুট ফ্যাক্টরি। করোনাকালের শুরুতে তাদের বিক্রি কমে গিয়েছিল ৭০ শতাংশ। এর উদ্যোক্তা বিস্কুট বললেন, ‘এই দুর্যোগের সময় এমন বেচাকেনাই  স্বাভাবিক। এই সময়েও যে ক্রেতারা শৌখিন পণ্য কিনে আমাদের পাশে আছেন, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট।’

তবে অনেকের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। রিকশাচিত্র এঁকে শৌখিন পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান ফিনারি এই সময়ে তেমন ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। এর উদ্যোক্তা ড চিং চিং জানালেন বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেক কর্মীর বেতনও ঠিকমতো দিতে পারছেন না। তবে জুলাইয়ের শেষে একটু একটু করে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল।

করোনাকালে পণ্যের চাহিদায় বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যে উদ্যোক্তা যে পণ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, সে পণ্যের এখন হয়তো ক্রেতাই নেই। যেমন বিক্রি একেবারেই কমে গিয়েছিল ব্যতিক্রমী নকশার শাড়ির উদ্যোগ পটের বিবির। এর উদ্যোক্তা ফোয়ারা ফেরদৌস বলেন, ‘শাড়ি নিয়েই আমাদের কাজ। এখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না। মানুষ বাইরেও বের হচ্ছে কম, ফলে পটের বিবিতে শাড়ির চাহিদা একেবারেই নেই।’ তাই এর বিকল্প বের করেছেন তাঁরা। অনলাইনে ক্রেতারা এখন ঘরে পরার ক্যাজুয়াল পোশাক বেশি খুঁজছেন। তেমন পোশাক নিয়েই এখন টিকে থাকার ইচ্ছে পটের বিবির। একই পরিকল্পনার কথা জানালেন অনলাইনভিত্তিক পোশাকের প্রতিষ্ঠান ওয়্যার হাউসের উদ্যোক্তারাও।

পরিস্থিতি পাল্টেছে দুই মাসে
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে ২৯ মার্চ থেকে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। অন্য ব্যবসা–বাণিজ্যের মতো এ সময় অনলাইনভিত্তিক বেশির ভাগ উদ্যোগই হোঁচট খায়। অনেকে বন্ধ রেখেছিলেন তাঁদের কাজ। কিন্তু মে মাসে আবারও সরগরম হয়ে ওঠে বেচাকেনার ফেসবুক পেজগুলো। কারণ, সংক্রমণ এড়াতে বাড়িতে বসেই কেনাকাটা নিরাপদ মনে হওয়ায় অনলাইন তখন হয়ে উঠে ভরসার জায়গা। এতে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সুদিন ফিরে আসে।

এই উদ্যোক্তাদের হাত ধরে অনলাইনে বেড়েছে সৃজনশীল নানা উদ্যোগ। প্যাকেটজাত কাটা সবজি, ঘি, বাদাম, লোকজ শিল্পকলার ধারায় তৈরি শৌখিন পণ্য, ভেষজ উপাদান, ফরমায়েশি গয়না, গামছার মাস্ক থেকে শুরু করে আমসহ নানা ফলের চাহিদা অনলাইনে বেড়েছে এই করোনাকালে।

গামছা শাড়ির মাধ্যমে অনলাইনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে শাড়ি কথন। এর উদ্যোক্তা সাবিহা কুমু মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। জুনের মাঝামাঝিতে কাজ শুরু করলে অনলাইনে আবার ক্রেতাদের ভালো সাড়া পেতে থাকেন। তবে পণ্যে এনেছেন পরিবর্তন। সাবিহা বলেন, ‘শাড়ির পাশাপাশি ঘর সাজানোর পণ্যসহ ছোটদের পোশাক তৈরি করা শুরু করেছি।’

ব্যতিক্রমী গয়নাই তৈরি করত টুশিল। সেগুলোর চাহিদা কমে যায় একেবারেই। তাই টুশিল এখন তৈরি করছে হবু মায়েদের উপযোগী পোশাক। টুশিলের উদ্যোক্তা নাদিয়া মাহমুদ জানালেন, কেনাকাটার জন্য বাইরে যাওয়া অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। বিশেষ করে যাঁরা মা হতে চলেছেন তাঁদের তো নতুন পোশাক লাগবে। এসব ভাবনা থেকে বাড়িতে পরার পোশাক আর হবু মায়েদের পোশাক নিয়ে আসে টুশিল। সেগুলোতে সাড়া ভালো পাচ্ছেন।

default-image

ঘরে তৈরি খাবারের চাহিদা বেশি
রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাওয়ার যে নগর সংস্কৃতি ছিল, তা পুরোই মুখ থুবড়ে পড়ে করোনার শুরু থেকে। কিছু কিছু রেস্তোরাঁর কার্যক্রম আবার শুরু হলেও গিয়ে খাওয়ার মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম। যদিও রেস্তোরাঁর খাবার বাড়িতে এনে খাওয়ার সুবিধা রয়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে অনেকেই সেটিতে আগ্রহবোধ করছেন না। তাঁরা পছন্দ করছেন ঘরে তৈরি খাবার। আর এই সুবিধা নিতে পেরেছেন অনেক অনলাইন উদ্যোক্তা।  

ঘরে তৈরি বেকারি খাবারের ফেসবুক পেজ মাইটি মম’স কুকারির উদ্যোক্তা শেখ সিরাজুম মুনিরা বলেন, করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে অনেকে সুরক্ষার কথা ভেবে অনলাইনে কেনাকাটা বন্ধ করে দেন। পরে তাঁরা বুঝতে পারেন বাইরের দোকানের কেনা খাবারের চেয়ে ঘরে তৈরি খাবার এখন বেশি নিরাপদ। এই সময় অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই বাড়তে থাকে ক্রেতার চাপ।

একই অভিজ্ঞতা অতিথি আপ্যায়ন নামের ফেসবুক পেজের উদ্যোক্তা আয়েশা সিদ্দীকার। মার্চ ও এপ্রিল দুই মাস ব্যবসায় বেশ ক্ষতির মুখে পড়লেও গল্পটা অন্য রকম হয়ে ওঠে মে মাস থেকে। এই জুলাই মাসে এসে অবস্থা এমনই যে ক্রেতাদের চাহিদামতো খাবার তৈরি করতে করতে রাত পার হয়ে যাচ্ছে। আয়েশা জানালেন, খাবারে করোনাভাইরাস ছড়ায় না এই তথ্য জানার পর বাড়তে থাকে ঘরে তৈরি খাবারের চাহিদা।’

বৈচিত্র্যময় নতুন উদ্যোগ
করোনা সংকটের সময়ে ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে অনেকেই এনেছেন নতুন নতুন উদ্যোগ। কেউ তৈরি করছেন হাতে বানানো রুটি, কেউ আনছেন ছাদবাগানের জন্য সারযুক্ত মাটি আবার কোনো পেজে বিক্রি হচ্ছে প্রসেসড ভেজিটেবল বা কাটা সবজির প্যাকেট।

১০ জুন থেকে মুদিদোকান ডটকম তাদের পণ্যতালিকায় যুক্ত করেছে প্যাকেটজাত কাটা শাক–সবজি। বিভিন্ন ধরনের সবজি কেটে প্যাকেট করে অনলাইনে বিক্রি করছেন তাঁরা। এই পণ্যে ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে জানালেন মুদিদোকানের উদ্যোক্তা প্রজ্জ্বোল কান্তি রায়। এখন অনেকের বাড়িতে গৃহকর্মী নেই, আবার যাঁদের বাড়ি থেকে অফিস করতে হচ্ছে তাঁরাও সব কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই কাটা শাকসবজির মতো পণ্যে তাঁরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

ঢাকার বাইরেও অনেক উদ্যোক্তার জন্য এই ক্রান্তিকাল এনেছে সুখবর। রাজশাহীর সাদিয়া ইসলাম দুই বছর ধরে ফেসবুকে প্রিয়দর্শিনী ফ্রেশ ফ্রুটস নামে একটি পেজ চালাচ্ছেন। যে পেজের মাধ্যমে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দেন রাজশাহীর আম। এই মৌসুমে তাঁর আমের বিক্রির পরিমাণ গত দুই বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শুধু আম বিক্রি করেই তিনি এ বছর আয় করেছেন ৭০ হাজার টাকা।

অনলাইনভিত্তিক কিছু উদ্যোক্তা তাঁদের পণ্য দোকানের মাধ্যমেও বিক্রি করেন। তেমনি একজন ওয়াহিদুজ্জামান। চুল ও ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত ভেষজ পণ্যের প্রতিষ্ঠান রিবানার উদ্যোক্তা তিনি। জানা গেল, এখন যেহেতু দোকানে মানুষের যাতায়াত কমে গেছে, তাই গত চার মাসে অনলাইনে রিবানার বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

বাংলাদেশে এ মুহূর্তে অনলাইনে ঠিক কী পরিমাণ উদ্যোক্তা কাজ করছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কোথাও। তাই এ খাতের আয়ের সঠিক হিসাবটাও অজানা। ই–কমার্স উদ্যোক্তাদের সংগঠন ই–কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই–ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ জানালেন, ই–ক্যাবে নিবন্ধিত অনলাইন উদ্যোক্তার সংখ্যা ১ হাজার ২০০।

করোনার এই দুঃসময়ে অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বেচাকেনাতেও। গুরুত্ব বেড়েছে ই–কমার্সের। উইয়ের সভাপতি রাজীব আহমেদ বলেন, যাঁরা এত দিন অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি আগ্রহী ছিলেন না, তাঁরাও এখন ই–কমার্সের গুরুত্ব বুঝছেন। অনলাইনে ছোট–বড় সব ধরনের পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য এটা একটা বড় সুযোগ।

করোনার ক্রান্তিকালে অনলাইন উদ্যোক্তারা যাতে এগিয়ে যেতে পারেন সে জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে ই–ক্যাব, উই কিংবা এসএমই ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। অনলাইনে জুমের মাধ্যমে শুধু অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এসএমই ফাউন্ডেশন। উই অনলাইনে উদ্যোক্তাদের জন্য আয়োজন করেছে অডিও আড্ডার। ই–ক্যাব নানা রকম পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে অনলাইন উদ্যোক্তাদের।

করোনাকালে অনেকে হারিয়েছেন চাকরি। ঘরে বসেই হচ্ছেন উদ্যোক্তা। তেমনই একজন শামীমা আখতার। কাজ করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। গত মে মাসে চাকরি হারান তিনি। শখের বসে ব্লকপ্রিন্ট ও বাটিকের কাজ করতেন। এ সময়ে আবার চাকরি না খুঁজে তাই ব্লকপ্রিন্টের পোশাক নিয়ে খুলেছেন ফেসবুক পেজ রং–ঢং। গত দুই মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি হয়েছে তাঁর।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন