কাসুন্দি এনেছে সচ্ছলতা

বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করে বিক্রির জন্য পাবনার বেড়া পৌরসভার মৈত্রবাঁধা মহল্লার একটি বাড়ি থেকে কাসুন্দি কিনছেন কয়েকজন নারী l ছবি: প্রথম আলো
বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করে বিক্রির জন্য পাবনার বেড়া পৌরসভার মৈত্রবাঁধা মহল্লার একটি বাড়ি থেকে কাসুন্দি কিনছেন কয়েকজন নারী l ছবি: প্রথম আলো

কাঁচা আম, আমড়া, কামরাঙ​া, চালতার মতো টকজাতীয় ফলের স্বাদ বহু গুণ বাড়িয়ে দেয় কাসুন্দি৷ মুখরোচক এ খাবার তৈরিতে দক্ষতার পাশাপাশি পোহাতে হয় নানা হুজ্জত৷ এ কাসুন্দি তৈরি ও বাজারজাত করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন পাবনার বেড়া পৌরসভার অন্তত দুই শ নারী৷ শুধু বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে (কাসুন্দি মৌসুম) কাসুন্দি তৈরি করে একেকজন নারী ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন৷
বেড়ার মৈত্রবাঁধা মহিলা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও স্কুলশিক্ষক শিখা রাহা বলেন, কাসুন্দি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত নারীদের প্রত্যেকেই দরিদ্র৷ সারা বছর ধরে তাঁরা কাসুন্দি মৌসুমের জন্য অপেক্ষায় থাকেন৷ কারণ, এ মৌসুমে তাঁরা যা আয় করেন, তাতে তাঁদের অভাব অনেকটাই দূর হয়৷
শুরু যেভাবে: বছর বিশেক আগের কথা৷ মৈত্রবাঁধা গ্রামের গুটি কয়েক নারী শুধু নিজেদের বাড়ির জন্য কাসুন্দি তৈরি করতেন৷ তাঁদের মধ্যে শুধু গঙ্গারানী বিক্রি শুরু করেন৷ একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে শিখে গ্রামের আরও অনেক নারী বাণিজ্যিকভাবে কাসুন্দি তৈরি শুরু করেন৷ বর্তমানে পৌরসভার মৈত্রবাঁধা ও শেখপাড়া মহল্লার ১৭ বাড়িতে বাণিজ্যিকভাবে এটি তৈরি হচ্ছে৷ আর এ বাড়িগুলো থেকে দেড় শতাধিক নারী পাইকারি দরে তা কিনে ফেরি করে বিক্রি করছেন বিভিন্ন এলাকায়৷

যেভাবে বানানো হয়: বয়সের ভারে গঙ্গারানী এখন আর কাসুন্দি তৈরি করেন না৷ তাঁর কােছ জানা যায় কলাকৌশল৷ তিনি জানান, কাসুন্দি তৈরির প্রধান উপকরণ সরিষা৷ এ ছাড়া প্রয়োজন জিরা, হলুদ, শুকনো মরিচ, জাউন, সলুপ, ধনিয়া, তেজপাতাসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা৷ সরিষাসহ মসলাগুলোকে প্রথমে কড়া রোদে শুকিয়ে পৃথকভাবে ঢেঁকিতে গুঁড়া করতে হয়৷ এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ​েফাটানো গরম পানির সঙ্গে প্রথমে সরিষার গুঁড়া মেশাতে হয়৷ পরে তাতে লবণসহ গুঁড়া করা মসলাগুলো পরিমাণমতো মিশিয়ে নিলেই তৈরি হয় সুস্বাদু কাসুন্দি৷

স্বাবলম্বী নারীরা: সম্প্রতি মৈত্রবাঁধা ও শেখপাড়া মহল্লায় গিয়ে দেখা যায়, কোনো বাড়িতে হয়তো ঢেঁকিতে সরিষাসহ বিভিন্ন রকমের মসলা গুঁড়া করা হচ্ছে৷ কোথাও সরিষার গুঁড়া বা মসলা গরম পানিতে গুলিয়ে তৈরি হচ্ছে কাসুন্দি৷ আবার কোথাও রোদে শুকানো হচ্ছে নানা উপকরণ৷

মৈত্রবাঁধা ও শেখপাড়া মহল্লার ১৭টি পরিবার প্রতিদিন গড়ে ছয় কেজি করে সরিষা গুঁড়া করে৷ প্রতি কেজি সরিষার গুঁড়া থেকে প্রায় ছয় লিটার করে কাসুন্দি তৈরি হয়৷ কাসুন্দি তৈরির কারিগর মৈত্রবাঁধা মহল্লার মালতি বেগম ও শেখপাড়া মহল্লার রেখা খাতুন জানান, ঝাঁজালো জাতের সরিষাই কাসুন্দির জন্য সবচেয়ে উপযোগী৷ এ-জাতীয় সরিষাকে স্থানীয়ভাবে রাই বলা হয়৷ প্রতি কেজি সরিষার দাম ৪৮ টাকা৷ এক কেজি সরিষায় হলুদ, মরিচসহ বিভিন্ন মসলা ও জ্বালা​িন বাবদ ব্যয় হয় আরও ২৫ টাকা৷ এরপর তাঁরা ২৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি করেন৷ এভাবে গড়ে ছয় কেজি সরিষার গুঁড়া থেকে কাসুন্দি বানিয়ে দৈনিক প্রতিটি পরিবারের লাভ থাকে ৪৬২ টাকার মতো৷

কাসুন্দি তৈরির সঙ্গে জড়িত শেখপাড়ার আনু খাতুন (৪০) ও তাঁর পুত্রবধূ ফুলমালা খাতুন (২৭) আফসোস করে বলেন, দুই মাস না হয়ে তাঁরা যদি সারা বছর কাসুন্দি তৈরি করতে পারতেন তবে বাড়িতে দালান দেওয়া যেত৷ অল্প সময়েই তাঁরা যা আয় করেন তাতে বছরের বাকি মাসগুলো ভালোভাবে কাটে৷

বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করে কাসুন্দি বিক্রি করেন মৈত্রবাঁধা মহল্লার নূরু বেগম (৫৫)৷ তিনি বলেন, ‘আমাগরে এলাকার কাসুনের (কাসুন্দি) সুনাম দূর-দূরান্তে ছড়ায়া গ্যাছে৷ এই কাসুন বেচার জন্যে একদিকে পাবনা, আরেক দিকে সেই শাহজাদপুরের (সিরাজগঞ্জ) নানা জায়গায় যাই৷ সব বাদ দিয়্যা দৈনিক তিন শ থেকে চার শ টাকা লাভ থাকে৷’