
ছবিটি বিমূর্ত। লাল রঙের বিন্যাসে বিশেষভাবে আঁকা ছবি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যেন স্পর্শে বুঝে নিতে পারেন, তেমন করেই আঁকা। বিষয়টি স্পষ্ট হলো, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছবিটির ওপর যখন হাত রাখলেন। রঙের প্রলেপের স্পর্শে অনুভব করার চেষ্টা করলেন বঙ্গবন্ধুকে। চোখ নয়, মন দিয়ে তিনি অনুভব করলেন এ দেশের স্থপতিকে। ছবির লাল রং তিনি দেখতে পেলেন না, কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু বুঝতে অসুবিধা হলো না তাঁর। চিত্র প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া অনেকগুলো ছবির একটি এটি। এঁকেছেন নার্গিস পলি।
বৃষ্টিভেজা শুক্রবার বিকেলে শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালার গ্যালারিতে শুরু হয় ১০ জন বরেণ্য শিল্পীর আঁকা বঙ্গবন্ধুর ১০টি প্রতিকৃতি, বঙ্গবন্ধুকে উপলক্ষ করে বিশিষ্ট শিল্পীদের ১০৩টি শিল্পকর্ম এবং একাডেমীর সংগৃহীত ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক ৫০টি চিত্রকর্ম এবং একাডেমীর ৪ নম্বর গ্যালারিতে ৬০টি আলোকচিত্র নিয়ে ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক মোট ২২৩টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন সমরজিৎ রায়চৌধুরী, অলকেশ ঘোষ, আব্দুল মান্নান, রেজাউল করিম, নাসিম আহমেদ নাদভী, নাইমা হক, নাসরিন বেগম, আতিয়া ইসলাম, শেখ আফজাল, নাসিমা খানম, শাহজাহান আহমেদ, কিরীটী রঞ্জন বিশ্বাস প্রমুখ।
‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামগুলো তোমার সাহস নেবে, নেবে ফের বিপ্লবের মহান প্রেরণা’—জাতীয় চিত্রশালায় মূল দরজা দিয়ে ঢুকতেই বিশাল ক্যানভাসের লেখাটি মনে গেঁথে গেল। দোতলায় চিত্রশালার প্রথম প্রদর্শনী ঘর থেকে কানে ভেসে এল এসরাজের করুণ সুর। চারপাশের দেয়ালে নানা বয়সের বঙ্গবন্ধু।
আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদতবার্ষিকী। তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার জন্যই গতকাল শুক্রবার একাডেমীতে ছিল আলোচনা সভা, বঙ্গবন্ধুর ওপর আঁকা ছবি, আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী।
প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উপস্থিত ছিলেন একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলীসহ আরও অনেকে। গ্যালারির সবগুলো ঘরই ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। একটি ছবিতে চেয়ারে রাখা বঙ্গবন্ধুর সেই কালো কোট আর নিচে পড়ে আছে মোটা ফ্রেমের কালো চশমাটি। ক্যানভাস জুড়ে রক্তের লাল দাগ। শত্রুর বুলেটের আঘাতে বেদনার চিহ্ন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ক্যানভাসে। ‘পিতা-পুত্র’ শিরোনামের ছবিতে জাতির পিতার কোলে তাঁর প্রিয় সন্তান শেখ রাসেল। ‘বঙ্গবন্ধু’ কোলাজ ছবিতে নানা ভঙ্গিতে ধরা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ‘লাইট টু ডার্ক’ ছবির পুরোটা জুড়েই শোকের আবহ। এক কোনায় একটি শিল্পকর্মে কাচের আলাদা আলাদা বাক্সের ভেতর ১৫ আগস্টে হত্যাকাণ্ডে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের সবার ছবি। কাচের ভেতর দিয়ে সেখানে আসা–যাওয়া করছে বেদনার রং নীল। যাঁরা এই ছবির সামনে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস।
গতকাল শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ৩১ আগস্ট প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
প্রদর্শনী উদ্বোধনের পরই সন্ধ্যায় একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক স্মরণানুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব (১৯৭৩-৭৫) মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আলোচক ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।
আলোচনা শেষে সমবেত ও একক সংগীত, জারি গান, আবৃত্তি, নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। শুরুতেই ‘শোন একটি মুজিবুরের’ এবং ‘দুখিনী বাংলা জননী’ দুটি সমবেত সংগীত পরিবেশন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী রেপার্টরি সংগীত দল। ‘বঙ্গবন্ধু মুজিবুর বাংলার দুধের সর, তারে বিনে বাঁচে না প্রাণ’ পরিবেশন করেন শিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতি। গান, কবিতা, নাচ চলে পালাক্রমে।