বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজরদারির জন্য বিটিআরসির নিজস্ব সেল রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নজরদারি করে। বিটিআরসির সঙ্গে তাদের সমন্বয়ও আছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো কোনো একটি ভিডিও বা পোস্ট সব জায়গায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর সরকারি সংস্থাগুলো জানতে পারছে। এরপর তারা যোগাযোগ করছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ অন্য মাধ্যমগুলোর সঙ্গে। এই মাধ্যমগুলো স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু করছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেটা (ফেসবুক) মুখপাত্র ই-মেইল বার্তায় প্রথম আলোকে বলেন, জরুরি পরিস্থিতি যেমন আত্মহত্যা বা অন্যান্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মেটার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে।
ফেসবুক আরও জানিয়েছে, ‘আমাদের একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া আছে। যখনই সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে আমরা কোনো অনুরোধ পাই, সেই প্রক্রিয়া অনুযায়ী কাজ করে থাকি। অন্য যেকোনো দেশের অনুরোধ যেভাবে নিষ্পত্তি করা হয়, একইভাবে বাংলাদেশেরটিও করা হয়ে থাকে।’

সিএনএন ‘ফেসবুক হ্যাজ ল্যাঙ্গুয়েজ ব্লাইন্ড স্পটস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দ্যাট অ্যালাউ হেট স্পিচ টু ফ্লারিশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ নথিপত্রকে উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, ফেসবুক বাংলা পড়তে জানে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, যতটুকু তথ্য ফেসবুকসহ অন্য মাধ্যমগুলো দিচ্ছে ততটুকু যথেষ্ট নয়। আবার এ অভিযোগও আছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যত অনুরোধ পাঠায়, তার একটা বড় অংশ সরকারের সমালোচনাকারীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে।

গুজব ও ধর্মীয় সহিংসতা ছড়াতে ব্যবহার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

আইটি ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেনের শিক্ষক লিওন ডারশিনস্কি গুজবের চারটি প্রকার ভেদের কথা বলেছেন। এগুলো হলো, স্পেকুলেশন বা ফটকাবাজি, কন্ট্রাভার্সি যা বিতর্ক ও সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে, মিস ইনফরমেশন বা না জেনে কোনো তথ্য, মিথ্যা ডাটা প্রকাশ করা এবং ডিজইনফরমেশন বা কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে বাংলাদেশে সব ধরনের গুজব ছড়াতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার হচ্ছে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জালিয়াতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র‌্যাব ও থানা-পুলিশ। সিআইডির একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সম্মিলিতভাবে সব কটি প্রতিষ্ঠান যত মোটরসাইকেল বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নিয়েছিল, তাতে করে রাস্তায় মোটরসাইকেল ছাড়া আর কোনো যানবাহন চলতে পারত না।

অনুসন্ধানে পুলিশ দেখেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ওই সংখ্যক মোটরসাইকেল ছিল না। তারপরও তারা ‘সাইক্লোন অফার’, ‘ধামাকা অফার’ এমন হাজারো নাম দিয়ে ফেসবুকে পণ্য কেনায় আগ্রহী করেছে সাধারণ মানুষকে। মানুষ সেই ফাঁদে পা-ও দিয়েছে।

সিআইডি ও সিটিটিসি সূত্র বলছে, যেকোনো ধরনের গুজবের মধ্যে ধর্মীয় ইস্যুতে গুজব দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে ফয়েজ উদ্দীন নামে এক ব্যক্তি প্রথম ফেসবুক লাইভে আসেন। ওই লাইভ থেকেই গুজবের ডালপালা নানান দিকে ছড়াতে শুরু করে। মণ্ডপের দিকে লাঠিসোঁটা নিয়ে উত্তেজিত মানুষ এগোচ্ছেন, এমন একটি জটলার ভিডিওতে একজনকে একাধিকবার বলতে শোনা যায়, ‘লাইভ করে দাও,’ ‘লাইভ করে দাও’।

আবার পল্লবীতে সন্তানের সামনে সাহিনউদ্দীনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাকে নোয়াখালীতে যতন সাহা হত্যার ভিডিও বলে প্রচারের ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে রতন শীল ও ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষক রুমা সরকারকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মো. সাঈদ আল জামান ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাহবুবা আকবর ‘সোশ্যাল মিডিয়া রিউমার্স ইন বাংলাদেশ’ নামে গবেষণা করেছেন।

ওই গবেষণায় তাঁরা দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ধর্ম, অপরাধ, মানবাধিকার এবং বিনোদন এই সাতটি খাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক গুজব বেশি চলে। তবে ‘ধর্ম’ ইস্যুতে গুজব ছড়ানোর ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে। ২০১৭ সালে প্রচারিত গুজবের ৫ শতাংশ ছিল ধর্মীয়, ২০২০ সালে এই হার ৪০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়।

৮২ শতাংশ উগ্রবাদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। সিটিটিসির সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধবিষয়ক একটি নথিতে দেখা যায়, ২০১৬ সালের তুলনায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম ২০১৯ সাল নাগাদ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কিন্তু উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার হার এই সময়ে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উদ্বুদ্ধ করার একটি বড় ক্ষেত্র। এখানে সক্রিয় আছে ৮২ শতাংশ উগ্রবাদী। ২০১৬ সালে উগ্রবাদীদের মঞ্চ দাওয়ালিল্লাহ ফোরামে সদস্য সংখ্যা ছিল সাড়ে ৫০০, তিন বছর পর এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩ হাজারে।

সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, করোনাকালে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুঠোফোন ব্যবহারের হার বেড়েছে। তাদের ঝুঁকিও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, অনলাইনে নজরদারির সময় সিটিটিসি সম্প্রতি এক কিশোরকে শনাক্ত করে।

করোনাকালে এই কিশোর উগ্রবাদে দীক্ষিত হয়, বাবা-মায়ের অগোচরেই। সিটিটিসি খুঁজছে এমন এক জঙ্গিকে, সে অনুসরণ করছিল। পেশায় কাপড় ব্যবসায়ী বাবা এখন নিয়মিত কিশোরকে নিয়ে সিটিটিসিতে আসছেন। কর্মকর্তারা তাকে উগ্রবাদ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিসের উপকমিশনার মিশুক চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উগ্রবাদের চর্চা করছেন। গোয়েন্দা নজরদারিতে তাঁরা দেখছেন, দেশের বাইরে থেকে কোনো কোনো পেজ চালানো হচ্ছে এবং এই পেজের এ দেশীয় অনুসারীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

শিশু পর্নোগ্রাফিবিষয়ক আধারের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখের বেশি

শিশু পর্নোগ্রাফি প্রতিরোধে অলাভজনক মার্কিন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) শিশুদের দিয়ে যৌনদৃশ্যে কাজ করানো, তাদের যৌন নিপীড়নের ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং তা আদান-প্রদানের ওপর নজরদারি করে। এ ধরনের কোনো ঘটনা চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশকে অবহিত করে তারা।

গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে সিআইডি এই প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এনসিএমইসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আইপি অ্যাড্রেস (ইন্টারনেট প্রোটোকল-আইপি-কম্পিউটার বা মুঠোফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে হলে যে পরিচিতি নম্বর বা ঠিকানা লাগে) ব্যবহার করে শিশুদের যৌন হয়রানিবিষয়ক আধার আদান–প্রদান হয়েছে প্রায় আট লাখ।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মাহমুদুল ইসলাম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত শিশু পর্নোগ্রাফিবিষয়ক আধার নিজেদের সংরক্ষণে রাখা বা আদান–প্রদানের সংখ্যা ছিল সাত লাখ ৮৭ হাজার ৮১০টি।

এর মধ্যে ফেসবুকের আধার ৭ লাখ ৭৫ হাজার ৯৬৭টি, গুগল থেকে ৪ হাজার ৮০৭টি, ইনস্টাগ্রাম থেকে ১ হাজার ৬৪৭টি, টিকটকে ৮৯৯টি, হোয়াটসঅ্যাপে ১ হাজার ৫০২টি ও মাইক্রোসফটে ১৬৩টি।

সবশেষ ৩ নভেম্বর সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ বোরহান উদ্দিন ওরফে তানজিম নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। সহকারী পুলিশ কমিশনার সুরঞ্জনা সাহা বলেন, বোরহান আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি গ্রুপে যুক্ত হয়ে দেশি–বিদেশি নারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। মাস কয়েক আগে একই অভিযোগে নামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও তিন তরুণ গ্রেপ্তার হন।

নারী-শিশু পাচার

ফেসবুকের সাবেক কর্মী ফ্রান্সিস হাউগেন প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু নথি ফাঁস করেছেন সম্প্রতি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ইনস্টাগ্রাম কীভাবে কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যায় উসকে দেয়, তা নিয়ে ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ নথিভিত্তিক প্রতিবেদন ছিল এর একটি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সংবাদমাধ্যম একাধারে এই নথিগুলোর ওপর কাজ করতে শুরু করে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ফেসবুক ২০১৮ সাল থেকে জানে এই মাধ্যমটি পাচারকারীরা ব্যবহার করছে। পরের বছর অ্যাপল ফেসবুককে তাদের স্টোর থেকে ‘ফেসবুক’ও এর নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য অ্যাপগুলো সরিয়ে ফেলার হুমকি দেয়। সে বছরই বিবিসি কীভাবে সামাজিক এই মাধ্যমটি পাচারে ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই সময় ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার আধার সরিয়ে নেওয়া হয়।

সিএনএন ওই প্রতিবেদনে ইনস্টাগ্রামের একটি ছবি যুক্ত করেছে। ওই ছবিতে একজন নারী গৃহকর্মীকে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল।

পাচারের ঘটনায় ফেসবুকের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে কতটা, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার মাস কয়েক আগে টিকটক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে। টিকটকে অভিনেতা-অভিনেত্রী বানানোর টোপ দিয়ে ভারতে পাচার ও যৌনপল্লিতে বিক্রির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক কামরুল আহসান ওই সময় প্রথম আলোকে বলেন, টিকটক বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে একজন রোহিঙ্গা কিশোরী পাচারের ঘটনা খুঁজতে গিয়ে তাঁরা অনলাইনে যৌন ব্যবসার বেশ বড় একটা চক্র আবিষ্কার করেন। মোটামুটি প্রকাশ্যেই এই গ্রুপগুলো চলছে। এসব গ্রুপেও কিশোর-কিশোরীরা যুক্ত হচ্ছে। তারপর তাদের ভাগ্যে কি ঘটছে, সেটা অনেক সময়ই আর জানা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন