ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, বিটিআরসি টিকটক ও ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। দেশের সামাজিক বাস্তবতায় কোনো কনটেন্ট বা বিষয় আপত্তিকর হলে যাতে তা সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নেয়, সে আহ্বান জানানো হয়েছে।

সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, অ্যাপের সংখ্যা অসংখ্য। টিকটক, লাইকিসহ কয়েকটি অ্যাপ বন্ধ করে দিয়ে চোর–পুলিশ খেলে কোনো লাভ হবে না। ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের (ভিপিএন) মাধ্যমে মানুষ ঠিকই বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করবে। তাই বিটিআরসি ইন্টারনেট ব্যবহারে প্যারেন্টাল গাইডলাইনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একজন অভিভাবকই বুঝতে পারবেন তাঁর সন্তান ইন্টারনেট কতক্ষণ ব্যবহার করছে বা কোন সাইটে ঢুকছে। তাই নিয়ন্ত্রণ করাটাও সহজ হবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন। সরকার জঙ্গিগোষ্ঠী প্রতিরোধে বেশ সক্ষমতার পরিচয় দিলেও পাচারকারী দলকে কেন প্রতিরোধ করতে পারছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। শাহীন আনাম বলেন, পাচার নতুন কোনো বিষয় নয়। সরকারের শক্ত অঙ্গীকার ও পাচার দমনে আইন আছে। এটি গুরুতর অপরাধ, তা–ও সবাই জানে। কিন্তু মেয়েশিশুরা পাচার হচ্ছেই। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক কালে টিকটক বা অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহার করে পাচারকারী চক্র মেয়ে ও শিশুদের ফাঁদে ফেলছে।

শাহীন আনাম বলেন, পাচার প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাচারের ঝুঁকিতে থাকা নারী ও শিশুদের সুরক্ষা ও নিরাপদ রাখার বিষয়টি নিয়েও চিন্তা করতে হবে। তা না হলে এটি থামানো কঠিন। পাচার প্রতিরোধে কীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায়, তাতেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ওয়েবিনারের বিশেষ অতিথি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ জানান, রাজধানীর হাতিরঝিল থানা এলাকায় টিকটক, লাইকি ব্যবহার করে মেয়েদের ফাঁদে ফেলে পাচারের পাঁচটি মামলা চলমান আছে। এসব মামলায় ২০ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ভারতে পাচার হওয়া এক মেয়ের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সবাই নড়েচড়ে বসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শাহানা হুদা। তিনি পাচারের মতো ‘লাভজনক ব্যবসার’ সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি বিশেষ করে সীমান্তে তদারকি বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পাচারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে জাতীয় ক্যাম্পেইন বা প্রচার বাড়ানোসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেন।

ওয়েবিনারে বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলেন, মানব পাচার দমনে সমন্বিত আইন আছে। তবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। পাচারের শিকার নারী ও শিশুরা পাচারকারীদের নাম, ঠিকানা দিতে না পারলে কাজ হচ্ছে না।

তার ভাষ্যমতে, পাচারের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীরা প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বেশি পারদর্শী। সেই তুলনায় আইনজীবী, ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ততটুকু দক্ষ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সালমা আলী। তিনি বলেন, গত বছর পাচারের মাত্র দুটি মামলায় রায় পাওয়া গেছে। পাচারের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরিয়ে আনার পর তাদের শেল্টারহোমে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এখানে কত দিন থাকবে, বাজেট বরাদ্দ আছে কি না, শেল্টারহোম থেকে তারপর সে কোথায় যাবে, এ বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়া জরুরি।
সালমা আলী বলেন, মানব পাচারকারী চক্রে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সমাজের রাঘববোয়ালেরা জড়িত। তাঁরা যাতে কোনোভাবেই পার না পান, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে ওয়ারা বাংলাদেশ থেকে নারী ও শিশু পাচারের প্রবণতা বেশি হওয়ার পেছনে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, করোনার প্রাদুর্ভাবে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, নারী ও পুরুষের বৈষম্যসহ বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের কোন পথগুলো দিয়ে নারী ও শিশুরা বেশি পাচার হচ্ছে, তা সবার জানা। করোনায় যশোর, সাতক্ষীরার এই পথগুলো দিয়ে মানুষ আসা–যাওয়া করতে পারছে না। অথচ পাচারকারীরা ঠিকই যেতে পারছে। সীমান্তে দায়িত্বপালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থান নিলে এটি কোনোভাবেই সম্ভব হতো না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উম্মে ওয়ারা বলেন, যারা পাচারের শিকার হচ্ছে, তাদের ৯০ ভাগই গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সদস্য। পাচারের ঝুঁকিতে থাকা এই জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি। ঢাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রম দিয়ে পাচার প্রতিরোধ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক। পাচারসহ বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনার মামলায় ভিকটিম ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনটি এখনো কেন আলোর মুখ দেখছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই সহকারী অধ্যাপক।

এপিকের (এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টার) নির্বাহী কাউন্সিল সদস্য সুমন আহমেদ সাবির প্রযুক্তিকে কীভাবে বিভিন্ন অপরাধ রোধে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, অ্যাপ বন্ধ করে দিলে সাময়িক সমাধান হলেও তা পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। পাচার প্রতিরোধে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি প্রয়োজন। আর এর জন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

ফেসবুক বা টিকটকের মাধ্যমেই সচেতনতামূলক ভিডিও প্রচার, শিক্ষার্থীদের জন্য ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে তার ওপর নম্বর দেওয়া, প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা এ ধরনের কার্যক্রম পাচার প্রতিরোধে বেশি সহায়ক হবে বলে মনে করেন সুমন আহমেদ সাবির।

ডি নেটের উপদেষ্টা (উদ্ভাবন) সিরাজুল হোসেন বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেসব পাচারের ঘটনা ঘটছে, সেগুলো অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে একদম শেষ পর্যায়ে বা অন্য কোনো দেশে নারী বা শিশুকে বিক্রি করে দেওয়ার পর। তাই এসব ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। কিশোরীদের মিডিয়ায় কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিশোর বয়সের হাইপার সেক্সুয়ালিটির (কারও কারও মধ্যে নিজেকে যৌন আবেদনময়ী করে উপস্থাপনের ঝোঁক থাকে) বিষয়ে খেয়াল বা সচেতন থাকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন তিনি।