বিজ্ঞাপন
করোনাকালে দারিদ্র্য বেড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম চড়া। এমন সময়ে সরকারের কাছে পর্যাপ্ত চাল নেই

সাধারণত বাজারে চালের দাম বেড়ে গেলে সরকার খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচি বাড়িয়ে দেয়। এতে একদিকে যেমন বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশ কম দামে চাল কিনতে পারে। কিন্তু এবার ‘লকডাউনে’ সরকারের কর্মসূচি একেবারেই সীমিত। খাদ্য অধিদপ্তর গত সপ্তাহে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তারা দেশের ৭১৫টি বিক্রয়কেন্দ্রে ৭৩৩ টন করে চাল বিক্রি করছে।

গত বছর মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সচ্ছল মানুষেরা বাড়তি পরিমাণে কিনে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এরপর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাত, প্রলম্বিত বন্যা—সব মিলিয়ে বছরজুড়েই চালের বাজার ছিল চড়া। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০২০ সালে ঢাকায় মোটা চালের গড় দাম ছিল ৪৮ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। বাজারে দাম বেশি থাকায় সরকার গত বোরো মৌসুমে লক্ষ্য অনুযায়ী চাল কিনতে পারেনি। আবার আমনেও সাড়ে ৮ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে কেনা গেছে মাত্র ৮৩ হাজার টন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, লকডাউন ও করোনার কারণে পেশা হারিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এক বছরে চালের মজুত ১১ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ১৫ লাখ টন করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে মজুত কেন ৩ লাখ টনে নামিয়ে আনা হলো, তার জবাব খাদ্য মন্ত্রণালয়কে দিতে হবে। তিনি বলেন, ভারত থেকে চাল আমদানি করতে গিয়ে এর আগেও বাংলাদেশ বিপদে পড়েছে। দেশটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নির্বাচনসহ নানা কারণে সংকটকালে চাল ও পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এবার করোনার টিকা রপ্তানি নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের উচিত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া।

আমদানিতেও ব্যর্থতা

খাদ্য মন্ত্রণালয় ঘাটতি সামাল দিতে গত জানুয়ারি মাসে ২০ লাখ টন চাল আমদানির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারিভাবে মাত্র ২ লাখ ৫৯ হাজার টন ও বেসরকারিভাবে সাড়ে ৬ লাখ টনের মতো চাল আমদানি হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল আমদানির জন্য ৩২০টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছিল। বেশির ভাগই যথাসময়ে আমদানি করতে পারেনি।

সবচেয়ে বেশি চাল আমদানির অনুমতি পাওয়া ব্যবসায়ীদের একজন সাতক্ষীরার চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, শর্ত অনুযায়ী চাল আনতে হবে চলতি মাসের মধ্যে। কিন্তু ট্রাকের সংকট, স্থলবন্দরে জট ইত্যাদি কারণে সময় বেশি লাগছে। তিনি বলেন, বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এখন ২৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে চাল আনলে লোকসান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমদানির অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানের একটা বড় অংশ নিয়মিত আমদানিকারক নয়। তারা মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাল ব্যবসায়ী। ফলে প্রথম দফায় চাল এনে তারা তেমন একটা লাভ করতে না পারায় অনেকেই দ্বিতীয় দফায় আমদানিতে যাননি। নওগাঁর চাল ব্যবসায়ী ও আমদানির অনুমতি পাওয়া নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আমদানির চাল এনে বিক্রি করা কঠিন। তাই ২০ হাজার টনের অনুমতি পেয়ে তিনি ১০ হাজার টন আমদানি করেছেন।

মজুত নিয়ে দুই মন্ত্রীর প্রশ্ন

হাওরে নতুন বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার বোরো চাল সংগ্রহ ও দাম নির্ধারণ করতে খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। খাদ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ওই সভায় ছয়জন মন্ত্রী অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক চালের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তাঁরা মজুত এত কম কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, বন্যায় গত বছর ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে উৎপাদন কম হয় এবং চালের দাম বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত চাল আমদানির অনুমতি দেওয়ার পরও কেন তা কার্যকর করতে ছয় মাস সময় লাগল। তিনি বলেন, সরকারি গুদামে কমপক্ষে ১০ লাখ টনের মজুত থাকা উচিত ছিল।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার মন্ত্রীদের প্রশ্নের বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছি। তাঁরা সন্তুষ্ট হয়েছেন।’ তিনি বলেন, ভারত থেকে সরকারিভাবে যে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত চলে আসবে। সংকট থাকবে না।

কমিটির সভায় কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪০ টাকা, আতপ চাল ৩৯ টাকা ও ধান ২৭ টাকা কেজি দরে সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এই সংগ্রহ মূল্যের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলা হয়, গত বছর বোরোতে ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছিল। এ বছর এক লাফে চার টাকা বাড়িয়ে দিলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো, মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ মনে করেন, সরকার ৪০ টাকা কেজি দরে চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিলে লক্ষ্যমাত্রা অনেকাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে।

খোলাবাজারে বিক্রি বাড়ানোর পরামর্শ

করোনাকালে মানুষের আয় কমেছে। বেড়েছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। সরকারি উদ্যোগে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির দোকানে সীমিত আয়ের মানুষের ভিড় হচ্ছে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) গত সপ্তাহে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে উঠে আসে গত মার্চে দেশে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ। এটা করোনার আগে দেশে মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ দারিদ্র্যের বাইরে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নতুন এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি বাস করে শহরে। যাদের জন্য দেশের প্রধান শহরগুলোতে দ্রুত ট্রাকে করে সরকারি চাল বিক্রি বাড়াতে হবে। তিনি মনে করেন, চালের মজুত দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি দরিদ্রদের নগদ অর্থসহায়তা দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন