৭ থেকে ২২ গুণ বেশি অর্থ আদায়

ঢাকার সদরঘাট থেকে ৪২টি নৌপথে ২২১টি যাত্রীবাহী লঞ্চের চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট) রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৮০টি লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। যাত্রা শেষে মালিককে হিসাব (ওয়েবিল) দেন লঞ্চের ব্যবস্থাপক। এতে যাত্রীর সংখ্যা, আয় ও ব্যয় উল্লেখ থাকে।

বেশ কয়েকটি নৌপথের লঞ্চের ওয়েবিলে দেখা যায়, ঘাটগুলোতে নানা খাতে চাঁদা দিতে হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো লঞ্চমালিকই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। ঢাকা-পটুয়াখালী নৌপথে চলাচলকারী একটি লঞ্চের মালিক প্রথম আলোকে বলেন, যেসব ঘাটের বার্দিং ফি সরাসরি বিআইডব্লিউটিএর জনবল দিয়ে আদায় করা হয়, সেখানে অতিরিক্ত অর্থ নেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অন্য ঘাটগুলোতে ইজারাদারেরা নেন তাঁদের নিয়োগ করা লোকদের মাধ্যমে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ঘাটে ভেড়ে ঢাকা–পটুয়াখালী নৌপথের লঞ্চগুলো। ছোট ও মাঝারি আকারের এসব লঞ্চের যাত্রী ধারণক্ষমতা গড়ে ৯০০ জন। এ অনুযায়ী বার্দিং ফি হয় ২৩৪ টাকা। অথচ আদায় করা হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএর কর্মচারী নেন ২০০ টাকা। অর্থাৎ ৭ গুণের বেশি টাকা নেওয়া হয়।
অন্যদিকে পটুয়াখালী ঘাটে বার্দিং ফি নেওয়া হয় ৪৫০ টাকা। এর বাইরে বিআইডব্লিউটিএর বার্দিং সারেং ও পরিবহন পরিদর্শক নেন ৮০০ টাকা (টিআই–ট্রিপ)। ইজারাদারের লোকেরা আদায় করেন ৭০০ টাকা (বকশিশ)। ইজারাদারের নিয়োগ করা সুপারভাইজার ও লেবার সরদার ২ হাজার ৩০০ টাকা নেন।

এ ছাড়া ঘাটটিতে ক্যানভাসারকে (কলম্যান) ৮০০ টাকা দিতে হয়। এ হিসাবে একটা লঞ্চ থেকে আদায় করা হয় ৫ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২২ গুণ বেশি টাকা দেন লঞ্চমালিক।

এ ঘাটের ইজারাদার রায়হানুর রহমান পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির সদস্য। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘাটে বেশি টাকা নেওয়ার বিষয়ে কেউ কখনো অভিযোগ করেননি। ঘাট আমার নামে হলেও এটি জেলা আওয়ামী লীগের সাত–আটজন মিলে রেখেছি। ঘাটের সব আমাদের সংগঠনের (আওয়ামীপন্থী শ্রমিক ইউনিয়ন) শ্রমিকেরা করেন।’

ঢাকা-রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) নৌপথে চলাচলকারী একটি লঞ্চের মালিক বলেন, আগে কালাইয়া (পটুয়াখালী) ঘাটে তাঁর লঞ্চ ভিড়ত। বেশি চাঁদা দিতে হয় বলে আর ভেড়ানো হয় না। ঘাটটিতে কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকা বার্দিং ফি দিতে হয়। আরেকজন লঞ্চমালিক বলেন, ঢাকা–শরীয়তপুর নৌপথে একটি লঞ্চ মোট ৯টি ঘাটে ভেড়ে। সব ঘাটেই চাঁদা দিতে হয়।

চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল যাওয়া–আসায় সবচেয়ে ব্যবহৃত হয় ইলিশা–মজু চৌধুরীর হাট নৌপথ। ভোলার ইলিশা ঘাটে লঞ্চপ্রতি ৫ হাজার টাকা বার্দিং ফি নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক মালিক।

ঢাকা-বেতুয়া (ভোলার চরফ্যাশন) নৌপথের একটি লঞ্চের ওয়েবিলে দেখা যায়, লঞ্চটি ৭টি ঘাটে ভিড়েছিল। এর মধ্যে সদরঘাটে ১ হাজার ৫০০ টাকা, কালীগঞ্জে ২ হাজার টাকা, বিশ্বরোডে ১ হাজার ৪০০ টাকা, দৌলতখানে ১ হাজার টাকা, হাকিমউদ্দিনে ১ হাজার ৫০০ টাকা, তজুমদ্দিনে ৬০০ টাকা, মনপুরায় ৮০০ টাকা ও হাতিয়ায় ১ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি ঘাটেই ইজারাদারের নিয়োগ করা সুপারভাইজার ও লাইনম্যান আলাদা টাকা নিয়েছেন।

বেতুয়া ঘাট ইজারা নিয়েছেন চরফ্যাশন পৌরসভার মেয়র এস এম মোরশেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার নামে ঘাট নেওয়া হলেও এটি স্থানীয় দুই ইউপি চেয়ারম্যানকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।’ ইউপি চেয়ারম্যানদের নাম জানতে চাইলে তিনি তা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

বেশি টাকা আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক কাজী ওয়াকিল নওয়াজ বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যাত্রী ডেকে দেওয়ার নামেও নেওয়া হয় টাকা

সদরঘাটসহ বিভিন্ন নদীবন্দরে লঞ্চ ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে থেকে যাত্রীদের ডাকাডাকি করেন কিছু ব্যক্তি। তাঁদের ক্যানভাসার বা কলম্যান বলা হয়। অভিযোগ আছে, কলম্যানদের কারণে অনেক সময় যাত্রীরা নিজেদের পছন্দমতো লঞ্চে উঠতে পারেন না। নানাভাবে হয়রানির শিকার হন তাঁরা। এই কলম্যানদের টাকা দিতে হয় লঞ্চমালিকদের।

২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেন লঞ্চমালিকদের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার প্রেসিডেন্ট মাহবুব উদ্দিন আহমদ। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘সদরঘাট টার্মিনালে ইজারাদারেরা ক্যানভাসার (কলম্যান) নিযুক্ত করে যাত্রীদের টানাহেঁচড়া করে লঞ্চে ওঠান। তাঁরা এক লঞ্চের যাত্রীকে অন্য লঞ্চে উঠিয়ে দেন। টানাহেঁচড়ার কারণে যাত্রীরা জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলেন অনেকে।’ না চাইলেও মালিকদের প্রতিদিন লঞ্চপ্রতি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি।

চিঠিতে শুধু সদরঘাটের ব্যাপারে প্রতিকার চাওয়া হলেও দেশের সব প্রধান নদীবন্দরেই রয়েছে ক্যানভাসার। একাধিক লঞ্চমালিক জানান, বরিশাল ঘাটে কমপক্ষে ১ হাজার টাকা, পটুয়াখালী ঘাটে ৮০০ টাকা ও বেতুয়া (ভোলা) ঘাটে ৬০০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন সকালে নাশতা খাওয়ার নামে লঞ্চ থেকে টাকা নেন ক্যানভাসার ও তাঁদের নিয়ন্ত্রক লাইনম্যানরা।

সদরঘাটের কয়েকজন ক্যানভাসার জানান, এখানে ৯০ জনের মতো ক্যানভাসার আছেন। প্রতিদিন একটি লঞ্চ থেকে যে টাকা আদায় হয়, তা থেকে প্রত্যেকে পান ১০০ টাকা। দিনে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয় একজনের। তাঁদের সরদার রাজ্জাক ও মোতাহার লঞ্চ ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করেন।

এই ক্যানভাসাররা আরও জানান, তাঁদের সরদারদের নিয়ন্ত্রণ করেন কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. ইব্রাহিম হোসেন। টাকার ভাগ চলে যায় সদরঘাটসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পকেটে।

ইব্রাহিম হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্যানভাসাররা তো মালিকদের লোক।’ তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের ছোট ভাই শিপু আহমেদের সঙ্গে রাজনীতি করেন তিনি। তাঁর বিষয়ে তিনি শিপু আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

শিপু আহমেদ সদরঘাটের সাবেক ইজারাদার। তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ইব্রাহিম ক্যানভাসারদের চাঁদা তোলেন কি না, তা তাঁর জানা নেই।

ক্যানভাসারদের ব্যাপারে মালিক সংগঠনের দেওয়া চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএকে জানালে কী লাভ হবে? যাঁদের আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা আছে, তাঁদের জানাতে হবে।’

প্রতি যাত্রায় ‘টিআই–ট্রিপ’

গত ডিসেম্বরে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা-বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। লঞ্চটির যাত্রা শুরুর ঘোষণায় (ভয়েস ডিক্লারেশন) দেখা গেছে, যাত্রীসংখ্যা লেখা ৩১০। কিন্তু লঞ্চটিতে ৮ শতাধিক যাত্রী ছিল বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করে। পরে তদন্তেও বিষয়টি উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শকেরা ঘুষ নিয়ে যাত্রীসংখ্যা কম লিখে দেন। লঞ্চের ব্যবস্থাপকদের ওয়েবিলে পরিবহন পরিদর্শকদের দেওয়া এ ঘুষের নাম ‘টিআই-ট্রিপ’।

কয়েকটি লঞ্চের ওয়েবিলে দেখা গেছে, পরিবহন পরিদর্শকেরা সদরঘাটে লঞ্চভেদে ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা নেন। বরিশালে নেওয়া হয় ১ হাজার টাকা, পটুয়াখালীতে ৮০০ টাকা। এ ছাড়া যেসব নদীবন্দরে পরিবহন পরিদর্শকেরা দায়িত্ব পালন করেন, সব জায়গায়ই তাঁরা ‘টিআই–ট্রিপ’ নামে এই ঘুষ নেন বলে কিছু লঞ্চমালিক জানান।

এ ব্যাপারে জানতে সদরঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা যুগ্ম পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম রেজার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল ও প্রতিনিধি, পটুয়াখালী এবং প্রতিবেদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন