বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
কেব্‌ল টিভি নেটওয়ার্ক প্রায় পুরোটাই অ্যানালগ। এই বাজার থেকেই আসছে প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা, ডিজিটালে আগ্রহ নেই কারও।

ক্লিন ফিডে যে কারণে আপত্তি

এ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চ্যানেল ক্লিন ফিড করা পরিবেশক বা কেব্‌ল অপারেটরদের কাজ নয়। প্রতিটি ব্রডকাস্টার (চ্যানেল কর্তৃপক্ষ) ক্লিন ফিড ও ডার্টি ফিড আলাদা করে করে। কিনতে খরচ কম হয় বলে বাংলাদেশে ডার্টি ফিড ডাউনলিংক করা হয়।

ব্রডকাস্টাররা বাংলাদেশের জন্য ডার্টি ফিড (বিজ্ঞাপনযুক্ত) করে পাঠায়। এতে ব্রডকাস্টারদের লাভ। কেননা ওই বিজ্ঞাপনের জন্য তারা টাকা পাচ্ছে। পাশাপাশি এ দেশীয় পরিবেশকদের কাছ থেকেও টাকা পাচ্ছে।

১ অক্টোবর শুক্রবার থেকে সব মিলিয়ে ৬৫-৭০টি বিদেশি টিভি চ্যানেল বাংলাদেশের দর্শকেরা দেখতে পারছিলেন না। তবে ৬ অক্টোবর দেশে ক্লিন ফিড আসা ১৪টি চ্যানেল আবার সম্প্রচারে এসেছে। তথ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সম্প্রচারে থাকা বিদেশি চ্যানেলগুলো হলো বিবিসি, সিএনএন, আল–জাজিরা, এইচডি, ডিডব্লিউ, কেবিএস ওয়ার্ল্ড, এআরআই র‌্যাংগ টিভি, এনএইচকে ওয়ার্ল্ড, সিজিটিএন, রাশিয়া টুডে, ফ্রান্স টিভি, লোটাস, ট্রাভেল এক্সপি এইচডি, আল কোরআন, আল সুন্না, ট্রাভেল এক্সপি ও দূরদর্শন।

বাংলাদেশ কেব্‌ল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) সভাপতি এস এম আনোয়ার পারভেজের দাবি, ক্লিন ফিড আনা বা সম্প্রচারের ক্ষেত্রে অপারেটরদের কিছু করার নেই।

অবশ্য একটি সূত্র বলছে, শ্রীলঙ্কার বাজার বাংলাদেশের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। অথচ ক্লিন ফিড চ্যানেল ও বিদেশি বিজ্ঞাপন বিষয়ে দেশটির সরকারের অবস্থানের কারণে এ খাতে আয় বাংলাদেশের ৫ গুণ বেশি। এমনকি বাংলাদেশের তুলনায় নেপালের বাজার অনেক ছোট হলেও সেখানে ক্লিন ফিড চালু। ভারতও ২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পুরো ব্যবস্থা ডিজিটাল করেছে। সেখানে কোনো অ্যানালগ পদ্ধতি নেই। ফলে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ, অপারেটর, পরিবেশক এবং সরকার নিজ নিজ ভাগের টাকা বুঝে পাচ্ছেন।

বাংলাদেশে এ খাত নিয়ে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশে ৪ হাজারের বেশি কেব্‌ল অপারেটর আছেন। এঁদের মধ্যে ১ হাজার ২০০র মতো অপারেটর স্যাটেলাইটে আপলিংক হওয়া চ্যানেল সরাসরি ডাউনলিংক করেন। সেই ব্যবস্থা তাঁদের আছে। বাকিরা এসব অপারেটরের কাছ থেকে নেন। আবার বিদেশি সব চ্যানেলের ডিস্ট্রিবিউটর বাংলাদেশে নেই। অনেক চ্যানেল আছে, যেগুলো সরাসরি স্যাটেলাইটে ব্রডকাস্টারের দেওয়া আপলিংক থেকে অপারেটররা কেব্‌ল ডাউনলিংক করেন।

বাংলাদেশের বাজার অ্যানালগ হওয়ায় প্রকৃত কেব্‌ল গ্রাহকের সংখ্যা জানা যায় না। তবে এ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে প্রায় সবার বাড়িতেই কেব্‌ল সংযোগ আছে। এ ছাড়া নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বাড়িতে সংযোগ আছে। সব মিলিয়ে সারা দেশে দেড় কোটির বেশি সংযোগ রয়েছে। প্রতি মাসে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ফি দেন গ্রাহকেরা।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, অপারেটরদের ক্লিন ফিড চ্যানেলের সম্প্রচার করতে হবে। আর সময় বাড়ানো হবে না। দুই বছর ধরে তাগাদা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তাঁরা আইনকে পাত্তা দিচ্ছিলেন না। তবে বিজ্ঞাপনমুক্ত চ্যানেল সম্প্রচার করতে হবে, এ খাত ডিজিটালও করতে হবে। সরকারের দিক থেকে করণীয় যা কিছু থাকবে, সেটা করা হবে।

যা করতে হবে

বাংলাদেশে জনপ্রিয় বিদেশি চ্যানেলের মধ্যে ভারতীয় চ্যানেলের আধিপত্যই বেশি। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে ভারতীয় ব্রডকাস্টাররা ক্লিন ফিড সরবরাহ করে। এমনকি আরবি ভাষায় ডাব করেও চ্যানেল চালানো হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ একক দেশ হিসেবে অনেক বড় বাজার। অথচ বাংলাদেশে যে ফিড, সেখানে বিজ্ঞাপন জুড়ে দেওয়া হয়। এই বিজ্ঞাপনগুলো কেবল বাংলাদেশিদের জন্যই দেওয়া হয়। এটি ভারতে এভাবে প্রচারিত হওয়া না। সেখানে অন্য বিজ্ঞাপন আসে।

