গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতেন?

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামী এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম আবদুর রহিম (বায়ে) এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী। ছবি: প্রথম আলো
১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামী এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম আবদুর রহিম (বায়ে) এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী। ছবি: প্রথম আলো

১০ ট্রাক অস্ত্রের মতো বড় অস্ত্রের চালান বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পরিবহনের বিষয়টি দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি গোয়েন্দা সংস্থার তত্কালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতেন। এই মামলার প্রধান আসামি হাফিজুর রহমান ২০০৯ সালের ২ মার্চ চট্টগ্রামের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা জানিয়েছেন।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে হাফিজের বক্তব্যের সপক্ষে বেশ কিছু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, অস্ত্রের চালানটি চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার (সিইউএফএল) জেটিতে আনার আগে তা বহনের জন্য ট্রাক ভাড়া করেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মাঠ কর্মকর্তা (ফিল্ড অফিসার) আকবর হোসেন। অস্ত্র আটকের মাস দুয়েক আগে এই কর্মকর্তাকে আকস্মিকভাবে চট্টগ্রামের কর্মস্থল থেকে ঢাকায় মহাপরিচালকের বিশেষ শাখায় (স্পেশাল উইং) সংযুক্ত করা হয়। সাধারণত স্পেশাল উইং শাখায় কর্মরতদের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ, অনুগত ও বিশ্বস্ত বলে ধরা হয়।
কর্মস্থল ঢাকায় হলেও ২০০৪ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে আকবর হোসেন চট্টগ্রামেই বেশি থাকতেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ওই সূত্র মতে, অস্ত্র আটকের আগে টানা এক সপ্তাহ তিনি চট্টগ্রামে অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি নগরের কদমতলীর পরিবহন সংস্থা ‘গ্রিনওয়েজ ট্রান্সপোর্টেশন লিমিটেডে’ গিয়ে সাতটি ট্রাক ও একটি ট্রাক ক্রেন ভাড়া নেন। সিইউএফএল থেকে সার পরিবহনের কথা বলে এসব ট্রাক ভাড়া নেওয়া হয় এবং ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে এসব ট্রাক ও ক্রেন সিইউএফএল ঘাটে নিয়ে যান।

গ্রিনওয়েজ ট্রান্সপোর্টের মালিক মো. হাবিবুর রহমান প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন, ‘এনএসআই কর্মকর্তা আকবর ও আরও এক ব্যক্তি গিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে সাতটি ট্রাক ভাড়া করেছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘অনেক লোকই তো আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রাক ভাড়া নেয়। আকবর সাহেবও সেভাবে ট্রাক ভাড়া নিয়েছিলেন।’ এসব তথ্য তিনি অস্ত্র ও চোরাচালান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে লিখিতভাবে দিয়েছেন বলেও হাবিবুর রহমান দাবি করেন।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় চট্টগ্রামের আদালতে হাজির হন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মাঠ কর্মকর্তা (ফিল্ড অফিসার) আকবর হোসেন। ছবিটি ২০০৯ সালের ১৯ এপ্রিল তোলা। ছবি: প্রথম আলো
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় চট্টগ্রামের আদালতে হাজির হন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মাঠ কর্মকর্তা (ফিল্ড অফিসার) আকবর হোসেন। ছবিটি ২০০৯ সালের ১৯ এপ্রিল তোলা। ছবি: প্রথম আলো


আকবর ওই সময় (২০০৪ সালে) ঢাকার এনএসআই সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি পটুয়াখালীতে মাঠ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন প্রথম আলোর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে আকবর হোসেন বলেন, ‘অস্ত্র আটক ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।’ গ্রিনওয়েজ ট্রান্সপোর্টের মালিকের স্বীকারোক্তির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে আকবর বলেন, ‘এত দিন পর এসব জিনিসপত্র নিয়ে টানাহেঁচড়া করে লাভ কী? আমার মতো চুনোপুঁটি কি নিজের ইচ্ছায় কিছু করতে পারি?’
মাঠ পর্যায়ের এনএসআই কর্মকর্তা আকবরের ট্রাক ভাড়া করার কথা জানার পর কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এনএসআইয়ের তত্কালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম আবদুর রহিম বলেছিলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কেন ব্যবস্থা নেব? যে পরিচালক তাঁকে স্পেশাল উইংয়ে এনেছিলেন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তো তাঁরই নেওয়ার কথা।’ সে সময় এনএসআইয়ের পরিচালক (নিরাপত্তা) উইং কমান্ডার শাহাব উদ্দীনকে উদ্দেশ করে তিনি এ কথা বলেন।
এম আবদুর রহিমের এ কথার জবাবে শাহাব উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমি কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব। আমার কোনো মতামত না নিয়েই তো ডিজি সাহেব আকবরকে স্পেশাল উইংয়ে বদলি করে এনেছিলেন। কেন এনেছিলেন তা তিনিই তো ভালো বলতে পারেন।’
এনএসআইয়ের তত্কালীন এই দুই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার বক্তব্যই ইঙ্গিত করে, মাঠ কর্মকর্তা আকবরকে ঢাকায় বিশেষ শাখায় আনা এবং ট্রাক ভাড়া করার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো—সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে।

জানা যায়, এম আবদুর রহিমকে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। পরে তিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেন। জোট সরকার ক্ষমতায় এলে এই ব্যবসায়ী ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাকে এনএসআই মহাপরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

জনাব রহিম দাবি করেন, ‘১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের পরই আমরা বিষয়টি জেনেছি, আগে নয়।’

এ ছাড়া অস্ত্রের চালানটি আটক হওয়ার এক-দেড় বছরের মধ্যে এনএসআইয়ের প্রভাবশালী তিন পরিচালকসহ মোট পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির বিষয়টিও রহস্যজনক। এনএসআইয়ের কোনো কর্মকর্তা ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের ঘটনাটি আগেভাগে ফাঁস করে দিতে পারেন—এমন ধারণা থেকে তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হতে পারে বলে চাকরিচ্যুত অনেক কর্মকর্তা মনে করেন।

সেই সময় এনএসআইয়ের সাবেক পরিচালক (নিরাপত্তা) শাহাব উদ্দীন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি নিজেও জানি না কেন চাকরিচ্যুত হলাম।’ প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘অস্ত্র আটক ঘটনার সময় আমি বিদেশে প্রশিক্ষণে ছিলাম। দেশে এসে বিমানবাহিনীতে ফিরে যাওয়ার পর জানতে পারি আমার চাকরি নেই। আমাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’

অস্ত্র আটকের ঘটনার পর বেশির ভাগ এনএসআই কর্মকর্তার চাকরি চলে যাওয়া প্রসঙ্গে শাহাব উদ্দীন বলেন, ‘সেটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ছিল। আমার করার কিছুই ছিল না। এটার সঙ্গে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনার সম্পৃক্ততার কোনো বিষয় আমার জানা নেই।’

১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের রাতে উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর বা ডিজিএফআইয়ের প্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলবেন বলে হাফিজকে জানান। কিন্তু কথা হয়েছিল কি না, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তা পরিষ্কার করে জানাননি হাফিজ। এ ব্যাপারে ডিজিএফআইয়ের তত্কালীন প্রধান মে. জেনারেল সাদেক হাসান রুমি প্রথম আলোকে বলেন, হাফিজের বক্তব্য ঠিক নয়, তিনি আরও বলেন, এটা ডিজিএফআইকে তদন্ত করতে দেয়নি সরকার।

১০ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলাটি তদন্তকালে এ-সংক্রান্ত মামলার চতুর্থ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী সুপার মো. ইসমাইল হোসেন গত ডিসেম্বরে রেজ্জাকুল হায়দারের সঙ্গে কথা বলে তাঁর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন। রেজ্জাকুল হায়দার সে সময় ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন।

রেজ্জাকুল হায়দার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্ত্র আটকের পর সরকারি কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছিল। এ কারণে তদন্ত কর্মকর্তা আমার বক্তব্য নিয়েছেন। আমার যা জানা ছিল সবই বলেছি। এ ছাড়া আমরা লিখিত একটি প্রতিবেদনও সরকারকে জমা দিয়েছিলাম। সময় কম থাকায় অস্ত্র পাচারের সঙ্গে কারা, কীভাবে জড়িত এবং কার জন্য কোথা থেকে এ অস্ত্র আনা হয়, সেটা বের করা সম্ভব হয়নি।’

(অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি ২০০৯ সালের ৫ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছিল। পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে কিছু পরিমার্জন করে প্রতিবেদনটি আবার প্রকাশ করা হলো)