default-image

লাল-হলুদ টাইলস বসানো ফুটপাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের উপযোগী করে বানানো। কিন্তু ফুটপাতের মাঝে কিছু দূর পরপর রয়েছে মৃত্যুফাঁদ। রাজধানীর গুলশান এলাকার বিভিন্ন ফুটপাতে ৪০০টির মতো লোহার স্ল্যাব (আয়রন গ্রেটিংস) নেই। এমন পরিস্থিতিতে সুস্থ মানুষকেই চলাচলে বেগ পেতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।

গুলশান ১ ও ২ নম্বর এলাকায় ১৪৪টি সড়ক রয়েছে। গতকাল শনিবার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতে একটু পরপর গভীর গর্ত। ফুটপাতের লোহার স্ল্যাব তুলে নেওয়াতে এমন পরিস্থিতি হয়েছে। লোকজন ফুটপাতের বদলে বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটছে। কোথাও গর্তের মধ্যে বাঁশ, লাঠি, গাছের ডালপালা দিয়ে লোকজনকে সতর্ক করা হয়েছে।

গতকাল বেলা একটার দিকে গুলশান ১-এর ১৩৪ ও ১৩৫ নম্বরের সংযোগস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আবাসিক ভবনের পাশাপাশি দুটি সড়কে বেশ কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও পার্টি সেন্টার রয়েছে। লোকজনের উপস্থিতিও অনেক। কিন্তু কেউ পারতপক্ষে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে না। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, বেশ অনেক দিন ধরেই ফুটপাতের এমন অবস্থা। গর্তগুলো ভয়ানক। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

আড়াই বছর ধরে এই সমস্যা চলছে। সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ল্যাব চুরির ঘটনা বেড়েছে। এত টাকা দিয়ে বানানো ফুটপাত কিন্তু মানুষ হাঁটতে পারছে না। নানা সময়ে দুর্ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি।
শুক্লা সারওয়াত সিরাজ, গুলশান সোসাইটির মহাসচিব

গত ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গুলশান ২-এর ৭৫ নম্বর সড়কের ফুটপাতে এমন একটি গর্তে পড়ে পা ভেঙে যায় এক নারীর। ৬৬ বছর বয়সী ওই নারী অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী। ওই নারীকে এখনো পায়ের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর স্বামী বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় হয়ে গেল, এখনো হুইলচেয়ারে চলতে হচ্ছে। দুর্ঘটনার বিষয়টিতে কষ্ট পেয়েছি খুব। দুর্ঘটনার কথা জানার পরও কেউ যোগাযোগ করেনি। সামান্য দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেনি।’

বিজ্ঞাপন

গত বছরের ৪ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র বরাবর একটি চিঠি দেয় গুলশান সোসাইটি। তাতে বলা হয়, সোসাইটির পক্ষ থেকে সরেজমিন জরিপ চালিয়ে ৪৯০টি ঢাকনাবিহীন স্ল্যাব চিহ্নিত করা হয়েছে। অবশ্য এরপর কয়েকটি সড়কে কিছু কংক্রিটের স্ল্যাব বসায় সিটি করপোরেশন।

গুলশান সোসাইটির মহাসচিব শুক্লা সারওয়াত সিরাজ প্রথম আলোকে বলেন, আড়াই বছর ধরে এই সমস্যা চলছে। সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ল্যাব চুরির ঘটনা বেড়েছে। এত টাকা দিয়ে বানানো ফুটপাত কিন্তু মানুষ হাঁটতে পারছে না। নানা সময়ে দুর্ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি।

বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয় ও দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থাকায় গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার সড়ক, ফুটপাত ও পয়োব্যবস্থার উন্নয়নে কয়েক বছর আগে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল ডিএনসিসি। এরপর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ‘গুলশান, বনানী ও বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ এবং উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ডিএনসিসি। প্রকল্পে ব্যয় হয় ২০০ কোটি টাকা।

লোহার স্ল্যাব বসানোর উদ্দেশ্য ভালো ছিল। যখন চুরির ঘটনা শুরু হয়, তখনই সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। প্রকল্পে টাকা ব্যয় হলেও এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন এককভাবে এগুলো রক্ষা করতে পারবে না, স্থানীয় সোসাইটি, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে একত্রে উদ্যোগ নিতে হবে।
আকতার মাহমুদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি

প্রকল্পের অধীনে পুরো গুলশান এলাকার ফুটপাতগুলো সংস্কার করা হয়। প্রতিবন্ধীদের চলাচলের উপযোগী করে ফুটপাতে টাইলস বসানো হয়। ফুটপাতের নিচে পানি নিষ্কাশনের নালাগুলো পরিষ্কার করার সুবিধার জন্য কংক্রিটের স্ল্যাবের বদলে লোহার খাঁচা (আয়রন গ্রেটিংস) বসানো হয়। তবে বসানোর কয়েক দিন পরই এই খাঁচাগুলো চুরি হতে থাকে। মূলত মাদকসেবীরা রাতের অন্ধকারে এগুলো তুলে নিয়ে যায়।

২০১৬-১৭ সালে গুলশান এলাকার ফুটপাত নির্মাণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক খন্দকার মাহবুব আলম বর্তমানে ডিএনসিসির সিভিল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই লোহার স্ল্যাবগুলো থাকলে খুব সহজে এবং সাশ্রয়ীভাবে নর্দমা পরিষ্কার করা যেত। কিন্তু একাধিকবার লাগানোর পরও লোহার স্ল্যাবগুলো চুরি হয়ে যাচ্ছে। লোহার বদলে কংক্রিটের স্ল্যাব বসানো হবে। ইতিমধ্যে ৫০০-র মতো কংক্রিটের স্ল্যাব তৈরি করা হয়েছে, ধাপে ধাপে বসানো হবে।

গুলশান এলাকার সব সড়কেই ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা রয়েছে। তারপরও ফুটপাতের স্ল্যাব চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। গুলশান সোসাইটির পক্ষ থেকে পুলিশকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ইতিপূর্বে স্ল্যাব চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দু-একজনকে পাওয়া গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এত স্ল্যাব না থাকার বিষয়টি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গুলশান ১ ও ২ নম্বর এলাকায় ১৪৪টি সড়ক রয়েছে। গতকাল শনিবার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতে একটু পরপর গভীর গর্ত। ফুটপাতের লোহার স্ল্যাব তুলে নেওয়াতে এমন পরিস্থিতি হয়েছে। লোকজন ফুটপাতের বদলে বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটছে। কোথাও গর্তের মধ্যে বাঁশ, লাঠি, গাছের ডালপালা দিয়ে লোকজনকে সতর্ক করা হয়েছে।

ফুটপাতের এই সমস্যা নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে আড়াই বছর ধরে। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গুলশান সোসাইটির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফুটপাতের লোহার স্ল্যাব হারানো নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে আলোচনা হলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি আকতার মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, লোহার স্ল্যাব বসানোর উদ্দেশ্য ভালো ছিল। যখন চুরির ঘটনা শুরু হয়, তখনই সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। প্রকল্পে টাকা ব্যয় হলেও এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন এককভাবে এগুলো রক্ষা করতে পারবে না, স্থানীয় সোসাইটি, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে একত্রে উদ্যোগ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন