টানা তৃতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সেলিনা হায়াৎ আইভী
ছবি: দীপু মালাকার

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৬৬ হাজার ৫৩৫ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। টানা তৃতীয় দফা মেয়র নির্বাচিত হলেন তিনি। এই নির্বাচনে দলের মনোনয়ন, নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি, ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরদিন আজ সোমবার দুপুরে শহরের দেওভোগ এলাকায় নিজ বাসভবনে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি সেলিম জাহিদ, নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন প্রথম আলোর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি মজিবুল হকগোলাম রাব্বানী

প্রথম আলো: আপনাকে অভিনন্দন...

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আপনাদেরও ধন্যবাদ। আপনারা গণমাধ্যমকর্মীরা অনেক কষ্ট করেছেন। আপনাদের মাধ্যমে নারায়ণঞ্জবাসী ও দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। কারণ, এ নির্বাচনের প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টি ছিল।

প্রথম আলো: তৃতীয়বার জিতেছেন, কিন্তু ব্যবধান কমছে। কী বুঝছেন?

আইভী: ব্যবধানটা ও রকমভাবে কমেনি। ইভিএম অনেক স্লো ছিল, নারী ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। এ জন্য হয়তো ভোট কিছুটা কমেছে। ভোটে নানা বিষয়ে ‘ইকুয়েশন’ হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের প্রভাব একটু পড়েছে। নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়তে হয়েছে, ষড়যন্ত্রটা খুব সহজ ছিল না, গভীর একটা ষড়যন্ত্র হয়েছে।

প্রথম আলো: এই নির্বাচন থেকে কী শিখলেন?

আইভী: এই নির্বাচনে অনেক কিছু শিখেছি—কাছের মানুষ দূরে যায়, দূরের মানুষ কাছে আসে। সবকিছু যত সহজভাবে নিই, রাজনীতিতে তা অত সহজ নয়। তবে আমি কখনো গভীরভাবে কিছু চিন্তা করি না, মানুষকে ভালোবাসি, মানুষকে নিয়ে থাকতে চাই। মানুষকে নিয়েই সব সময় চিন্তা ছিল।

প্রথম আলো: এ অভিজ্ঞতা একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আইভী: নারী ভোটারদের ভোটকেন্দ্র সাধারণত নিচতলায় হয়। এবার অধিকাংশ জায়গায় দোতলা-তিনতলায় রাখা হয়েছে। অনেক বয়স্ক নারী ভোটার আছেন, তাঁরা হয়তো একবারের বেশি দোতলায় উঠতে চান না। কোনো একটি গ্রুপ নারী ভোটারদের টার্গেটই করেছে, যাতে তাঁদের উপস্থিতি কমানো যায়। কারণ, নারীরাই আমার সমর্থক বেশি। আর নির্বাচন এলেই বাজে অপপ্রচার, মিথ্যা স্ট্যান্টবাজি চালানো হয়।

প্রথম আলো: নির্বাচন নিয়ে কি কোনো শঙ্কা ছিল? শেষ পর্যন্ত ভোট কেমন হয়েছে?

আইভী: নারায়ণগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু সারা দেশবাসীর আশঙ্কা ছিল, কী জানি হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ছিল। নির্বাচনে নানা সমীকরণ থাকবেই, আমার প্রতিপক্ষ খুবই শক্তিশালী।

প্রথম আলো: এত দিন পর বললেন প্রতিপক্ষ শক্তিশালী?

আইভী: আমি আমার ভোটার ও নারায়ণগঞ্জবাসীকে উৎসাহ দিতে চাই। তাই সব কথা বলতে চাইও না। ২০১১ সালের নির্বাচনে আমার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তছনছ করেছে, সে বিষয়ে আমি মুখ খুলিনি। আমি শুধু বলেছি, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হবে, সবাই ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসুন। এবার সে রকম সমস্যা ছিল না, কিন্তু গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি, আঁচ করতে পেরেছি, মুখ খুলিনি। আমি সব সময় আমার লোকজনকে বলেছি, তারা যেন ভোটকেন্দ্রে আসে, ভোট দেয়। রাতের আঁধারের যে ষড়যন্ত্র হয়, জনজোয়ারে সেটি টেকে না।

প্রথম আলো: তৈমুর বলেছেন, ইভিএমে ইন্টারনাল মেকানিজম হয়েছে।

আইভী: ইভিএমে কোনো মেকানিজম হয়নি। উনি কথাটা সঠিক বলেননি। ভোটের দিন সকাল থেকে ভোট নিয়ে অভিযোগটা আমার ছিল, কাকার (তৈমুর) ছিল না। কাকার ইভিএম নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না, অভিযোগটা আমিই তুলেছিলাম। এখন ভোটের ব্যবধান হওয়ার কারণে তিনি এ কথাটা বলছেন, এটি যুক্তিসংগত বলেননি।

প্রথম আলো: একবারও কি মনে হয়েছে, আপনি হেরে যেতে পারেন?

আইভী: এটি আমার কখনো মনে হয়নি। ভোটের ব্যবধান কম হতে পারে, কিন্তু হেরে যাব কখনো মনে হয়নি। আমি সব সময় জিতব, একটা পজিটিভ ধারণা ছিল। পজিটিভ মেসেজই আমার নেতা–কর্মী, ভোটার সব জায়গায় দিয়েছি। আমার লাইফ থ্রেটও ছিল। ষড়যন্ত্র অনেক ছিল, লাইফের ওপর থ্রেটও ছিল।

প্রথম আলো: আপনার এমন আত্মবিশ্বাসের উৎস কী?

আইভী: এটার উৎস মানুষ। তারা আমাকে ভালোবাসে, তারা আমার আস্থার স্থল। আমি কখনো চেয়ারে বসে কাউকে বিভাজন করিনি। সবার কাজ করেছি সমানভাবে। কিন্তু সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেই এবার আমাকে ভোট দেয়নি। অনেকেই ভোটটাকে দলীয় বিবেচনায় নিয়েছে। বিএনপি যারা করে, ধানের শীষ না থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের দলীয় প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছে। আমার ধারণা ছিল, দলমত–নির্বিশেষে কাজ করায় তারা হয়তো আমার প্রতি সহনীয় থাকবে। তবে সাধারণ মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে, সাধারণ মানুষ আমাকে ভালোবাসে।

প্রথম আলো: এই জয়ে নৌকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, নাকি ব্যক্তি আইভী?

আইভী: এই প্রশ্ন করা আমাকে ঠিক হবে না। দল যদি আমাকে মনোনয়ন না দিত, তাহলে আমি আইভী কি নির্বাচনে দাঁড়াতে পারতাম? পারতাম না। আমি কখনো দলের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিনি। ২০১১ সালে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন কিন্তু দলীয় প্রতীক ছিল না। নেত্রীর দোয়া নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। নেত্রী যদি আমাকে জোর করে বলতেন তুমি দাঁড়াবে না, আমি কিন্তু দাঁড়াতাম না। ওই সময় দলীয় প্রতীক ছিল না। এরপর দুবার প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলাম। এবার কিন্তু আমি বরাবরের মতো বলে আসছি, দল প্রতীক দিলে নির্বাচন করব, না দিলে করব না। কারণ, আমি দল ও নেত্রীর বিরুদ্ধে যেতে পারব না।

আরও পড়ুন

শামীম ওসমান যে স্কুলে ভোট দিয়েছেন, সেখানে হেরেছেন আইভী