কিশোরগঞ্জের নয়নাভিরাম হাওর ভ্রমণ

বিজ্ঞাপন
default-image

‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’—এ মহাসত্য বাণীকে প্রমাণ করার জন্য আমরা দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াই। খোঁজার চেষ্টা করি প্রকৃতি কোথায় তার অপরূপ ঢেলে দিয়েছে প্রকৃতিপ্রেমিকদের আকর্ষণ করার জন্য। কিন্তু প্রকৃতির যে সৌন্দর্য আমরা উদ্‌ঘাটন করতে বের হই, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা ব্যর্থ হই। বাড়ির পাশেই অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি উপভোগ না করে আমরা ছুটে বেড়াই পৃথিবীর নানা প্রান্তে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পাহাড়, হাওর, বাঁওড়, ধানখেত, নদীবেষ্টিত প্রিয় মাতৃভূমির লোকায়িত রূপ অধরাই থেকে যায় বহু ভ্রমণপিপাসুর কাছে।

বাংলাদেশে অসংখ্য পর্যটন এলাকা রয়েছে, যার মধ্যে কিশোরগঞ্জের হাওরগুলো প্রকৃতির অশেষ দান। দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মনে আনন্দের ঢেউ তুলবে। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে বন্ধুদের নিয়ে বের হই ঢাকা–কিশোরগঞ্জ রোডে পুলেরঘাট/কালিয়াচাপড়া বাজার থেকে ২৪ কিলোমিটার পূর্বে নিকলীর হাওরের অপরূপ অবলোকন করতে। নীল আকাশ যেন তার সব সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে হাওরের জলরাশির অপর প্রান্তে। দূরের আকাশকে স্পর্শ করার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে শান্ত স্নিগ্ধ দ্বীপের মতো ভাসমান গ্রামগুলো। যত দূর চোখের দৃষ্টি যায় নীল জলরাশির ছোট ছোট ঢেউয়ের ভাঁজে ভেসে উঠে অর্ধডুবন্ত সবুজ গাছগাছালি। রাজহাঁসের স্বাধীন ছুটে চলা পুলকিত করে হাওরে ঘুরতে আসা সৌন্দর্যপ্রেমীদের। ছাতিরচরের অর্ধডুবন্ত করচের বন এবং হাওরের ছোট–বড় নৌকা দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য দেখে মনে হবে যেন এক একটি জীবন্ত ছবি।

default-image

কিশোরগঞ্জের বড় হাওরগুলো ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। হাওরবেষ্টিত এ জনপদে থইথই পানি থাকে পাঁচ থেকে ছয় মাস। পানি নেমে যাওয়ার পর সবুজ পালকে ভরে উঠে পুরো হাওর। সারা বছর হাওরের সৌন্দর্য অটুট থাকলেও মূলত বর্ষাকালই ভ্রমণপিপাসুদের মূল আকর্ষণ। হাওরে দেশের প্রকৃতিপ্রেমিকদের ভিড় হয় বর্ষায়। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা অটোয় যেতে হয় চামড়া বন্দর। চামড়া বন্দর থেকে নৌকায় বা স্পিডবোটে ইটনা, মিঠামইন কিংবা অষ্টগ্রাম যাওয়া যায়।

আমরা প্রথমে ইটনার দিকে যাত্রা শুরু করি। প্রায় ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর ইটনা পৌছাই। একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর বের হয়ে পড়ি ইটনার কিছু ঐতিহাসিক স্থাপত্য স্থাপনা দেখতে। দুপুরের খাবারের পর আবার ইটনা থেকে বের হই মিঠামইন এবং অষ্টগ্রামের হাওর দেখতে। হাওরের মধ্য দিয়ে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম দ্বীপের মতো তিন উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে অলওয়েদার সড়ক। দুপাশে বিস্তৃত নীল জলরাশি, মাঝ দিয়ে এই রাস্তা প্রকৃতিপ্রেমিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় হাওরের বিশালতার সঙ্গে। সূর্যের আলোয় ঝলমল করা জলরাশি দেখতে দেখতে পর্যটকেরা উপভোগ করতে পারেন সমুদ্রসৈকতের স্বাদ।

হাওরের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে বের হতে হয় রাতে। নিস্তব্ধ হাওর যেন আঁকড়ে ধরে কান পেতে নীরবতাকে অনুভব করার জন্য। রাতের হাওর উপভোগ করার জন্য আমরা নৌকা ভাড়া করেছিলাম। যখন নৌকা চলতে শুরু করেছে, তখন চাঁদ পূর্ব দিকে হাওরের জলে কেবল ভাসতে শুরু করেছে। দূরের নৌকা থেকে ভেসে আসছে গান। পানির ছোট ছোট ঢেউয়ের নিচে চাঁদের প্রতিবিম্ব যেকোনো মানুষের হৃদয় কেড়ে নেবে। মনে হবে যেন প্রকৃতি তার সমস্ত রূপ–যৌবন ঢেলে দিয়েছে হাওরের শান্ত জলে। নীরব–নিস্তব্ধ হাওরে নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে কখন যে চাঁদমামা আমাদের ছেড়ে মধ্য আকাশে উঠে গেছে, আমরা কেউ বুঝতেই পারিনি।

default-image

ভ্রমণের জন্য কিশোরগঞ্জের বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড় হয়। এর মধ্যে নিকলী বেড়িবাঁধ, ছাতিরচরের অর্ধডুবন্ত করচের বন, করিমগঞ্জের বালিখলা, মিঠামইন উপজেলার কামালপুরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বাড়ি, ইটনা, মিঠামইন এবং অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক। এ ছাড়া ভ্রমণপিপাসুদের নজর কাড়ে বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত মন্দির, দিল্লির আখড়া, ঈসা খাঁর দুর্গসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা।

ঢাকা থেকে চার ঘণ্টার দূরত্বে নয়নাভিরাম সব দৃশ্য উপভোগ করতে হলে যেতে হবে কিশোরগঞ্জে। মহাখালী থেকে অনন্যা, সায়েদাবাদ থেকে অনন্যা সুপার বাসে করে কিশোরগঞ্জ আসা যাবে। শুধু নিকলী হাওর ভ্রমণের জন্য নামতে হবে কটিয়াদী অথবা পুলেরঘাট বাজার। সেখান থেকে অতি সহজে বাইকে বা ইজিবাইকে নিকলী ভ্রমণ করা যাবে।

default-image

ট্রেনে আসতে চাইলে এগারসিন্দুর প্রভাতী বা কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস করে আসতে হবে। নিকলী ভ্রমণের জন্য ট্রেনে কিশোরগঞ্জ স্টেশনের পূর্বে গচিহাটা নেমে ইজিবাইকে যাওয়া যাবে। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম হাওর ভ্রমণের জন্য আসতে হবে কিশোরগঞ্জ। সেখান থেকে চামড়া বন্দর হয়ে যাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। ঢাকা ছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে আগত পর্যটকেরাও কিশোরগঞ্জ হয়ে উল্লেখিত উপায়ে হাওরে ভ্রমণ করতে পারবেন।

হাওরগুলোয় থাকা–খাওয়ার জন্য ভালো হোটেল–রেস্টুরেন্ট না থাকলেও মোটামুটি মানের খাবার পাবেন। রাতে থাকার জন্য হাওরের তুলনায় কিশোরগঞ্জ শহরে ভালো মানের হোটেল পাওয়া যাবে। হাওরের পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে দু–তিন দিন সময় নিয়ে বের হওয়াই উত্তম এবং যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে মাথায় রাখতে হবে বাড়তি সতর্কতা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন