র‍্যাব সূত্র জানায়, গত ২৫ নভেম্বর রাতে ছয়-সাতজন ব্যক্তি ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ঢাকার অদূরের চিটাগাং রোড থেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী লুৎফর রহমানকে পিস্তল দেখিয়ে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেন। গাড়িতে ওঠানোর পর তাঁরা লুৎফর রহমানের চোখ-মুখ বেঁধে তাঁর কাছে থাকা মুঠোফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেন এবং গাড়ির ভেতরে তাঁকে মারধর করেন। পরে চক্রের সদস্যরা তাঁকে মুন্সিগঞ্জের বিল এলাকার ফাঁকা জায়গায় নিয়ে তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চান। ওই টাকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে লুৎফর তাঁদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চান।

পরদিন ২৬ নভেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে চক্রের সদস্য রিপন সরদার, আহমেদুল কবির খান ও লোকমান চৌধুরী লুৎফরের মুঠোফোন থেকে তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে বলেন, ‘লুৎফরকে আটক করেছি। বর্তমানে তিনি ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি অফিসে আছেন।

৫০ হাজার টাকা দেওয়া হলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ পরে লুৎফরকে চক্রের সদস্য মোসলেম উদ্দিনের বাসায় নিয়ে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চান চক্রের সদস্যরা। পরে অপহৃত লুৎফরের ছেলে চক্রের সদস্যদের অনলাইন মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে এক লাখ টাকা পাঠান। এ সময় পরিবারের সদস্যরা লুৎফরকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে তাঁকে আবার চোখ-মুখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। চক্রের সদস্যরা লুৎফরকে নির্যাতনের ভিডিও তাঁর পরিবারকে দেখিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ চান। টাকা না দেওয়া হলে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে লুৎফরের পরিবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে এবং লুৎফরকে উদ্ধারে র‌্যাব-১–এর কাছে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব-১ ও র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা অপরাধীদের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে চিটাগাং রোডে অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী লুৎফরকে উদ্ধার এবং অপহরণকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

অভিযান পরিচালনাকারী র‍্যাব-১–এর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শাহেদ মাহতাব প্রথম আলোকে বলেন, অপহৃত লুৎফরের পরিবারকে দিয়ে অপহরণকারীদের ধরতে ফাঁদ পাতা হয়। র‍্যাবের পরামর্শে লুৎফরের পরিবার অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক লাখ টাকা দেয়। পরে মুক্তিপণ হিসেবে অপহরণকারীরা স্বর্ণ নিতে রাজি হয়। ওই স্বর্ণ নিতে এসেই তাঁরা র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েন।

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধী চক্রের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মতো বেশ নিয়ে ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ করছে। চক্রের সক্রিয় সদস্যরা নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করতে ডিবির জ্যাকেটের মতো জ্যাকেট ব্যবহার, ওয়াকিটকি ব্যবহার ও অস্ত্র বহন করে। তাঁরা নিজেদের ডিবি সদস্য হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করতে ডিবির স্টিকার তৈরি করে মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন মানানসই গাড়ি ব্যবহার করছে।

ডিবি পরিচয়ে ডাকাতির চেষ্টা

আজ বুধবার সকালে র‍্যাব-১–এর একটি দল গাজীপুরের পুবাইল থানার মীরেরবাজার তালটিয়া বাসস্ট্যান্ড–সংলগ্ন রানা সিএনজি স্টেশনের সামনে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। র‍্যাব বলেছে, ঘটনার সময় ডিবি পরিচয়ে তাঁরা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ডাকাতিতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আবদুল মান্নান মিয়া (৪৭), জুলফিকার আলী ওরফে বাবু (৩৫), লুৎফর রহমান ওরফে আশিক (২৫) ও সাইফুল ইসলাম (১৯)। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে দুটি খেলনা পিস্তল, চারটি পুলিশের পোশাক, ডিবি লেখা চারটি জ্যাকেট, দুটি পুলিশের কটি, একটি ক্যাপ, একটি টি বেল্ট, এক জোড়া বুট, দুটি ম্যাগাজিন পাউচ, একটি হাতকড়া, একটি ওয়াকিটকি সেট, একটি বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, একটি সিআইডির নোটবুক উদ্ধার করা হয়।

র‍্যাব-১–এর সহকারী পুলিশ সুপার নোমান আহমদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পরস্পর যোগসাজশে ডিবি পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকায় লোকজনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি করে আসছিলেন। তাঁরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করে নির্জনে বা বাসায় ডিবি পরিচয়ে হানা দিয়ে উদ্ধার বা বাজেয়াপ্ত করার নামে টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি ছিনিয়ে নিতেন।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান এবং তাঁর সহযোগী জুলফিকার আলী ওরফে বাবু ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাজধানীর ইস্কাটন রোড পুলিশ অফিসার্স মেসে মেস ওয়েটার হিসেবে কাজ করতেন।

পরে আবদুল মান্নান পুলিশ কর্মকর্তাদের কর্মপন্থা দেখে নিজেই ডিবি পুলিশ সেজে ডাকাতি করার পরিকল্পনা করেন। গত দুই বছরে এই চক্র অন্তত ১৫টি ডাকাতি করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন তিনি। চক্রের অন্য সদস্যদের বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন