ভাষা আন্দোলনের বাঁকবদলের মুহূর্তগুলো নিয়ে বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ

১৯৫১ সালের মার্চে গঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঢাকাসহ প্রদেশের সর্বত্র তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদী এই সংগঠন গড়ার পেছনে প্রধান নেপথ্য শক্তি স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি। উদ্দেশ্য ছাত্র-যুবসমাজে সুস্থ রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে অগ্রচারী সহায়ক সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তোলা। ভাষা আন্দোলনকে শক্তিমান করে তোলার বিষয়টিও তাদের চিন্তায় ছিল। তবে বিশেষ সতর্কতা ছিল একে কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গসংগঠনের বদলে উদার গণতন্ত্রী প্রগতিবাদী ধারায় সংগঠিত করা, যাতে উদার ভিন্ন চিন্তার রাজনীতিমনস্ক যুবারাও এতে অংশ নিতে পারেন। বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল।
এই সংগঠন সম্পর্কে যে যেমনই বলুন, এর মিশ্র রাজনৈতিক চরিত্র সত্ত্বেও এতে ছিল প্রগতিবাদী সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রাধান্য। সংগঠনের নির্বাহী কমিটির অন্তর্ভুক্ত উল্লেখযোগ্য যুবাদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক পরিচয় থেকে এর প্রমাণ মিলবে। অবশ্য কৌশলগত কারণে তখন যুবলীগের প্রথম সভাপতি মনোনীত করা হয় রাজনৈতিক বিচারে মধ্যপন্থী মহম্মদ আলীকে।
সহসভাপতি হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, ইয়ার মহম্মদ খান, শামসুজ্জোহা, দৌলতুন্নেছা প্রমুখ। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁরা সবাই চেনামুখ। সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ, যুগ্ম সম্পাদক আবদুল মতিন ও রুহুল আমিন। সদস্যদের মধ্যে বিশিষ্টজন মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হালিম সরদার, আবদুস সামাদ, কে জি মোস্তফা, কবির আহমদ, আবদুল ওদুদ, প্রাণেশ সমাদ্দার প্রমুখ।
যুবলীগের গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদী আদর্শের প্রকাশ ঘটেছিল স্বদেশে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনায়, আন্তর্জাতিক পরিসরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চরিত্রে। তাই যুবলীগ যেমন ভাষা আন্দোলন সফল করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তেমনি মৌলিক অধিকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্দোলনের অংশীদার হয়েছে। যেমন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, প্রাথমিক শিক্ষকদের সংগত দাবি-দাওয়া এবং অনুরূপ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ।
ওই বছরেরই ডিসেম্বরে যে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়, তাতেও পূর্বোক্ত রাজনৈতিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। যেমন সভাপতি নওবেলাল সম্পাদক মাহমুদ আলী, সহসভাপতি মির্জা গোলাম হাফিজ, ফয়েজ আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, ইয়ার মোহাম্মদ খান ও শামসুজ্জোহা। সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ এবং যুগ্ম সম্পাদক ইমাদুল্লাহ ও মুহম্মদ সুলতান। কোষাধ্যক্ষ মাহবুব জামাল জাহেদী। সদস্য আবদুল মতিন, এবিএম মূসা, আবদুল হালিম সরদার, আবদুল ওদুদ, আলী আশরাফ, তাজউদ্দীন আহমদ, আবদুস সামাদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, প্রাণেশ সমাদ্দার প্রমুখ।
প্রধানত তাঁরাই একুশের ভাষা আন্দোলনে মূল কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে তুলেছিলেন এবং বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সফল করে তুলতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই বলাই বাহুল্য, একুশের আন্দোলনে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, যদিও এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক নাম তখন পূর্ববঙ্গ। কমিউনিস্ট পার্টি কৌশলগত কারণে পূর্ব পাকিস্তান নামটি ব্যবহার করেছিল।
আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক