খোকাহীন ফাতেমার দৈন্যপীড়িত জীবন

বিজ্ঞাপন
default-image

‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছো পালকিতে মা চড়ে
দরজা দু’টো একটুকু ফাঁক করে।
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।’

কিন্তু হায়! জীবন কবিতার মতো নয়। জীবনের সমীকরণ বড্ড জটিল। আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ লোকলজ্জার ভয়ে যেটুকুও–বা আগলে রেখেছে মা-বাবাকে, নিম্ন–মধ্যবিত্ত বা নিম্ন আয়ের মানুষ অভাব–অনটনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মা-বাবার প্রতি সেটুকু সম্মান বা ভালোবাসা তো দূরের কথা, দুবেলা দুমুঠো ভাতও তাদের দিতে পারছে না।

কবিতায় খোকা যখন মাকে পালকিতে নিয়ে টগবগিয়ে রাঙা ঘোড়ায় চড়ে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর, সেই সময় বাস্তবের তথাকথিত খোকারা ঠিক যেন তার উল্টো।

জাগতিক মা পালকিতে নয়, তক্তপোশের বিছানায় ভাঙা দরজার ওপাশে পড়ে রয় নির্বিকার।

ফাতেমা বেগম তেমনই এক হতভাগা মা। পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের জননী হয়েও দিন কাটছে তাঁর বড় অবহেলায়-অযত্নে। নদীর পাড়ে কোনোমতে টিকে থাকা একটুখানি টিনের ছাপরাঘরে নিস্তেজ পড়ে আছেন এই অভাগা মা। কোনো সন্তানই রাখেন না এই বৃদ্ধা মায়ের খোঁজখবর।

৭০ ছুঁই ছুঁই ফাতেমা বেগম সারা দিন এপাড়া–সেপাড়া হেঁটে যে কটা চাল-ডাল পান, তা–ই দিয়ে চলে তাঁর অন্নভোগ। রোজকার মতো আজও (ঈদের কয়েক দিন) বেরিয়েছিলেন, হাতে একটা ছরা আর কোমরে পুরোনো হয়ে যাওয়া জীর্ণ কাপড়ের একটা পুঁটলি বেঁধে চাল-ডালের সন্ধানে। দিন শেষে ক্লান্ত ফাতেমা বেগম ঘরে ফিরেছেন ঠিকই কিন্তু বয়সের ভারে অভাবগ্রস্ত নুয়ে পড়া শরীরটা আর পারেনি কটা চাল ফুটিয়ে দুটো সেদ্ধ ভাত করে নিতে।

আমাদের কথা হচ্ছিল মাগরিবের আজানের সময়, তখনো তিনি অভুক্ত। পাশে থাকা এক প্রতিবেশী বললেন, একটু উঠে বসেন, আপা আপনের ছবি তুলবে।

আমার ডান হাতটা লতার মতো জড়িয়ে উঠে বসলেন। ‘তুই’ সম্বোধনে জানতে চাইলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি আর তার ছবি তুলেইবা কী করব? বললাম, তেমন কিছু করব না, আপনার সঙ্গে শুধু একটু গল্প করতে চাই।

বৃদ্ধা শুরু করলেন নিজের দুঃখভারাক্রান্ত জীবনের সাতকাহন। স্বামী সেকেন্দার মুন্সি অনেক আগেই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পাঁচ ছেলে এক মেয়ের ভরসায় রেখে গেছেন স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে। কিন্তু কপাল পোড়া হলে যা হয়। সেই ভরসায় আজ কেবলই তেপান্তরের মাঠের মতো ধু ধু বালুচর। ভাত–কাপড় তো দূরের কথা, চোখের দেখাও দেখতে আসেন না কোনো ছেলেমেয়ে।

পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জের পাইকান্দি গ্রামে বন্যার অথই পানিতে একটা টিনের ছাপরাঘরে একাকী জীবন কাটছে বৃদ্ধা এই মায়ের। ঘরের পাশে সরকারি কয়েকটা বালুর বস্তা ফেলে রাখা হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু আরেকটু বৃষ্টি এবং বন্যার প্রকোপ বাড়লেই যেকোনো মুহূর্তে বৃদ্ধার নামমাত্র ঘরখানা ডুবে যেতে পারে যমুনার অথই পানিতে। হয়তো একদিন ঘরে ফিরে বৃদ্ধা দেখবেন, যেখানে এসে বিশ্রাম নিতেন, একটু গা জুড়াতেন, সেই শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে ভেসে গেছে। আর ভাগ্য যদি হয় আরও নির্মম, তাহলে হয়তোবা রাতের অন্ধকারে গভীর ঘুমে নিজেও ভেসে যেতে পারেন বন্যার ভয়ানক আগ্রাসনে।

আচ্ছা, আপনার ভয় করে না এমন ঘরে একলা থাকতে?
ভয় করে কী করব, মা। ভাসে গেলে যাব। কোনো খাবারও পাই না কারও কাছে। মরার মতো পরে থাহি (থাকি)। কী কবো মা, প্যাটের ছাওয়াল–মিয়া (ছেলেমেয়ে) দ্যাহে না (দেখে না)। সরকার কেন দেখপি (দেখবে) ক, মা?

আপনার মেয়েও খোঁজখবর নেয় না?
মিয়াও (মেয়ে) তো গরিব। তারই চলে না। কোনোমতে দিন পার করে। কিবা (কেমন) করে খোঁজ লিবি (নেবে)।

ছেলে, নাতি, নাতনিরা আসে না কখনো আপনাকে দেখতে?
ফাতেমা বেগম জবাব দেওয়ার আগেই প্রতিবেশী এক লোক ঘরের মুখে দাঁড়িয়ে বললেন, এর ছেলেপেলে, নাতিপুতিরা খুব খারাপ। কাছেই থাকে কিন্তু কোনো দিন খোঁজ লেয় না। এই যে ঘরে আলো জ্বলতেছে নিমকহারাম ছেলেরা এসে মাঝেমধ্যে লাইট টাও (বাল্ব) খুলে নিয়ে যায়।

খালা, আপনার মাথার ওপর যে পাখাটা ঘুরছে, কে কিনে দিয়েছে?
পাশ থেকে আরেক নদীভাঙা পড়শি এসে বললেন, উনিই কিনছে আপা। চায়েচিন্তে টাকা জমায়ে কিনছে।

‘রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা
এমন কেন সত্যি হয়না আহা!
ঠিক যেন এক গল্প হতো তবে
শুনতো যারা অবাক হতো সবে,
দাদা বলতো, কেমন করে হবে,
খোকার গায়ে এত কি জোর আছে।
পাড়ার লোকে সবাই বলতো শুনে,
ভাগ্যে খোকা ছিলো মায়ের কাছে।’

আমিও পাড়াপড়শিদের এসব কথায় অবাক নয়, হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। মা পৃথিবীর সবচেয়ে আপনজন, মিষ্টিমধুর এক অনুভূতি জড়ানো ডাক। যে মা ১০ মাস সন্তান পেটে ধারণ করেন, কষ্ট করে লালন–পালন করেছেন, সেই মা আজ বানের জলে ভেসে চলেছেন, অথচ পাঁচটা ছেলের কেউ তাঁর খবর রাখেন না।

default-image

দুর্ভাগা এই মায়ের খোকারা সত্যি বড় নিষ্ঠুর-নির্দয়। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য খোকা রয়েছে, যাদের বিবেকবোধ এবং দায়িত্ব-কর্তব্য মা-বাবার প্রতি নেই বললেই চলে।

শুধু লেখাপড়া না জানা মূর্খ খোকারা নয়, শিক্ষিত বিবেকবান নামক সমাজেও এমন মানবতাহীন খোকারা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। মনুষ্যত্ব তো অন্তরে বিরাজমান। সেই তথাকথিত মানুষের মনুষ্যত্ব অনেকটা পশুত্বে রূপান্তরিত হচ্ছে। তাই যদি না হবে, তবে কেন আজও বাংলাদেশের মতো সৌহার্দ্যপূর্ণ দেশেও বৃদ্ধাশ্রমগুলো আমাদের বাবা–মায়েদের শেষ বয়সের নিরাপত্তার নিবাসে পরিণত হচ্ছে।

ফাতেমা খালার সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে আসার সময় কটা টাকা ওনার হাতে দিতেই নেবেন না বলে আপত্তি জানালেন। আমাকে পাশে টেনে নিয়ে বললেন, কেন তুই টাকা দিবি? একবারও শুধু বললেন ছেলেরা দেখে না তাকে, এর বাইরে ছেলেদের সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথা শুনলাম না। একেই বুঝি মা হওয়া বলে!

মনে মনে ভাবলাম, যে মা সারা দিন খুদ কুড়িয়ে কটা ভাতের জন্য রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, বন্যা উপেক্ষা করে এই শেষ বয়সে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ান, তিনিও আজ আমাকে তাঁর অতিথি ভাবছেন। তাই আমার দেওয়া টাকা নিতে আপত্তি।

পথে পথে হেঁটে বেড়ানো একজন দুঃখিনী মায়েরও মনুষ্যত্ব বোধ থাকে। থাকে না কেবল সেই মায়েরই বিবেকহীন না-মানুষ হওয়া সন্তানদের।

চারিদিকে অথৈজল। জনমানব প্রায় নেই বললেই চলে।
‘ভয় পেয়েছো, ভাবছি এলাম কোথা,
আমি বলছি ভয় করোনা মা গো,
ঐ দেখা যায় মরা নদীর সেতা’

না, এমন ভরসা হয়ে মাকে সাহস জুগিয়ে তাঁর খোকারা বলবে না হয়তো কোনো দিনও। পৃথিবীতে সব খোকাই বীরপুরুষ হতে পারে না। কেউ কেউ কাপুরুষও হয় বটে। এমন হাজারো ফাতেমা বেগমের জীবন প্রতিনিয়ত নদীর পাড় ভাঙার মতো ভেঙে চলেছে কোথাও না কোথাও, যার খবর আমরা জানি না বা জানতে চাইও না।

পৃথিবী আজ কঠিন এক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তবুও কি থেমে আছে অন্যায়, পাপ বা অনাচার? কিছুই থেমে নেই। মানুষের ভেতর থেকে ভয়ভীতি, অপরাধপ্রবণতা একবিন্দুও কমেনি। প্রকৃতিও যেন এসব বোধহীন মানুষের কাছে পরাজিত।

মানুষের জন্য মানবতার এক অপূর্ব অনিন্দ্য সুস্থ–সুন্দর জীবনের স্বপ্ন আমরা দেখতে চাই। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক, দেশের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের প্রতি এমন একটা যৌক্তিক দাবি আমরা জানাতেই পারি। এসব অসহায় নিরুপায় মা-বাবার জন্য এমন কোনো রাষ্ট্রীয় আইন পাস হোক, যাতে দেশের প্রত্যেক মা–বাবা তাঁদের সন্তানদের কাছে অতি মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকেন। নাতি–নাতনি নিয়ে শেষ জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারেন অনাবিল আনন্দে। কোনো মা-বাবাকেই যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়, অথবা ফাতেমা বেগমের মতো নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করতে না হয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন