চলে গেলেন কাশেম মোল্লা

চলে গেলেন কিংবদন্তিতুল্য কাশেম মোল্লা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তাঁর রেডিওতে বেজে উঠত বিবিসির সংবাদ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নানা অনুষ্ঠান। সেই রেডিওটি অনেক আগেই থেমে গিয়েছিল। গতকাল শুক্রবার থেমে গেলেন তিনি নিজেই। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ মানুষটি পেলেন না মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামের সেই চা-বিক্রেতা আবুল কাশেম মোল্লা রোগশোকে ভুগে গতকাল ভোর চারটায় ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাদ জুমা জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ পাকশীর রূপপুর রেলওয়ে কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গান ও খবর শোনার জন্য ১৯৬৯ সালে কাশেম মোল্লা তাঁর ভাই চাঁদ আলীকে দিয়ে ঈশ্বরদী শহর থেকে তিন ব্যান্ডের একটি ফিলিপস রেডিও কিনে আনেন। আশপাশের গ্রামে তখন তিন ব্যান্ডের কোনো রেডিও ছিল না। গ্রামবাসী কাশেম মোল্লার বাড়িতে আসতেন রেডিও শুনতে। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ স্থানীয় মানুষ এই রেডিও থেকেই শোনে। মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয় কাশেম মোল্লার রেডিও শুনে।
২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ওপর শুরু করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সে সময় সুদূর লন্ডন থেকে সম্প্রচারিত বিবিসির সংবাদ শোনার জন্য পাকশী ও রূপপুরের মুক্তিকামী মানুষ ভিড় জমাতে থাকে তাঁর বাড়িতে। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠায় গ্রামবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধে কাশেম মোল্লা রেডিওটি বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন রূপপুরে তাঁর ছোট্ট একটি চায়ের দোকানে। এখানে ছিল একটি কড়ইগাছ। সেই গাছের নিচে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করতেন বিবিসির সংবাদ শোনার জন্য। আতঙ্কিত মানুষ চুপিচুপি সকাল ও সন্ধ্যায় এই রেডিও থেকে শুনত বিবিসির প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, কবিতা, রম্য রচনা ইত্যাদি। মূলত বিবিসির সংবাদকে ঘিরে ওই এলাকার নাম হয়ে যায় কাশেম মোল্লার বিবিসি বাজার। কাশেম মোল্লা ও সেই রেডিওটি হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নিদর্শন ও প্রেরণার উৎস।
গত ১১ ডিসেম্বর রূপপুরের গ্রামের বাড়িতে কথা হয়েছিল কাশেম মোল্লার সঙ্গে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বিবিসির সংবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের অনুষ্ঠান তাঁর রেডিওতে প্রচার না করার জন্য স্থানীয় রাজাকারের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। ভেঙে দেওয়া হয় তাঁর ডান পা। তখন থেকে তিনি পঙ্গু জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে সামান্য সরকারি সহায়তা পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চিকিৎসার জন্য ৩০ হাজার এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন।
কাশেম মোল্লার ছোট ভাই আবুল কালাম আজাদ বলেন, সেই রেডিও এখনো যত্ন করে রাখা আছে কাশেম মোল্লার আলমারিতে। সেটি নষ্ট হয়ে গেছে ২০ বছর আগে। কিন্তু সরকারিভাবে সেই রেডিও সংরক্ষণ করা হয়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ঈশ্বরদী উপজেলা কমান্ডার আবদুর রাজ্জাক বলেন, কাশেম মোল্লার নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে এখনো নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।