ভারতের কালারস গ্রুপের কয়েকটি চ্যানেল বাংলাদেশে বিপণন করে ওয়ান অ্যালায়েন্স। স্যাটেলাইট চ্যানেলের পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ওয়ান অ্যালায়েন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম সাইফুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে মার্কেটের যে সাইজ, সেই অনুযায়ী ব্রডকাস্টাররা খরচে কুলাতে পারছে না। সৌদি আরব, আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডে গ্রাহককে মাসে ১৫ থেকে ২৫ ডলার দিতে হয়, সেখানে এ দেশে ১৫০–২০০ টাকায় সেবা নিচ্ছেন গ্রাহকেরা।

অবশ্য ভারতে গ্রাহক মাসে ৩৫০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে এই সেবা পান। শ্রীলঙ্কায় সেবা পেতে ব্যয় করতে হয় ২৫০ থেকে ৭০০ টাকা।

জি নেটওয়ার্ক, সনি গ্রুপের, টেন স্পোর্টস, ডিসকভারি গ্রুপের চ্যানেলগুলোসহ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চ্যানেলের পরিবেশক মিডিয়া কেয়ার লিমিটেড। নেশনওয়াইড মিডিয়া বাংলাদেশে সিএনএন, কার্টুন নেটওয়ার্ক গ্রুপের চ্যানেলগুলোর পরিবেশক। জাদু ভিশন স্টারের চ্যানেলগুলোর পরিবেশক।

default-image

পরিবেশকেরা বলছেন, ক্লিন ফিডের জন্য যন্ত্রাংশ বসাতে যদি গ্রাহকপ্রতি ১৫ ডলারও খরচ হয়, তাহলে পুরো ইন্ডাস্ট্রি দাঁড় করাতে ১৫ থেকে ২০ কোটি ডলার (১৫০০-১৮০০ কোটি টাকা) প্রয়োজন।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দূরদর্শন ডিটিএইচ-ডিডি ফ্রি ডিশের মাধ্যমে ভারতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সম্প্রচার শুরু করা হয়। বিটিভির সাবেক মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা হারুন-অর-রশিদ এ নিয়ে বলেন, ভারতে মূলত বিটিভির ক্লিন ফিড দেওয়া হয়। ইত্যাদিসহ দুয়েকটি অনুষ্ঠান বিজ্ঞাপনসহ প্রচার করা হলেও ডিটিএইচ-ডিডি ফ্রি ডিশের সার্ভারে সেই বিজ্ঞাপনগুলো বাদ দিয়ে তা ভারতে দেখানো হয়। বাংলাদেশের চ্যানেল বিদেশে সম্প্রচার করা হলে সেখানে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় না। তাঁর মতে, ক্লিন ফিড সম্প্রচার কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ হলেও এটি খুব সহজে এবং দ্রুতই করা সম্ভব।

একজন পরিবেশক নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে ১২০০ অপারেটর আছে, যারা পৃথকভাবে চ্যানেল ডাউনলিংক করে। অথচ সিঙ্গাপুরে মাত্র ৩টি, ভারতে ২০টি, যুক্তরাজ্যে ৪টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি প্রতিষ্ঠান এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বড় বাজারে অল্প প্রতিষ্ঠান। ফলে তারা যে আয় করে, তা তাদের খরচ পোষাতে পারে।

টপ অব মাইন্ডের গ্রুপ চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দিন আদিল বলেন, ‘আমরা এত দিন ফিল্টার ছাড়া পানি খেয়েছি। এখন ফিল্টারসহ খাব। এর একটা সুফল তো আছে। তেমনি ক্লিন ফিড সম্প্রচারের বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোর বিজ্ঞাপন বাড়ার সুযোগ আছে। বিজ্ঞাপনের বাজার বাড়বে। ফলে এখানে জড়িত নির্মাতা, মডেল ও অন্যান্য সব পক্ষই সুফল পাবে।’

ক্লিন ফিড না হলে ক্ষতি কোথায়

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অন্যতম মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকদের মধ্যে একটি বড় অংশ ভারতীয় বিভিন্ন চ্যানেলের দর্শক। এসব চ্যানেলে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। ওই বিদেশি পণ্য বাংলাদেশের বাজারেও বিক্রি হয়। এ কারণে ওই পণ্য আমদানিকারকেরা বাংলাদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না।

নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ক্লিন ফিডবিহীন চ্যানেলের দাবি বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদের দীর্ঘদিনের’।

অন্যদিকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন না হওয়ায় নতুন বিজ্ঞাপন তৈরি হয় না। বিজ্ঞাপনী সংস্থায় বিনিয়োগ হয় না। নানাবিধ খাত বিনিয়োগবঞ্চিত হয়।

সরকার বলছে, বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপনমুক্ত না হওয়ায় এ খাত প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আরেক সূত্র বলছে, বিদেশি চ্যানেল বিজ্ঞাপনমুক্ত হলে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোর অন্তত ৫০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন পাওয়ার সুযোগ আছে।

অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, বিদেশি চ্যানেলে বিভিন্ন পণ্যের ভারতীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে এ দেশে বিনা শুল্কে, বিনা মূল্যে বিরাট একটা ভোক্তাশ্রেণির কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তারা। দিনের পর দিন এটা চলতে পারে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন