বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: দেশে প্রায় প্রতিবছরই নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। অদক্ষ চালক, প্রতিযোগিতা, দুর্যোগের মধ্যে পড়া কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনার কথা আমরা জানি। এবার ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী একটি চলন্ত লঞ্চে আগুনে এখন পর্যন্ত ৪৫ জনের মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে। এসব দুর্ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: সাধারণত যেসব কারণে নৌ দুর্ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে অগ্নিকাণ্ড অন্যতম। তাই অন্যান্য দুর্ঘটনার সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। জাহাজে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি সব সময়ই বিদ্যমান থাকে। তাই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ঝুঁকি থেকে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
নৌযানে যখন আগুন লাগে, তখন অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহার জরুরি। কিন্তু নৌযানে থাকা সরঞ্জামগুলো ব্যবহারে দক্ষ মানুষ না থাকলে তা দিয়ে আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। এটি গুরুতর ক্ষতির কারণ। আন্তর্জাতিকভাবে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, সম্প্রতি নৌযানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৪ সালে মোট ৩ হাজার ২৫টি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪৪ শতাংশ পণ্যবাহী নৌযানে। অগ্নি দুর্ঘটনার ২৩ শতাংশ যাত্রীবাহী নৌযান ও ১৫ শতাংশ সার্ভিস জাহাজে ঘটেছে। আর বাকি ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য জাহাজে। বাংলাদেশে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রিপোর্ট (নথিভুক্ত) করা হয় না। ফলে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

default-image

প্রথম আলো: নৌযানে দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে অগ্নিকাণ্ড অন্যতম হয়ে থাকলে, সেই ঝুঁকি কি আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম? আবার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও তো সামনে আসে না।

এ কে এম শফিকউল্লাহ: আসলে আগুনের ঘটনা প্রায় সময়ই ঘটে। ঘটনাচক্রে সেগুলো থেকে আমরা কোনো রকমে পার পেয়ে যাই। কিন্তু আগুন নেভানোর যথাযথ কৌশলের নিয়মিত অনুশীলন বা চর্চা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সর্বশেষ লঞ্চে আগুনের ঘটনা হলো এর উদাহরণ।

প্রথম আলো: ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে চলন্ত লঞ্চে আগুনের ঘটনাটি নিয়ে কী বলবেন?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: এটা সচেতনতা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব। সব নৌযানে এই ঝুঁকি নিরসনের জন্য প্রতি মাসে অন্তত একবার ফায়ার ড্রিল (আগুন নেভানোর মহড়া) করার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে জাহাজগুলোতে এই বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। এ কারণেই অগ্নিকাণ্ড যখন ঘটে, তখন সত্যিকার অর্থেই যথাযথভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকে না।

প্রথম আলো: গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে সাত শতাধিক নৌ দুর্ঘটনায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠনের পর প্রতিবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কিংবা প্রাণহানি তো কমছে না। আসলে মূল গলদটা কোথায়?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: দুর্ঘটনা একেবারে রোধ করা কখনোই সম্ভব নয়। দুর্ঘটনা অতীতেও ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। তবে আমাদের সবারই প্রচেষ্টা থাকা উচিত কী করে এই দুর্ঘটনার ঝুঁকির মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। একটা বিষয় আমাদের সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে, তা হচ্ছে দুর্ঘটনা ঘটে মানুষের ভুলের কারণে এবং কীভাবে এ ভুলের পরিমাণ কমানো যায়, তা নির্ধারণ করা। আর এ জন্য প্রয়োজন প্রতিটি দুর্ঘটনার সঠিক কারিগরি অনুসন্ধান (টেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন)। দুর্ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দুটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে—প্রথমত, দুর্ঘটনার তদন্ত যাঁরা করেন, তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্ঘটনায় কারিগরি তদন্তে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করার প্রবণতাটি পরিহার করতে হবে। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এটাই কারিগরি তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা নির্ধারণ করা নয়।

কোনো মানুষই জেনেশুনে ভুল করে না। ভুল করার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে জ্ঞানের অভাব অথবা সঠিক পদ্ধতি অনুসরণে ঘাটতি। কেউ যদি জেনেশুনে ভুল করে, সেটা দুর্ঘটনা নয়, সেটা স্যাবোটাজ (আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড)। দুর্ঘটনা ও স্যাবোটাজকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দেখতে হবে। দুর্ঘটনা এমন একটি বিষয়, যার কারণ আমরা কেউ জানতাম না। এমনকি যিনি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন, তিনি নিজেও জানতেন না, কীভাবে তাঁর ভুলের কারণে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অতএব কারিগরি অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেই অজানা বিষয়গুলো বের করে এনে সবাইকে জানানোই মূল উদ্দেশ্য হওয়া দরকার। আমাদের দেশে বর্তমানে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত। এ দেশে কারিগরি তদন্ত না করে সব ক্ষেত্রেই দায়দায়িত্ব নির্ধারণে তদন্ত করা হয়। অর্থাৎ ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাঁকে শাস্তি দিলেই ভবিষ্যতের সব দুর্ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা হয়। এ ধরনের ধারণা একটি বড় ভুল, যা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। দায়দায়িত্ব নির্ধারণের তদন্তে কখনো সঠিক তথ্য বের হয়ে আসে না।

প্রথম আলো: আপনি কি বলছেন দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী সংস্থা বা ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের বিষয়টি আমলে নেওয়ার দরকার নেই?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: অপরাধ ও ভুলকে একইভাবে বিচার করা যাবে না। অপরাধ শাস্তিযোগ্য, কিন্তু ভুল শাস্তিযোগ্য নয়। আমাদের নির্ধারণ করতে হবে, ঘটনাটি ঘটেছে কি কোনো ভুলের কারণে, নাকি কোনো অপরাধের কারণে (দায়িত্বে অবহেলা, খামখেয়ালিপনা ইত্যাদি)। ভুল হলো এমন একটি বিষয়, যা ব্যক্তি বা সংস্থা নিজেই জানত না। সে ক্ষেত্রে ভুলের বিষয়টি শনাক্ত করে সবাইকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তদন্তের মুখ্য উদ্দেশ্য। আর অপরাধের ঘটনা ঘটলে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু আমরা অপরাধীর দায়দায়িত্ব নির্ধারণের মনোভাব নিয়ে তদন্ত শুরু করি। সে ক্ষেত্রে ভুল উদ্‌ঘাটনের বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এতে ঘটনার প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে না। এ কারণে বারবার একই ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রয়োজনে কারিগরি তদন্তের শেষে দায়দায়িত্ব নিরূপণে তদন্ত করতে হবে।

প্রথম আলো: শিল্পকারখানা, আবাসিক ভবন, সড়ক, কিংবা নৌ—নানা ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে। সব দুর্ঘটনার তদন্ত কি একইভাবে হতে পারে? ঘটনার ধরন ও প্রকৃতি তো ভিন্ন ভিন্ন।

এ কে এম শফিকউল্লাহ: সব দুর্ঘটনায় একটি বিষয় অভিন্ন, সেটা হচ্ছে মানুষের ভুল। মানুষ সাধারণত কোথায় কী ধরনের ভুল করে, সেগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলেই শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি, রাস্তাঘাট সব ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

প্রথম আলো: ঝালকাঠিতে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি হয়েছে। দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির সদস্যদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি আমলারা প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। কিন্তু ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে যাঁরা দক্ষতাসম্পন্ন, সেটা কারিগরি হোক কিংবা অভিজ্ঞতায় হোক—তাঁদেরই কি প্রাধান্য দেওয়া উচিত?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: দুর্ঘটনার তদন্তে দুটি বিষয় প্রাধান্য পাওয়া উচিত। প্রথমত, যাঁরা দুর্ঘটনার তদন্ত করবেন, তাঁদের সে বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্ঘটনার তদন্ত করার ক্ষেত্রে কারিগরি বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আমাদের দেশে সাধারণত দেখা যায়, কারিগরি বিষয়ে তদন্ত করেন নন-টেকনিক্যাল (কারিগরি বিষয়ে দক্ষতাহীন) মানুষ। এটা একেবারেই অনুচিত। কারণ, একটি জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মানুষ কখনোই বুঝতে পারবে না কী ধরনের কারিগরি ভুল হয়েছিল। তদন্ত করতে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দরকার, তা নেই—এমন উচ্চপদে আসীন একজন ব্যক্তি বা আমলাকে সেই দায়িত্ব দেওয়া সঠিক কাজ নয়। এ বিষয়গুলো আমাদের যথাযথভাবে অনুসরণ করা উচিত।

প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের নদ–নদীতে সাত লাখের বেশি নৌযান চলাচল করে। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ যাত্রীবাহী, বাকিটা পণ্যবাহী। নৌযানের ফিটনেস সনদ, চালকের দক্ষতা নিশ্চিতসহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি মোকাবিলায় নানা আলোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি কি আপনি দেখেন?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: আমাদের দেশের বিশাল নৌ খাত নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থার জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। ২৪ হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নৌপথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য আছে মাত্র কয়েকজন পরিদর্শক, যেখানে আমার প্রয়োজন কয়েক শ। ঠিক একইভাবে নৌযানগুলোর ফিটনেস যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক সনদ প্রদানের যে ধরনের জনবল প্রয়োজন, দেশে তার তুলনায় অনেক কম আছে। তা ছাড়া নদীপথে উপস্থিতির জন্য তাদের প্রয়োজনীয় রিভার ক্রাফট (নৌযান) ও অন্যান্য সরঞ্জাম নেই। এই বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথম আলো: নৌ দুর্ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কী বলে? আমাদের দেশের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

এ কে এম শফিকউল্লাহ: আমাদের দেশের নৌ খাত বিশাল। যেখানে লাখ লাখ নৌযান প্রতিনিয়ত চলাচল করে, সেখানে এই খাতটি নিয়ন্ত্রণে যে রকম একটি সংস্থা প্রয়োজন। ঠিক একইভাবে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে, তার তদন্ত ও দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি আলাদা সংস্থা প্রয়োজন। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের সংস্থা আছে, যাকে বলা হয় মেরিটাইম অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এমএআইবি)। এ ধরনের সংস্থা অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে কাজ করে। আমাদের উচিত এ ধরনের একটি সংস্থা গঠন করে দুর্ঘটনার তদন্ত এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন