বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মিটফোর্ড হাসপাতালে শুক্র থেকে সোমবার—এই চার দিনে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা যথাক্রমে ২৪১, ২১৬, ২৩৬ ও ১৯৮ জন।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পাঁচ। জুনে এই সংখ্যা ১৪। জুলাইয়ে ১০৪ জন। আগস্টের প্রথম ২০ দিনে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৩৩, যা আগের মাসের চেয়ে ২২৪ শতাংশ বেশি।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, সেখানে মোট ডেঙ্গু শনাক্তের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ হয় আগস্টে (প্রথম ২০ দিন)। ২৯ শতাংশ জুলাইয়ে। প্রায় ৪ শতাংশ জুনে। আর ১ দশমিক ৪০ শতাংশ জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শনাক্ত হয়।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে এ বছর ডেঙ্গুতে সাতটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে জুলাইয়ে চারটি ও আগস্টের প্রথম ২০ দিনে তিনটি শিশু মারা গেছে।

২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। গত বছর তা কম ছিল। কিন্তু এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩০০ লোক প্রাণ হারায়। যদিও সরকারি হিসাবে সংখ্যাটি ১৭৯। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সে সময় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ২০২০ সালে শনাক্ত রোগী সংখ্যা ১ হাজার ৪০৫। কিন্তু চলতি বছর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৮৫০ ছাড়িয়েছে। আর মৃত্যুর সংখ্যা ৪০।

মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ উন নবী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগী তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। সে অনুযায়ী আমরা সেপ্টেম্বরের জন্য প্রস্তুত আছি। এক সপ্তাহে আগের চেয়ে বেশি রোগী ছিল। আমাদের এখানে ডেঙ্গু রোগী ক্রমাগত বৃদ্ধির প্রবণতায় আছে।’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের রোগতত্ত্ববিদ কিংকর ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে, কমেছে করোনায় সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা।

default-image

ডেঙ্গু বনাম করোনা: ঢাকা শিশু হাসপাতাল

যেসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ও করোনা রোগী বেশি, তার মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতাল অন্যতম। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোববার হাসপাতালটিতে চারজন করোনা রোগী ভর্তি হয়। বিপরীতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় নয়জন।

সাপ্তাহিক হিসাবে, রোববার পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়া করোনা রোগীর সংখ্যা সাত। রোববারের আগে টানা তিন দিন হাসপাতালটিতে কোনো করোনা রোগী ভর্তি হয়নি। অন্যদিকে, একই সপ্তাহে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় ৯৪ জন। এ সময় প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে বলে জানান হাসপাতালটির রোগতত্ত্ববিদ কিংকর ঘোষ।

হাসপাতালটিতে রোববার দেখা যায়, করোনায় সংক্রমিত রোগী ভর্তি আছে মোট ১১ জন। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ভর্তি রোগী ছিল ৬৯ জন।

default-image

করোনা কমার কারণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা মোজাহেরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দেশে এখন করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু কমার পেছনে কিছু কারণ কাজ করেছে। লকডাউন সীমিতভাবে কাজ দিয়েছে। টিকাদানের বিষয়টিও ভালো কাজ করছে; যদিও কমসংখ্যক লোক টিকা নিয়েছেন। কিন্তু যাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশ জনসমাগম হয়, এমন স্থানে নিয়মিত চলাফেরা করতেন। তা ছাড়া মানুষ সম্প্রতি অনেক সচেতন হয়েছে। বেড়েছে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া।

কবে নাগাদ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কমতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে মোজাহেরুল হক বলেন, শনাক্তের হার ১৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। এটা ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। তারপর যদি এই হার ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ দিন বজায় থাকে, তাহলে মনে করা যায় যে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আর বর্তমান হার যদি টানা ১০ দিনে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অন্যদিকে, শনাক্তের হার বেড়ে গেলে বুঝতে হবে তৃতীয় ঢেউ এসেছে।

ডেঙ্গু যে কারণে ঊর্ধ্বমুখী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মশা বিষয়ে জাপানের কানাজোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছর ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। এ বছর এপ্রিল ও মে মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি ছিল। দেশে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযোগী তাপমাত্রা ছিল।

কবিরুল বাশার বলেন, এক বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ হলে পরেরবার তা কম হয়। কারণ, অনেকের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। আবার লোকজনও সচেতন থাকে। সেই হিসাবে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে প্রকোপ বেশ কম ছিল। কিছু সময় পার হলে মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে দুর্ভাবনাহীন হয়ে যায়। অসচেতনতার কারণে আবার বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ গত বছরের তুলনায় বেশি।

অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এবার ডেঙ্গু রোগ বৃদ্ধির এ প্রবণতা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে। এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ও বৃষ্টিপাতের ধরন দেখা বলা যায়, সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ প্রকোপ কমবে না। তাই এখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। জনগণকেও এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন