করোনায় বেড়েছে ঘরে বসে বাজার করার অভ্যাস।
করোনায় বেড়েছে ঘরে বসে বাজার করার অভ্যাস।ছবি: জাহিদুল করিম

২০১৩ সালে যখন চালডাল শুরু হয়, তখন না ছিল হাতে হাতে ইন্টারনেট, না ছিল মানুষের ঘরে বসে বাজার করার অভ্যাস। প্রথম যখন উৎপাদকদের কাছে পণ্য কিনতে গেলাম, তাঁরা অনলাইন বাজারের কোনো উদ্যোগের কাছে পণ্য দিতে রাজি ছিলেন না। যাঁরাও–বা রাজি হয়েছিলেন, তাঁরা কেউ তৈরি ছিলেন না। পণ্যের ছবি তোলা থেকে শুরু করে প্রতিটি কাজ শুরু থেকে করতে হয়েছে।

আমরা দীর্ঘ আট বছর কাজ করেছি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে জনপ্রিয় করতে। আমাদের দৈনিক সর্বোচ্চ ক্ষমতা ছিল ৩ হাজার অর্ডার বা সরবরাহ সম্পন্ন করা । খুব বিশেষ ক্ষেত্রে তিন হাজার অর্ডার আসত, গড়ে ছিল আড়াই হাজার। করোনা আসায় রাতারাতি বাজারটা দ্বিগুণ হয়ে গেল, অথচ আমরা কতই না চেষ্টা করতাম অর্ডার বড় করতে।

করোনা আসায় সবাই ঘরে বসে বাজার করা শুরু করলেন। কোথায় আমরা খুশি হব, উল্টো আমরা ঘাবড়ে গেলাম। একদিন আকস্মিকভাবে ৩ হাজার থেকে দৈনিক অর্ডার হয়ে গেল ১৬ হাজার। অথচ আমাদের অর্ধেক কর্মী করোনা থেকে বাঁচতে কাজ ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। অর্থাৎ অর্ধেক ক্ষমতায় পাঁচ গুণ ব্যবসা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

আমরা শুরু করলাম কর্মী নিয়োগ দেওয়া। আমাদের কাজ কাঁচাবাজার নিয়ে, এখানে সময় খুব জরুরি। গ্রাহককে টাটকা পণ্য পৌঁছাতে হবে। পণ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুব জরুরি, যারা পণ্য নাড়াচাড়া করে, তাদের দক্ষ হতে হবে। আমরা কোমর বেঁধে নামলাম গুছিয়ে উঠতে।

প্রতিদিন অনেক অর্ডার আসত, সেই অর্ডার হাতে পেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন গ্রাহকেরা। তাঁদের এই আগ্রহ কর্মীদের মনেও গুরুত্ব তৈরি করল। আমরা ভাবতে শিখলাম, এই করোনার দুঃসময়ে আমরা একেকজন যোদ্ধা। ঠিক যোদ্ধাদের মতোই আমরা দিনরাত কাজ শুরু করলাম। আগে আমাদের অফিস একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে চলত, করোনায় তা ২৪ ঘণ্টার শিফট হয়ে গেল। আমরা খুব তৃপ্তি অনুভব করতাম মানুষের পাশে এমন সময়ে থাকতে পেরে।

করোনা আসায় সবাই ঘরে বসে বাজার করা শুরু করলেন। কোথায় আমরা খুশি হব, উল্টো আমরা ঘাবড়ে গেলাম। একদিন আকস্মিকভাবে ৩ হাজার থেকে দৈনিক অর্ডার হয়ে গেল ১৬ হাজার। অথচ আমাদের অর্ধেক কর্মী করোনা থেকে বাঁচতে কাজ ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। অর্থাৎ অর্ধেক ক্ষমতায় পাঁচ গুণ ব্যবসা করতে হবে।

ধীরে ধীরে আমরা কর্মী ও গুদামের সংখ্যা বাড়ালাম। অনেকগুলো গুদাম তৈরির সুবিধা হচ্ছে, প্রতিটি গুদামকে একটা কেন্দ্রবিন্দু ধরে এর পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে খুব দ্রুত পণ্য পাঠিয়ে দেওয়া যায়। করোনার আগে চালডালের সাতটি গুদাম ছিল, প্রায় আট কিলোমিটার ব্যাসার্ধ হিসাব করে অর্ডার পাঠাতে হতো। এতে পণ্য নষ্ট হতো, ক্রেতারা অসন্তুষ্ট হতেন। আমরা বুঝতে পারি, এভাবে আমরা টিকতে পারব না। যেভাবেই হোক, আমাদের ক্রেতাদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে। না হলে করোনার জরুরি অবস্থায় হয়তো ক্রেতারা বাধ্য হয়ে পণ্য কিনবেন, কিন্তু দ্রুতই অন্য ব্যবস্থা খুঁজে নেবেন। এর সুফলও পাওয়া গেল। এখন যখন মানুষ আবার স্বাভাবিক চলাচল শুরু করেছে, আমাদের দৈনন্দিন অর্ডারের সংখ্যা ১০ হাজারে স্থির হয়েছে। করোনার আগের তুলনায় তা তিন গুণের বেশি।

