বলা হতে থাকে, আগের থেকে অনেক সাশ্রয়ী হবে এই নতুন ঘাট। দূরত্ব কমবে দুই কিলোমিটার, সময় বাঁচবে কমপক্ষে কুড়ি মিনিট, বাঁচবে জ্বালানি তেল। কেউ জানতে চাননি, নতুন ঘাট যখন এতই সাশ্রয়ী, তখন এত দিন কেন পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা লাগার ঝুঁকি নিয়ে খরুচে ঘাট দিয়ে ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা চালু রাখা হলো?

যুক্তি একটা আছে, সেটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। মাঝিরকান্দি থেকে শিমুলিয়ায় ফেরি চলাচলের পথে পদ্মা সেতুর কোনো পিলার পড়বে না ঠিকই, কিন্তু মাঝিরকান্দি ঘাটের সংযোগ সড়ক খুবই সরু। সড়কের কাজ করবে অন্য প্রতিষ্ঠান। সেটা সময়ের ব্যাপার।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জাজিরার সড়ক সরু ও ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। তাই নতুন ঘাট দিয়ে এখনই সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্ভব নয়। সড়ক প্রশস্ত হওয়ার পর সব যানবাহন পারাপারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নতুন ঘাট, নতুন চ্যানেল যতই সাশ্রয়ী হোক, ফেরিঘাট যে পাকাপাকিভাবে মাঝিরকান্দি যাচ্ছে না, সেটা প্রায় নিশ্চিত। বাংলাবাজার থেকে আপাতত কোনো পন্টুন বা কোনো সরঞ্জাম স্থানান্তর করা হচ্ছে না। সাময়িকভাবে নতুন একটি পন্টুন মাঝিরকান্দি ঘাটে বসানো হবে।

মাঝিরকান্দি আর বাংলাবাজার-রশি টানাটানিতে বাংলাবাজারের জয় কেউ কখনো ঠেকাতে পারেনি। এবার সেতুর পিলারে ধাক্কা লাগার ঝুঁকি বন্ধের অজুহাতে মাঝিরকান্দির দিকে পাল্লা একটু ঝুঁকেছে মাত্র। পিলারে ধাক্কা বন্ধের তাগিদে নতুন পথের সন্ধানে বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসির (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন) সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জরিপ বিভাগ থেকে সাত্তার মাদবর-মঙ্গল মাঝিরঘাট থেকে শিমুলিয়া নৌপথের জরিপ করে জানানো হয়, জাজিরার নাওডোবা পথে পদ্মা সেতুর চ্যানেল ধরে ভাটিতে ফেরিগুলো চলাচল করলে নাব্যতার কোনো অসুবিধা হবে না। এই চ্যানেল দিয়ে লৌহজং হয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ফেরি শিমুলিয়ায় যাতায়াত করতে পারবে।

default-image

সব পক্ষ রাজি থাকায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫০ ফুট প্রশস্ত ঘাট নির্মাণের কাজ শুরু করে দেওয়া হয়। বালুভর্তি জিও ব্যাগের (অপচনশীল বস্তা) ওপর বাঁশ, ইট ও বালু দিয়ে ঘাটটি নির্মাণের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। ঘাট নির্মাণের ঠিকাদার আবদুস সামাদ হাওলাদারের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলোর প্রতিনিধি এই রকম একটা ধারণা পেয়েছেন। তবে সংযোগ সড়ক তৈরি করতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কত ব্যয় হবে, সেটা জানা যায়নি। তাঁরা এখনো হিসাব করছেন। তবে অনুমান করা যায়, সব মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার ধাক্কা।

ঘাটের রাজনৈতিক অর্থনীতি

এখন থেকে মাস দশেক আগে পদ্মার ওপারের কাঁঠালবাড়ি ঘাট বাতিল করে বাংলাবাজারে নতুন ঘাট গড়ে তোলা হয়। তখন বলা হয়েছিল, দৈর্ঘ্য-প্রস্থে দেড় লাখ বর্গমিটারের এই নতুন ঘাট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। নাব্যতা ঠিক রেখে বাংলাবাজারে নতুন ঘাট চালু রাখার জন্য নদীতে তৈরি করা হয় ‘হাজরা’ নামে আরেকটি চ্যানেল।

তখন জানানো হয়েছিল, পদ্মা সেতুর নদীশাসনের অসমাপ্ত কাজ করার জন্যই নাকি এই নতুন রুট তৈরি করতে হয়েছে। এই কাজের ফলে নদীতীরের মাদারীপুরের মাদবরের চর থেকে কাঁঠালবাড়ি সাড়ে ১৩ কিলোমিটার এলাকার মানুষ ব্যাপক নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। একই ঘাট ১০ মাস সময়ের মধ্যে দুবার বদলের সিদ্ধান্তের পেছনে পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার কথা বলা হলেও দুটো দুই রকমের যুক্তি। প্রথম যুক্তি, নদীশাসনের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে পদ্মা সেতুর সুরক্ষার পদক্ষেপগুলো মজবুত করতে উজানে, মানে বাংলাবাজারে ঘাট স্থাপন। আবার বছর না ঘুরতেই পিলারে ধাক্কার ঝুঁকি শূন্য করার জন্য ভাটিতে অর্থাৎ মাঝিরকান্দি ঘাট নির্মাণ।

কোনো কোনো ঘাট বদলের সঙ্গে কারও কারও যে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে, তা সব সময়ই দৃশ্যমান। ঘাটকে ঘিরে বাজার, ইজারা, চাঁদাবাজি—কতশত বাণিজ্য। দলে টিকে থাকতে, টিকিট পেতে, টিকিট রাখতে ঘাটের কর্তৃত্ব বড়ই জরুরি।

বাংলাদেশে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ৩৪টি ফেরিঘাট চালু আছে। এগুলোর মধ্যে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজিরহাট, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ি, হরিণাঘাট (চাঁদপুর)-শরীয়তপুর, ভোলা-লক্ষ্মীপুর, লাহারহাট-ভেদুরিয়া এবং চরকালীপুর-কালীপুরবাজার গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটগুলোর মধ্যে অন্যতম।

সব ঘাটেই বর্ষার আগে ও পরে নদীর পানি বাড়া-কমার সঙ্গে তাল রেখে এবং ভাঙনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘাট সরানো-নড়ানোর তৎপরতা মোটামুটি সারা বছর ধরেই চলে। ফেরিঘাট দিয়ে চলাচলকারীরা লক্ষ করে থাকবেন, অনেক সময় সারা রাত ধরে কাজ চলে। বিশেষ করে নদীভাঙনের সময় ঘাট সরানোর এই কাজে শ্রমিকদের ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যুদ্ধ করে কাজ করতে হয়। শেষ মুহূর্তে এসব তাড়াহুড়ার কাজ কতটা টেকসই আর মানসম্পন্ন হয়, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) যখন নদীভাঙনের আগাম বার্তা দুই বছর আগে থেকে দিতে পারে, তখন কেন আমরা তাদের কাজে লাগাই না, কেন আমরা তাদের পূর্বাভাসকে আমলে নিয়ে আগে থেকে গুছিয়ে কাজ করি না, অপচয় রোধের পদক্ষেপের কথা ভাবি না?

কাহিল ফেরির কথা কি হারিয়ে গেল

স্রোতে তাল সামলাতে না পেরে একের পর এক ফেরি যখন সেতুর পিলারে গিয়ে মাথা কুটছিল, ফেরির ছাল চামড়া উঠে যাচ্ছিল, যাত্রীদের মাথা ফাটছিল, তখন আমরা নাশকতার গন্ধ খুঁজছিলাম, ফেরির কর্মীদের শাস্তি দিয়ে সমাধানের পথের দিশা দিচ্ছিলাম। পরে জানা যায় অন্য কথা। বেশির ভাগ ফেরি নাকি তামাদি হয়ে গেছে। বাতিল জয়িফ ফেরি দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে বছরের পর বছর।

default-image

বিআইডব্লিউটিসি যে ৫৩টি ফেরি চালায়, তার ৪৭টিরই হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। জীবনকাল পেরিয়ে গেছে ২০টির। এগুলোর মধ্যে পাঁচটির বয়স নাকি ৯৫ বছর। পদ্মা সেতুর পিলারে গত ২০ জুলাই যে রো রো ফেরি শাহ মখদুম ধাক্কা দেয়, সেটি তৈরি হয় ১৯৮৫ সালে। হালনাগাদ ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলছিল এত দিন। ১৯৮০ সালে থেকে চলাচলকারী ফেরি শাহজালাল ধাক্কা দেয় ২৩ জুলাই, এটিও মেয়াদোত্তীর্ণ জলযান। ৪০ বছরের বেশি পুরোনো শাহজালালের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ ছিল না। সেতুর পিলারে ধাক্কা দেওয়া ফেরি কাকলি তৈরি হয়েছে ১৯৭৪ সালে। এটিকে কোনোভাবেই আর নিবন্ধন বা ফিটনেস সনদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তার আগে ৯ আগস্ট ধাক্কা দেওয়া ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় গত ১৭ জুলাই।

মোদ্দা কথা, পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা দেওয়া চারটি ফেরির একটিরও ফিটনেস সনদ হালনাগাদ ছিল না। কোনো কোনোটির সনদ হালনাগাদ করার সর্বশেষ বয়স পার হয়ে গেছে অনেক আগেই।

‘কাকের মাংস কাকে খায় না’

ফেরির মালিক সরকারি প্রতিষ্ঠান। চালায়ও তারা। ফিটনেস দেখার দায়িত্বও অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের। রসুনের গোড়া এক জায়গায়, একই মন্ত্রণালয়ের ছাতের তলায় তারা সবাই। নৌযান পরিদর্শন, নিবন্ধন ও ফিটনেস দেখার কাজ করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির মুখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আইন অনুযায়ী কোনো নৌযান ফিটনেস সনদ না নিয়ে বা নিবন্ধন ছাড়া চলাচল করলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু ফেরির বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে তা করতে হবে সংস্থার প্রধান হিসেবে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। বিআইডব্লিউটিসি যেহেতু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই তাদের বিরুদ্ধে এত দিন মামলা করা হয়নি। তবে ফিটনেস নিয়ে নৌযান চালাতে সম্প্রতি চিঠি দেওয়া হয়েছে। আবার চিঠি দেওয়া হবে।’

চালকেরাও বেপরোয়া কিছিমের

মেয়াদোত্তীর্ণ জয়িফ ফেরি তাল সামলাতে না পারলে তার সামনে, পাশে, পেছনে যে থাকবে, সে সরে না গেলে ধাক্কা খাবেই। পিলারের সরার ক্ষমতা নেই, তাই সে ধাক্কা খায়। ফেরির ধাক্কা খেয়ে গর্জন করে না শুধু দুর্বল ‘গার্জেনদের’ ছোট নৌযানগুলো।

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার হোক বা পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হোক, ফেরির সঙ্গে হালকা-মাঝারি ধাক্কা খাওয়া নৌযান অনেক আছে। ফেরির চালকেরা এমন শক্ত ‘গার্জেনের’ পাল্লায় আগে পড়েননি, তাই তাঁরাও যে খুব হুঁশে ছিলেন, সেটা বলা যাবে না। এঁদের অনেকেরই বেতনের চেয়ে উপরি বেশি। চালু ঘাটের চালু ফেরিতে পদায়ন পেতে তাঁদের খরচ করতে হয়। তাই তাঁরাও একটু বেপরোয়া কিছিমের হয়ে থাকে।

default-image

এই জায়গায় একটু নজর দেওয়ার সঙ্গে সুকানি হওয়ার সনাতন প্রক্রিয়াটি বাতিলের সময় এসে গেছে। তোষণ-পোষণ ও স্বজনপ্রীতির বাইরে এসে একটা দক্ষ জনবলের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারলে পিলারের ধাক্কা খাওয়া বন্ধ হবে না।

পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে উজান থেকে ভাটিতে বা ভাটি থেকে উজানে সব ধরনের নৌযানের চলাচল কি চিরকালের জন্য বন্ধ রাখা যাবে? তাই ধাক্কার আশঙ্কা দূর করার জন্য সব নৌযানের ফিটনেস আর দক্ষ চালকের ব্যবস্থা পাক্কা করতে হবে।

গবেষণাকে আমলে নিতে হবে

ফেরি চলাচলকে কীভাবে আরও নিরাপদ করা যায়, তা নিয়ে প্রতিবছর একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফেরি সেফটি অ্যাসোসিয়েশন। এ বছর এই প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের একটি দল। দলে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রৌনক সাহা, পরমা রায় চৌধুরী, মোহাম্মদ আবরার উদ্দিন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. শরিফুল ইসলাম। ফেরি ব্যবস্থাপনা আর ফেরি তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এবং শিক্ষাগবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এলেম ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

জাপান থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই সেতুর পিলারে বা পন্টুনে নৌযানের ধাক্কা সামলানোর জন্য ভাসমান রাবার জ্যাকেটের ব্যবস্থা করা হয়। ঘাট সরিয়ে, সুকানির চাকরি খেয়ে পিলারের ধাক্কা লাগার ঝুঁকি বন্ধের চেয়ে এই ব্যবস্থা নিশ্চয়ই অনেক সাশ্রয়ী হতো। অবশ্য ‘বালিশ–কাণ্ডের’ দেশে কোনো কিছু হলফ করে বলা মুশকিল।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন