ঘাগড়ার মানুষ বিপদে ঘাবড়ায় না!

পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালুর নিচে হারিয়ে গেছে রাঙামাটির কাউখালীর ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠ। অভিভাবক ও শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা গতকাল সকাল থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বালু তুলে মাঠ পরিষ্কারের কাজ করেন l ছবি: প্রথম আলো
পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালুর নিচে হারিয়ে গেছে রাঙামাটির কাউখালীর ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠ। অভিভাবক ও শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা গতকাল সকাল থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বালু তুলে মাঠ পরিষ্কারের কাজ করেন l ছবি: প্রথম আলো

এক মাস আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় ভবনের এক পাশ ধসে যায়। পাথর ও বালুর স্তূপ জমে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি রাঙামাটি জেলা পরিষদকেও বিষয়টি জানানো হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশা ছিল, ভবন ও মাঠ রক্ষায় দ্রুত সহায়তা পাওয়া যাবে। কিন্তু মাস পেরোলেও স্থানীয় প্রশাসনের নড়চড় নেই। গত বুধবার বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষক নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে আলাপ করছিলেন। হঠাৎ একজন প্রস্তাব করলেন, তাঁরা নিজেরাই সংস্কারকাজ শুরু করতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা এই প্রস্তাবে সায় দেন।

এভাবেই ঘটনার শুরু। এরপর বিদ্যালয়ের আশপাশের বাসিন্দা ও কয়েকজন অভিভাবককে স্বেচ্ছাশ্রমের জন্য আহ্বান জানান শিক্ষকেরা। এই আহ্বানে সাড়া দেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। ঠিক হয় শুক্রবার (গতকাল) থেকে কাজে নামবেন তাঁরা। প্রথমে মাঠ থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানো হবে। কথামতো দা, কোদাল ও বস্তা নিয়ে প্রায় দুই শ অভিভাবক ও শিক্ষার্থী গতকাল সকাল ছয়টার মধ্যে হাজির হয় বিদ্যালয়ের মাঠে।

সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ভবন ও মাঠের সংস্কারকাজ গতকাল থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শুরু হয়েছে। গত ১৩ জুনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বিদ্যালয় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঠদানের অনুপযোগী হলেও বাধ্য হয়ে চলতি মাসের ৬ জুলাই থেকে ভাঙা ভবনে শিক্ষার্থীদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

রাঙামাটি শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাশে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের অবস্থান। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৮৬। অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের তিনজন খেলোয়াড় আনুচিং মগিনি, আনাইচিং মগিনি ও মনিকা চাকমা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা এখন জাতীয় দলের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে রয়েছে।

ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সুভাষ চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বালিকা ফুটবলে গত বছর সারা দেশের মধ্যে এই বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আগামী আগস্ট মাসে আবারও প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের মাঠটিতে পাথর, বালু ও ধ্বংসস্তূপ থাকায় শিক্ষার্থীদের অনুশীলন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তাই সব অভিভাবক ও এলাকাবাসী নিজ খরচে ও শ্রমে ভবন এবং মাঠটি ব্যবহারের উপযোগী করতে গতকাল সকাল থেকে কাজ শুরু করেছেন।

গতকাল সকাল ১০টায় বিদ্যালয়ের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা কাজ করছেন। কেউ কেউ মাঠ থেকে কাদা, বালু ও পাথর খুঁড়ছেন, কেউবা মাঠ থেকে তোলা মাটি বস্তায় ভরছেন। আবার আরেক দল ওই মাটি ও বালুর বস্তা ধসে যাওয়া ভবনের পেছনের অংশে ফেলে তা ঝুঁকিমুক্ত করার চেষ্টা করছে।

স্বেচ্ছাশ্রমে যোগ দেওয়া অভিভাবক সোনারাম চাকমা, মংতোয়াই মারমা ও শশী চাকমা বলেন, যে পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ রয়েছে, তার পুরোটা হয়তো গ্রামবাসীর পক্ষে সরানো সম্ভব নয়। তারপরও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভবনটিকে যতটুকু রক্ষা করা যায়, সে চেষ্টা চলছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যালয়ের চারদিকে এখনো ধ্বংসস্তূপ। ২ জুলাই বিদ্যালয় খোলার পর ক্লাস শুরু করা যায়নি। ৬ জুলাই থেকে কোনো রকমে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়টি ১৯৭২ সালে স্থাপিত হয়। ১৩ জুনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিদ্যালয় ভবনটির নিচতলার নয়টি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে তিনটি কক্ষকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যালয় ভবন রক্ষা ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য গ্রামবাসী যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তা খুবই প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেন ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জগদীশ চাকমা।

রাঙামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনী আক্তার (অতিরিক্ত দায়িত্বে কাউখালী উপজেলা) প্রথম আলোকে বলেন, ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর বিষয়টি প্রশাসনকে বলেছে। পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই বিদ্যালয়কেও সহায়তা করা হবে।

১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে শুধু রাঙামাটিতেই প্রাণ হারান ১২০ জন, আহত হন অন্তত ৮৮ জন। হাজারো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। পাহাড়ধসের পর টানা আট দিন সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিল রাঙামাটি। এখনো চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে।