default-image

ঢাকার শ্যামপুরের ব্যবসায়ী ইউনূস হাওলাদার খুনের আড়াই বছর পার হলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এই খুনে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শকসহ (এএসআই) তিন আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন।

দীর্ঘ সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ায় নিহত ব্যবসায়ীর পরিবার হতাশ। স্বামীর খুনের বিচারের কোনো অগ্রগতি না দেখেই গত বছরের মে মাসে মারা যান ব্যবসায়ী ইউনূস হাওলাদারের স্ত্রী মারুফা বেগম। তাঁর ক্যানসার আক্রান্ত এক মেয়েও মারা গেছেন। মামলার বাদী নিহতের বড় ছেলে আতিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মা চেয়েছিলেন, বিনা দোষে যারা বাবাকে খুন করেছে, তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। কিন্তু পুলিশ মামলার তদন্তই শেষ করতে পারেনি। আসামিরাও জামিন পেয়ে গেছেন।’

২০১৮ সালের ২৫ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার হাসনাবাদ এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক বৃদ্ধের (ব্যবসায়ী ইউনূস হাওলাদার) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, লাশটি ব্যবসায়ী ইউনূস হাওলাদারের। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা হয়। মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে নিহত ইউনূস হাওলাদারের বাড়ির ভাড়াটে ওহিদ সুমন (২৭) এবং যাত্রাবাড়ী এলাকার ছাবের ওরফে শামীমকে (৪৩) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে খুনের দায় স্বীকার করে ঢাকার আদালতে জবানবন্দি দেন আসামি ওহিদ সুমন।

বিজ্ঞাপন
—পুলিশের এএসআইসহ তিন আসামিই জামিনে।
—নিহতের পরিবার হতাশ।

মামলার নথিপত্র বলছে, আসামি ওহিদের জবানবন্দির ভিত্তিতে ব্যবসায়ী ইউনূস হাওলাদার হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ২০১৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন শ্যামপুর থানার তৎকালীন এএসআই নূরে আলম।

default-image

মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগ (সিআইডির) উপপরিদর্শক ইমরান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর নথিপত্র পর্যালোচনা করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।

ইউনূস হাওলাদারের পরিবার জানিয়েছে, তিনি পুরান ঢাকার নবাবপুরে কৃষি যন্ত্রাংশের ব্যবসা করতেন। খুন হওয়ার বছর দশেক আগেই তিনি ব্যবসা গুটিয়ে অবসর জীবন যাপন করছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তখন মামলার তদন্ত ঠিকভাবে হয় না। কথায় আছে, কাক কাকের মাংস খায় না।
নূর খান, নির্বাহী কমিটির মহাসচিব, আসক

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউনূস হাওলাদারের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। এর মধ্যে এক মেয়ে গত বছর মারা গেছেন। ঢাকার শ্যামপুরে ইউনূস হাওলাদারের দুটি বাড়ি আছে। একটিতে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। অন্যটি ভাড়া দেওয়া। সেখান থেকে ভাড়াও তুলতেন নিজে। খুন হওয়ার আট মাস আগে ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর ভাড়া দেওয়া বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পাঁচ ভাড়াটেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন ইউনূস হাওলাদারের নামে মানব পাচার আইনে মামলা হয়। তাঁর নামে অতীতে কোনো মামলা ছিল না। এ মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান।

নিহতের পরিবার দাবি করেছে, ইউনূস হাওলাদারকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয় পুলিশ। মামলা করার পর তিনি উদ্‌ভ্রান্তের মতো এখানে-সেখানে ছোটাছুটি করা শুরু করেন। তাঁর বাসায় ভাড়া থাকতেন আসামি ওহিদ সুমন। তিনি কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ার বিআরটিএ অফিসের দালাল। মামলার ব্যাপারে সুমনের সাহায্য চান ইউনূস হাওলাদার। পাশের বাসায় ভাড়া থাকতেন এএসআই নূর আলম। ইউনূস হাওলাদার সুমনকে পুলিশ কর্মকর্তা নূর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এ ঘটনা জানানোর পর তিন লাখ টাকা চান এএসআই নূর আলম।

default-image

আদালতকে পুলিশ এক প্রতিবেদন দিয়ে জানিয়েছে, মানসম্মানের ভয়ে মামলা থেকে বাঁচার জন্য ব্যবসায়ী ইউনূস বিভিন্ন জনের কাছে গেছেন। এই সুযোগ নিয়ে আসামি ওহিদ সুমনসহ অন্যরা ব্যবসায়ী ইউনূসকে টাকা নিয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বিআরটিএ অফিসের কাছে যেতে বলেন। আসামিদের কথামতো তিনি তিন লাখ টাকা নিয়ে সেদিন সেখানে যান। পরে আসামিরা ইউনূসকে হত্যা করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। আর আসামি এএসআই নূরে আলম হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী বলে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। খুনের আগে-পরে আসামিদের সঙ্গে মুঠোফোনে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তখন মামলার তদন্ত ঠিকভাবে হয় না। কথায় আছে, কাক কাকের মাংস খায় না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন কোনো বার্তা এখনো আসেনি যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ অপরাধ করলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। এতে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়া কঠিন হয়।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন