খাবার স্যালাইন বিশ্বব্যাপী পাঁচ কোটি শিশুর জীবন রক্ষা করেছে

গ্রামগঞ্জে মুদিদোকানেও এখন পাওয়া যায় খাওয়ার স্যালাইন। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে স্যালাইনের প্যাকেট কিনে ফিরছেন এক বাবা। গতকাল বগুড়ার কাহালুর সাবানপুর গ্রামে।  সোয়েল রানা
গ্রামগঞ্জে মুদিদোকানেও এখন পাওয়া যায় খাওয়ার স্যালাইন। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে স্যালাইনের প্যাকেট কিনে ফিরছেন এক বাবা। গতকাল বগুড়ার কাহালুর সাবানপুর গ্রামে। সোয়েল রানা
>
  • পাঁচ কোটি শিশুর প্রাণ রক্ষা
  • গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রয়োগ-সবই বাংলাদেশে

খলিল মাতবরের বাসা রাজধানীর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। মাঝেমধ্যেই এলাকার মুদিদোকান থেকে খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট কেনেন। জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘ছেলের প্যাটে ব্যথা হইলেই কিনি। কারও পরামর্শে না। খাওয়াইলে ছেলেডার ভালো লাগে, তাই কিনি।’

পাড়ামহল্লার ওষুধের দোকানের পাশাপাশি এখন মুদিদোকানেও নানা রকম সওদাপাতির সঙ্গে স্যালাইনের প্যাকেট থাকে। দোকানিরা বলেছেন, গরম বাড়ছে, বিক্রিও বাড়ছে। গরমে ঘাম ঝরলে বা কায়িক পরিশ্রমের পর অনেকেই নিয়মিত স্যালাইন খান। অনেকের বাড়িতে স্যালাইন মজুত থাকে।

সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি) ১৯৮৫ সাল থেকে খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন) বাজারজাত করছে। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন বিভাগের প্রধান খন্দকার শামীম রহমান গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে
বলেন, তাঁদের হিসাব বলছে, চলতি ২০১৭-১৮অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন বিক্রি হবে।

এক প্যাকেট স্যালাইন আধা লিটার পানিতে গুলে খেতে হয়। এতে শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে স্যালাইনের প্যাকেট পাওয়া না গেলে আধা লিটার বিশুদ্ধ পানিতে এক মুঠ চিনি বা গুড় এবং এক চিমটি লবণ গুলে খেলে একই কাজ হয়। সহজ এই প্রযুক্তি এখন বিশ্বব্যাপী ডায়রিয়া বা উদরাময় চিকিৎসার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ডায়রিয়া বা উদরাময়। প্রতিবছর ৫ লাখ ২৫ হাজার শিশুর এতে মৃত্যু হচ্ছে। ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে পানি দ্রুত বের হয়ে যায়। ওআরএস সেই পানি প্রতিস্থাপন করে। এটি বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি শিশুর জীবন রক্ষা করেছে।

ওআরএস এল কোথা থেকে

ওআরএস নিয়ে গবেষণা, এর আবিষ্কার, মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল, মানুষকে ওআরএস বানাতে শেখানো—সবকিছুই হয়েছে বাংলাদেশে। মূল গবেষণা করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা। এটির সাবেক পরিচালক কে এম এস আজিজ গত বছর প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘শুধু আইসিডিডিআরবি নয়, পুরো বাংলাদেশই ছিল ওআরএসের গবেষণাগার। এখন বিশ্ব এর সুফল পাচ্ছে।’

গত শতকের ষাটের দশকে কলেরা গবেষণার জন্য মহাখালীতে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (সিআরএল, বর্তমানে আইসিডিডিআরবি) স্থাপন করা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা এখানে কাজ শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশি গবেষকেরা।

আইসিডিডিআরবি সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কলেরা রোগীদের পানিশূন্যতা দূর করতে ১৯৬৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময় ফিলিপাইন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কলকাতায় নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। কোনোটিতেই খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। ১৯৬৮ সালে মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় চাঁদপুরের মতলবে ও ঢাকায়। এর মূল গবেষক ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড এ ক্যাস। অনেকে এই দুই বিজ্ঞানীকে ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন। ওই গবেষণার সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম (সম্প্রতি মারা গেছেন) ও মজিদ মোল্লা। তাঁদের গবেষণার ফলাফল নিয়ে ১৯৬৮ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাই কার্বনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানো হয়। এতে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রবন্ধের শেষ দিকে বলা হয়, এই দ্রবণের উপাদানগুলো সস্তা ও সহজপ্রাপ্য। এরপর থেকে আইসিডিডিআরবির মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে ডায়রিয়ায় পানিশূন্যতা দূর করতে ওআরএস ব্যবহার শুরু হয়।

আইসিডিডিআরবির একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সাবেক একাধিক বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেছেন, ওআরএস আবিষ্কার একক কোনো বিজ্ঞানীর কৃতিত্বে হয়নি। গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক দিন ধরে কাজ করেছেন। চূড়ান্ত রূপটা এসেছে ১৯৬৭-৬৮ সালে।

গণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানিয়েছেন, স্যালাইন প্যাকেটজাত করার কাজটি ১৯৮১ সাল থেকে প্রথম শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

আইসিডিডিআরবির নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক তাহমিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুষ্ট, শিশুস্বাস্থ্য বা ডায়রিয়াজনিত রোগবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই, সবখানেই ওআরএস নিয়ে আলোচনা হয়, আর তাতে অবধারিতভাবে বাংলাদেশ ও আইসিডিডিআরবির নাম উচ্চারিত হয়। গর্বে বুক ভরে যায়।’

আইসিডিডিআরবি ওআরএস তৈরির ফর্মুলা পেটেন্ট (মেধাস্বত্ব আদায়) করেনি। এ নিয়ে সামান্য হলেও কারও কারও মধ্যে হতাশা আছে। আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে আইসিডিডিআরবির গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজে জড়িত ছিলেন। প্রবীণ এই বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওআরএস পেটেন্ট করা হয়নি, পেটেন্ট করার চিন্তাই করা হয়নি। উই মিসড দ্য ট্রেইন (আমরা ট্রেন ধরতে ব্যর্থ হয়েছি)।’

শতাব্দীর অন্যতম সেরা উদ্ভাবন

চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্টের সম্পাদকীয়তে বলেছিল, ওআরএসের আবিষ্কার চিকিৎসার ক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই আবিষ্কার তীব্র ডায়রিয়া চিকিৎসায় মুখে তরল খাওয়ানোর রাস্তা খুলে দিয়েছে।

গবেষণার মাধ্যমে জীবন রক্ষাকারী নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি বা ওষুধ সাধারণত জটিল ও ব্যয়বহুল হয়। অনেকের কাছে দুষ্প্রাপ্য। ওআরএস এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

আইসিডিডিআরবির ক্লিনিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নুর হক আলম আশির দশক থেকে ওআরএস নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওআরএসের গুণগত মান বৃদ্ধি নিয়ে আইসিডিডিআরবিতে এখনো গবেষণা চলছে। রাইস স্যালাইনের উদ্ভাবন এর মধ্যে অন্যতম অগ্রগতি।

এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড়...

আশির দশকে ডায়রিয়ার প্রকোপ ছিল সারা দেশেই। সারা দেশে স্যালাইনের প্যাকেট পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব। ব্র্যাকের ভাইস চেয়ার মোস্তাক রাজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মানুষকে যদি স্যালাইন তৈরি করতে শেখানো যায়, তাহলে সমস্যার সমাধান হতে পারে—এই ধারণা থেকে ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’ ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে ব্র্যাক। তাদের মাঠকর্মীরা প্রতিটি বাড়ির অন্তত একজন সদস্যকে দ্রবণ তৈরি করতে শেখান। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন নিয়মিত প্রচার চালায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্র্যাকের এই কর্মসূচি ডায়রিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বড় ভূমিকা রেখেছিল। সাধারণ মানুষ স্যালাইন তৈরি করতে শিখেছে।

বাড়িতে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে টাইম সাময়িকীর ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবরের সংখ্যায় প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হিসেবে ছাপা হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং পরে ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগী হয়। তখন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানবিষয়ক পরিচালক ছিলেন কে এম এস আজিজ। অধ্যাপক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসকদের কাছে ওআরএস গ্রহণযোগ্য করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার তখন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। সেই প্রকল্পের আওতায় প্রতি সপ্তাহে ২০ জন করে সরকারি চিকিৎসককে আইসিডিডিআরবির হাসপাতালে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।