গেন্ডারিয়ার আলোকশিখা

সীমান্ত গ্রন্থাগারে বই হাতে এক পাঠক l মনিরুল আলম
সীমান্ত গ্রন্থাগারে বই হাতে এক পাঠক l মনিরুল আলম

সীমান্ত গ্রন্থাগারে বসে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছিলেন তরুণ ইমদাদুল হক মিলন। হঠাৎ চাঞ্চল্য। পাড়ার এক বড় ভাইয়ের দিকে সবার মনোযোগ। বিষয়টা কী? বিষয় হলো, ওই ভাই একটা গল্প লিখেছেন এবং সেটা ছাপাও হয়েছে। সেই ছাপা পত্রিকাটি হাতে নিয়েই সবার কৌতূহল। ওদিকে বড় ভাইও বেশ একটা ভাবের মধ্যে আছেন।
মিলন মনে মনে ভাবেন, উনি গল্প লিখতে পারলে আমি কেন পারব না? খ্যাতিমান এই কথাসাহিত্যিকের সেই হলো শুরু।
ইমদাদুল হক মিলন গত বুধবার রাতে আলাপকালে প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‘আমার জীবনের ৩৪টি বছর গেন্ডারিয়ায় কেটেছে। সীমান্ত গ্রন্থাগার না থাকলে হয়তো আমি লেখকই হতাম না।’
পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া বিখ্যাত কয়েকটি কারণে। বিরাট ধূপখোলা মাঠ এই গেন্ডারিয়ায়। তারপর সেই ১৯১৪ সালে অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠিত সাধনা ঔষধালয়। গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি এখন অনেকের কাছে বিস্মৃত একটি নাম। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আশালতা সেন ১৯২৪ সালে এই সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন, যা টিকে আছে আজও। আর গেন্ডারিয়ার আলোকশিখা হয়ে আছে ৬৫ বছরের সীমান্ত গ্রন্থাগার।
দয়াগঞ্জ মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে হাতের ডানে ডিস্টিলারি রোড। এখানেই নবপ্রতিষ্ঠিত আসগর আলী হাসপাতাল। এই হাসপাতাল পার হয়ে দীননাথ সেন রোডে পা দিলেই সীমান্ত গ্রন্থাগার।
১৩ জুন সোমবার ভরদুপুরে সীমান্ত গ্রন্থাগারে ঢুকে বেশ হতশ্রী পরিবেশ চোখে পড়ে। ভেতরে চেয়ার, টেবিল অগোছালো। যত্রতত্র পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। ধুলোময়লা তো আছেই। আলমারির ভেতরে বন্দী সব বই। কত দিন যে কারও হাতের ছোঁয়া পড়েনি কে জানে!
এই পরিবেশেও একজন পাঠকের দেখা মিলল। যদিও পাঠাগার আনুষ্ঠানিকভাবে খোলে বিকেল চারটায়, আর বন্ধ হয় সাধারণত মাগরিবের পরে। শীতকালে অবশ্য সময়সূচি কিছুটা হেরফের করতে হয়। এই পাঠক ডিস্টিলারি রোডের ৫৮ বছর বয়সী জাকির হোসেন, যিনি নিজেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। বই পড়েন নিয়মিত। আর তাঁর কাজের সূত্র ধরে এই পাঠাগারে তো আসতেই হয়।
পাঠাগারটির এখন সংস্কারকাজ চলছে। পলেস্তারা খসে দেয়ালের যাচ্ছেতাই দশা হয়েছিল। এখন মূল দেয়াল পুনর্নির্মাণ প্রায় শেষ। ভেতরে মিলনায়তন ও উন্মুক্ত মঞ্চেরও নতুন করে সাজসজ্জা হচ্ছে। যাবতীয় খরচ মেটানো হচ্ছে গেন্ডারিয়ারই বিদ্যোৎসাহী একটি পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়।
সীমান্ত গ্রন্থাগারের সাধারণ সম্পাদক কাজী সুলতান আহমেদ বলছিলেন, ‘সংস্কারের মধ্য দিয়ে আর বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে এই পাঠাগারকে ঘিরে এলাকায় একটা সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।’
এখন এখানে নিয়মিত গ্রন্থাগারিক নেই। কারণ পাঠক কমে গেছে। তানজিম হাসান নামে এক স্বেচ্ছাসেবী এ দায়িত্ব পালন করেন। যদিও পাঠাগারের স্থায়ী সদস্য এখনো ছয় শ থেকে সাড়ে ছয় শ। তবে এর একটি অংশ এখন আর সক্রিয় নেই। সুলতান আহমেদ বলছিলেন, ‘পাঠক কমেছে সত্য, তবু কিছু এখনো আছেন, যাঁরা বিকেলে আসেন। বই, পত্রিকা পড়েন।’
দুটি পত্রিকা রাখা হয় এখানে, জানালেন সুলতান আহমেদ। পাঠাগারটিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত হাজার। ১৯৭৪ সালের বন্যা-ঝড়ে চাল উড়ে গিয়ে বেশ কিছু বই ভিজে যায়, ভেসে যায়। পাঠাগারে দুষ্প্রাপ্য কিছু বই ছিল, যার অনেকগুলোই হয়তো এখন নেই। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের হাতের লেখা একটি বইয়ের কথা জানালেন তিনি।
সুলতান আহমেদ মেলে ধরলেন ইতিহাসের ডালি। প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা নাসিম আলী গেন্ডারিয়ায় তাঁর নিজের বাড়ির একটি ঘরে সীমান্ত গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫১ সালে। এর পরের বছর দীননাথ সেন রোডে অম্বিকা চরণ চক্রবর্তীর পরিত্যক্ত বাড়িতে ঠিকানা পায় গ্রন্থাগারটি। মূলত দেশভাগের আগে ব্রিটিশবিরোধী নেতাদের অনেকেই গেন্ডারিয়ার এই বাড়িতে আত্মগোপনে থেকে রাজনীতি চালিয়ে যেতেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সত্যেন সেন, জ্ঞান চক্রবর্তী, নেপাল নাগ, নিবেদিতা নাগ। মূলত তাদের উৎসাহ-পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে গ্রন্থাগারটি।
১৯৭৬ সালে নজরুল জন্মজয়ন্তীতে সপরিবারে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, এই গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে। গ্রন্থাগারের উজ্জ্বল কাজগুলোর মধ্যে এটিও একটি।
বিভিন্ন সময়ে এই গ্রন্থাগারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লেখক, শিক্ষাবিদ ড. হায়াৎ মামুদ, সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার, আবেদ খান, সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদ, অভিনেতা শওকত আকবর, আলী যাকেরসহ অনেকেই।
গ্রন্থাগারটির ঝিমিয়ে পড়া প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা হায়াৎ মামুদ প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‘গেন্ডারিয়ায় লেখাপড়ার চর্চা ছিল, শিক্ষা-দীক্ষা ছিল। মানুষ এখন একটা বই পড়তে চায় না। কিন্তু সেই বই অবলম্বনে কোনো সিনেমা হলে তা আবার দেখে। এখনকার ধারাটাই এ রকম।’
সীমান্ত গ্রন্থাগারটি যে জমির ওপর দাঁড়িয়ে, শুরু থেকে এখনো সেটি ঢাকা জেলা প্রশাসনের সম্পত্তি। একসনা লিজ নেওয়া বলে ভাড়া মিটিয়ে নবায়ন করতে হয় প্রতিবছরই। অনেকেরই লোলুপ দৃষ্টি এই সম্পত্তির ওপর। বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি, বহুতল বিপণিবিতান বানাতে চায় কেউ কেউ। এ অবস্থায় সীমান্ত গ্রন্থাগারকে বাঁচাতে অবিলম্বে জমিটুকু প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল করে দেওয়ার দাবি এখানকার বিদ্যোৎসাহী মানুষের।