খাসজমি জামানত রেখে ঋণ বিতরণ
সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত লিজ দেওয়া জমি জামানত হিসেবে গ্রহণ করে ঋণ বিতরণ করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংক। ঋণ নিয়ে গ্রাহক ওয়ান ডেনিম মিলস তাদের প্রকল্প চালু করতে পারেনি। এর সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণ ৭৯৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। নিরীক্ষা বিভাগের ২০০৯-১০ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
নিরীক্ষা বিভাগ সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের জুনে ওই ঋণকে ক্ষতিমানের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে ঋণের টাকা উদ্ধার করা অনিশ্চিত। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ওয়ান ডেনিমের কাছ থেকে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া খাসজমি জামানত হিসেবে গ্রহণ করার পেছনে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনতা ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে গতকাল মঙ্গলবার নিরীক্ষা বিভাগ থেকে এ তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। সংসদ ভবনে কমিটির এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য আবদুস শহীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চোরও চুরি করার সময় বুদ্ধি খাটায় যাতে সে ধরা না পড়ে। জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা সেই বুদ্ধির তোয়াক্কাও করেনি। সরকারি খাস খতিয়ানের জমি বন্ধক রেখে ঋণ দেওয়া যায় না, এটা কে না জানে। জনতা ব্যাংকের বিশাল বিশাল কর্মকর্তারাও নিশ্চয় জানেন। জেনে-শুনেই তাঁরা ঋণ বিতরণ করেছেন। কারণ, তাঁরা মনে করেন, এ নিয়ে তাঁদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে না। কিন্তু সরকারি জমি সরকারের কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমি আমার ইহকালে কখনো শুনিনি।’
বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ডেনিম কাপড় উত্পাদনের জন্য গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার জন্য জনতা ব্যাংকের নেতৃত্বে সাতটি ব্যাংক জোটবদ্ধ হয়। অনুপাত অনুযায়ী জনতা ব্যাংক ২০০৭ সালে ওয়ান ডেনিমকে আট কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী অন্য ছয়টি ব্যাংক থেকে অনুপাত অনুসারে টাকা পাওয়ার আগেই জনতা ব্যাংক যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলে তাতে স্বীকৃতি দেয়। জনতা ব্যাংক আগাম কাজ করায় শেষ পর্যন্ত জোটের অংশীদার প্রিমিয়ার ব্যাংক সম্পূর্ণ ও অন্য দুটি ব্যাংক আংশিক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যে কারণে পুরো আমদানি ঋণপত্রের দায় জনতা ব্যাংক পরিশোধ করে।
নিরীক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮-০৯ সালে দুবার পুনঃ তফসিলের মাধ্যমে ঋণ আদায়ের সুযোগ দিলেও তা সফল হয়নি। ২০১০ সালে বিমা কোম্পানি যন্ত্রপাতির বিমা বাতিল করেছে। আমদানি করা যন্ত্রপাতির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে ঋণের টাকা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নিরীক্ষা আপত্তিতে বলা হয়েছে, ঋণের টাকা যথাসময়ে আদায় না করা এবং মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দেওয়ায় বর্তমানে এই হিসাবে জনতা ব্যাংকের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
ওয়ান ডেনিমের প্রকল্পটি গাজীপুরে হওয়ার কথা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সরকারের খাস খতিয়ানের জমি জামানত হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কোনো অনুমতিপত্র সংশ্লিষ্ট নথিতে পাওয়া যায়নি।
কার্যপত্র থেকে আরও জানা যায়, বৈঠকে জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, আইসিবি, বেসিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ২০০৯-২০১০ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। এতে মোট ৪৫টি আপত্তি রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণ ৭৯৬ কোটি ৮ লাখ টাকা।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিটি আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে।
কমিটির সভাপতি মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, আবদুস শহীদ, মোসলেম উদ্দিন, পঞ্চানন বিশ্বাস, রুস্তম আলী ফরাজী, শামসুল হক ও মঈন উদ্দীন খান বাদল অংশ নেন।