default-image

২০১৩ সালে আমরা যখন শুরু করি, আমরা ভাবতাম, ঢাকার প্রতিটি বাড়ি পর্যন্ত চালডালের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছাব। অনেকটা বছর পার হয়ে গেলেও আমরা সেই স্বপ্নের ধারেকাছেও যেতে পারছিলাম না। একে তো বাংলাদেশের মানুষের বাজারে গিয়ে দেখে–শুনে পণ্য কিনতে পছন্দ করেন। আর চালডাল কেবল সরবরাহকারী। উৎপাদকেরা পণ্যকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো প্রক্রিয়াজাত করতেন না। ফলে আমরাও সুবিধা করতে পারছিলাম না।

করোনায় সবচেয়ে বড় যে লাভটা হলো, তা হচ্ছে মানুষ সহজেই বুঝতে শিখল হিমায়িত মাছ-মাংস মানেই বাসি নয়। উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যকে হিমায়িত করা শুরু করল। এতে আমাদের জন্যও কাজটা খুব সহজ হলো।

পুরো ঢাকা শহরে বাজার পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি যে কত বড়, তা–ও আমরা বুঝতে পারলাম এই করোনাকালেই। ধরুন, ঢাকার প্রতিটি পরিবার যদি দৈনন্দিন পণ্য বাড়িতে চায়, দৈনিক অর্ডারের পরিমাণ হবে এক লাখ—বাজারটা এতটাই বড়। এখানে আমাদের সহযোগিতা করল প্রতিযোগীরা।

বিজ্ঞাপন
করোনার কারণে ক্রেতাদের জীবনযাপন ও আচরণে পরিবর্তন এসেছে, আর সেটাই ঘরে বসে বাজার ধারণাটিকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে।

যখন আমরা দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ হাজার অর্ডার ডেলিভারি দিতাম, তখন বাজারে খুব কম প্রতিযোগী ছিল। করোনার শুরুতে বাড়িতে বাজারের চাহিদা বাড়লে অনেকেই এই ব্যবসা ধরতে চাইল। তখন পুরো ঢাকা শহরে দৈনিক অর্ডারের চাহিদা ৪০ হাজারের বেশি। ওদিকে আমরা অর্ধেক ক্ষমতা দিয়ে পাঁচ গুণ ক্রেতাকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সত্যি বলতে প্রতিযোগীরা তখন বোঝা ভাগাভাগি করেছে। ক্রেতাদের ধরে রেখেছে, অনলাইনে অভ্যস্ত করেছে। আমরা একা কিছুতেই এতটা করতে পারতাম না। প্রতিযোগীদের থেকে অনেক কিছু শিখছি। মান ধরে রাখতেও তারা আমাদের সাহায্য করছে।

করোনায় সবচেয়ে বড় যে লাভটা হলো, তা হচ্ছে মানুষ সহজেই বুঝতে শিখল হিমায়িত মাছ-মাংস মানেই বাসি নয়। উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যকে হিমায়িত করা শুরু করল। এতে আমাদের জন্যও কাজটা খুব সহজ হলো।

করোনার কারণে ক্রেতাদের জীবনযাপন ও আচরণে পরিবর্তন এসেছে, আর সেটাই ঘরে বসে বাজার ধারণাটিকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে। আমরা সাহস পাচ্ছি দেশের অন্যান্য শহরেও চালডালের সেবা নিয়ে যেতে।

আমাদের ইচ্ছা দেশের অন্য বড় শহরগুলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে ই–কমার্সের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। ক্রেতাদের যদি আমরা যথাযথ পণ্য ও সেবা দিতে পারি, দৈনিক অর্ডার বাড়াতে আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে যাব। করোনা আমাদের সেই অভিজ্ঞতাটাই দিয়েছে।

জিয়া আশরাফ: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা, চালডাল ডটকম

মন্তব্য পড়ুন 0