বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুধু ঢাকা রেলওয়ে থানা এলাকার রেললাইন থেকেই গত পাঁচ বছরে প্রায় দেড় হাজার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা হয়েছে মাত্র ২২টি। আবার এসব মামলার ৯টির হত্যা রহস্য উদ্‌ঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা রেলওয়ে থানা-পুলিশ।

অপরাধের দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিতে খুনের পর লাশ রেললাইনে ফেলে রাখছে দুর্বৃত্তরা। তাদের মূল উদ্দেশ্য, খুনের দায় এড়ানো এবং ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মুহাম্মদ উমর ফারুক, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ

রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে না পারার কারণ হিসেবে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রত্যক্ষদর্শী না থাকা এবং প্রথমেই দুর্ঘটনা ধরে তদন্ত শুরু করার কারণে সব হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয় না। বেশির ভাগ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের ক্ষেত্রে কোনো সূত্র খুঁজে বের করা কঠিন হলে তদন্তে আগ্রহ থাকে না।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক দিদার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি ঘটনাতেই ময়নাতদন্ত করা হয়। যদি ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে হত্যা মামলা হয় এবং তদন্তও হয়।

নিশ্চিত হত্যা জেনেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ঢাকা, সিলেট, আখাউড়া, কুলাউড়া ও মৌলভীবাজার রেলওয়ে থানা এলাকায় হত্যা মামলা হয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে ১৪টির রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে ব্যর্থ হয়েছে রেল পুলিশ। ফলে নিশ্চিত হত্যা জেনেও মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন (হত্যাকাণ্ড তবে কোনো আসামি শনাক্ত করা যায়নি) দেওয়া হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে লাশের পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারার কারণেই শেষ পর্যন্ত হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয় না।

default-image

২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন এলাকায় মস্তকবিহীন এক নারীর লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করে। ওই নারীর পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে ঢাকা রেলওয়ে থানা-পুলিশ। সিলেটের চারটি রেলওয়ে থানার ১৩টি মামলার মধ্যে ৫টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। রেল পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগী ব্যক্তি কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কারও শত্রুতা আছে কি না, তিনি কারও সঙ্গে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন কি না—এসব বিষয় জানা যায় না। ফলে অনেক হত্যার ঘটনা অনুদ্‌ঘাটিতই থেকে যাচ্ছে।

ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল হক বলেন, অনেক সময় পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয় না।

প্রেমের কারণে খুন হন শরিফুল

২০১৬ সালের অক্টোবরে কুমিল্লা সদরের রেললাইন থেকে শরিফুল ইসলাম নামের এত তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়। শরিফুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম হত্যা মামলা করতে চাইলেও রেলওয়ে থানা-পুলিশ অপমৃত্যু মামলা নেয়। এক বছর পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে আদালতে হত্যা মামলা করেন সিরাজুল ইসলাম। আদালত রেল পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। ট্রেনের ধাক্কায় শরিফুলের মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় তারা। ছেলের শোকে শরিফুলের মা ফরিদা বেগম মানসিক ভারসাম্য হারান এবং মারা যান।

রেল পুলিশের তদন্তের এই ফল মানতে পারেননি শরিফুলের বাবা সিরাজুল। তিনি নারাজি দিলে আদালত তদন্তের দায়িত্ব দেন পিবিআইকে। ঘটনার তিন বছর পর পিবিআই উদ্‌ঘাটন করে, প্রেমের জেরে শরিফুলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। আলামত নষ্ট করার পাশাপাশি হত্যার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে কয়েকজন লাশ (শরিফুল) রেললাইনে ফেলে যান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা জেলা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মতিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুর আগে শরিফুল একটি মুঠোফোন নম্বরে বারবার যোগাযোগ করেছিলেন। এটাই ছিল সূত্র। রেলওয়ে পুলিশ এই সূত্র পায়নি। ঘটনার তিন বছর পর যখন তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে আসে, তখন ওই মুঠোফোন নম্বরের সূত্র ধরে শরিফুলের বান্ধবীর খোঁজ পাওয়া যায়। তিনিই জানিয়েছেন, তাঁর মামা আবু তাহের সহযোগীদের নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে শরিফুলকে হত্যা করে দুর্ঘটনা বলে প্রচার চালান। ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর তাহেরসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা এখনো কারাগারে।

অন্যত্র খুন, লাশ রেললাইনে

গত আগস্টে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পার্বতীপুর রেলওয়ে থানায় হত্যা মামলা করে। তবে এখন পর্যন্ত এই হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, কিশোরকে অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে।

পার্বতীপুর রেলওয়ে থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, কিশোরের পরিচয় জানা যায়নি। কারা, কেন, কীভাবে তাকে হত্যা করেছে, সেটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ১৫ অক্টোবর ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন ঝোপের মধ্যে রিমন মিয়া (২২) নামের এক তরুণের লাশ পাওয়া যায়। তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম ছিল। লাশ দেখে প্রাথমিকভাবে পুলিশের মনে হয়, এটি দুর্ঘটনাও হতে পারে। কিন্তু পূজা দেখতে রিমন মিয়াসহ তাঁর কয়েকজন বন্ধু কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থেকে ভৈরবে এসেছিলেন। এ ঘটনায় রিমনের বাবা ভৈরব থানায় হত্যা মামলা করেছেন।

শুধু এই দুই ঘটনাই নয়, খুনিরা হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য লাশ রেললাইনে ফেলে রাখে। ঢাকা ও সিলেটের পাঁচটি থানায় গত পাঁচ বছরে যে ৩৭টি হত্যা মামলা হয়েছে, তার মধ্যে ১২টি ঘটনাতেই দেখা গেছে অন্যত্র হত্যার পর লাশ রেললাইনে ফেলে গেছে খুনিরা।

ঢাকা রেলওয়ে থানা-পুলিশের ভাষ্যমতে, ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন এলাকায় যে মস্তকবিহীন নারীর লাশ উদ্ধার হয়, তাঁকেও অন্য কোথাও খুন করে লাশ টুকরো টুকরো করে রেললাইনে ফেলে রাখে দুর্বৃত্তরা।

ছিনতাইকারীদের হাতে খুন

রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, চলন্ত ট্রেনে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান অনেকে। বিশেষ করে লোকাল ট্রেনের ছাদে উঠে অনেক যাত্রী ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। কখনো কখনো ছুরিকাঘাতে খুন হন যাত্রী। আবার অনেক সময় দেখা যায়, ছিনতাইয়ের কাজে বাধা দিলে ধস্তাধস্তিতে ট্রেনের নিচে পড়ে মারা যান।

এমন একটি ঘটনা ঘটে গত ১৬ অক্টোবর জামালপুরগামী কমিউটার ট্রেনের ছাদে। সেখানে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান দুজন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯ অক্টোবর পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পেশাদার ডাকাত দলের সদস্য। তারা নিয়মিত ঢাকা থেকে জামালপুরগামী ট্রেনের ছাদে ডাকাতি করত। ঘটনার রাতে ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে ডাকাত দল ওই কমিউটার ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীদের টাকা ও জিনিসপত্র নিয়ে যায়। ওই সময় বাধা দেওয়ায় তিনজনকে ছুরিকাঘাত করে তারা। পরে দুজনের মৃত্যু হয়।

রেললাইন ঘিরে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্টদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধের দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিতে খুনের পর লাশ রেললাইনে ফেলে রাখছে দুর্বৃত্তরা। তাদের মূল উদ্দেশ্য, খুনের দায় এড়ানো এবং ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া। অধিকাংশ ঘটনায় লাশের পরিচয় না থাকা এবং কারও অংশীদারি না থাকায় পুলিশ তদন্তে আগ্রহ দেখায় না। এ ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সুমনকুমার দাশ, সিলেট]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন