চিকিৎসকদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি

বিজ্ঞাপন
default-image

দেশে করোনায় চিকিৎসকদের মধ্যে মৃত্যুহার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মধ্যে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। মহামারি মোকাবিলায় সামনের সারির বিভিন্ন পেশার আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭২৫ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৫৫ জন। মৃত্যুহার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ হার জাতীয় হারের চেয়ে অনেক বেশি। দেশে গতকাল পর্যন্ত ১ লাখ ৬২ হাজার ৪১৭ জন আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে মারা গেছেন ২ হাজার ৫২ জন। মৃত্যুহার ১ দশমিক ২৬।

পেশাজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। আক্রান্তের তুলনায় পুলিশ সদস্যদের মৃত্যু হার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। এসব পেশাজীবী কেন বেশি হারে আক্রান্ত হচ্ছেন বা কেন মারা যাচ্ছেন, তার মূল্যায়ন হওয়া দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী কেন আক্রান্ত হচ্ছেন, কেন মারা যাচ্ছেন, তার মূল্যায়ন হওয়া দরকার। পাশাপাশি সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে পেশাজীবী সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব অনেক।’

করোনা আক্রান্তের পেশাভিত্তিক বিভাজনের কোনো তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করে না। তবে হিসাব রাখার জন্য বিভিন্ন পেশার ও সংগঠনের নিজস্ব কিছু উদ্যোগ আছে। চিকিৎসক, গণমাধ্যমকর্মী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও নার্সদের সংগঠন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকের মৃত্যু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার ওপর মহামারির শুরু থেকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সংস্থাটি বলেছে, তাঁরা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত না থাকলে অন্য সবার সুরক্ষা ঝুঁকিতে পড়বে।

চিকিৎসকদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসকেরা মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেন। অথচ তাঁদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি। গতকাল পর্যন্ত করোনায় ৫৫ জন মারা গেছেন এবং করোনা উপসর্গে মারা গেছেন আরও ৭ জন। মোট ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিএমএর মহাসচিব মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মৃত্যুবরণ করা প্রত্যেক চিকিৎসকের তথ্য পর্যালোচনা করছি। এ পর্যন্ত যা পেয়েছি তার ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ করেছি। সারা দেশের বিএমএর সব শাখা চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তার জন্য কাজ করছে।’

বিএমএ বলছে, ৬২ জনের মধ্যে ৪০ জনের বয়স ছিল ৬০ বছর বা তার বেশি। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ চিকিৎসকের বয়স ছিল বেশি। তাঁদের প্রায় সবারই অন্য কোনো রোগ ছিল। তাঁরা নিজেদের চেম্বারে বা বাসায় রোগী দেখার সময় সংক্রমিত হয়েছেন। ধারণা করা হয়, তাঁদের কেউ কেউ হয়তো যথেষ্ট সুরক্ষা না নিয়েই রোগী দেখেছেন।

বাকি ২২ জনের মধ্যে তিন–চারজন চিকিৎসক হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন। পাঁচ–ছয়জন চিকিৎসক ছিলেন অবেদনবিদ। তাঁরা দায়িত্ব পালন করেছিলেন আইসিইউতে। দুজন চিকিৎসক হাসপাতালে বা নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখেননি। তাঁরা সংক্রমিত হয়েছিলেন নিজস্ব আবাসিক এলাকায় রোগী দেখার কারণে।

বিএমএর মহাসচিব বলেন, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা যেন যথাযথ সুরক্ষা নিয়ে রোগী দেখেন, সে বিষয়ে বিএমএর শাখাগুলোর মাধ্যমে সতর্ক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক চিকিৎসকের ছেলে, ছেলের স্ত্রী বা মেয়ে ও মেয়ের স্বামী চিকিৎসক। এসব তরুণ চিকিৎসককে বলা হয়েছে তাঁরা যেন পরিবারের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের ওপর বিশেষ নজর রাখেন।

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও নার্স

করোনার নমুনা সংগ্রহ, নমুনা পরীক্ষা এবং করোনা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে দায়িত্ব পালন করেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলমাস আলী খান বলেন, ‘টেকনোলজিস্টরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁরা আক্রান্তও হচ্ছেন, মারাও যাচ্ছেন।’

অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন চারজন।

এদিকে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসিয়েশনের সভাপতি ইসমত আরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নার্সরা সারা দেশে কোভিড ও নন-কোভিড হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। কিছু ক্ষেত্রে নার্সরা কোভিড হাসপাতালে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা পান না।’

ইসমত আরার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭২৪ জন নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালের নার্স ১ হাজার ৪৪২ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালের নার্স ২৮২ জন। এ পর্যন্ত নার্স মারা গেছেন ৭ জন, এর মধ্যে ৪ জন নারী ও ৩ জন পুরুষ। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।

গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, দুই মাসের বেশি আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিস্থিতি জানার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতি জানানোর জন্য রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এ নিয়ে কাজ করছে। তবে সেই গবেষণা বা জরিপকাজ কবে শেষ হবে, তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। আইইডিসিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, কাজ চলমান আছে।

পুলিশ আক্রান্ত বেশি

অন্যান্য পেশাজীবীর চেয়ে পুলিশের মধ্যে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। গতকাল পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৩১ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, পুলিশের কাজের ধরনের কারণে সদস্যরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদের রাস্তাঘাটে, জনবহুল স্থানে, জেলখানায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাঁরা এক স্থানে অনেক সদস্য বসবাস করেন। তাঁরা অনেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে গাড়িতে চড়ে দায়িত্ব পালন করেন।

আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৪ জন মারা গেছেন। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। মৃত্যুহার কম হওয়ার একটি কারণ হয়তো এই যে পুলিশ সদস্যদের বয়স তুলনামূলক কম।

ইতিমধ্যে সংক্রমণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে পুলিশ সদস্যদের জন্য এসওপি বা মানসম্মত কার্যপ্রণালিবিধি তৈরি করা হয়েছে। এই এসওপি সারা দেশে বিতরণ করা হয়েছে। এসওপি নিয়ে প্রশিক্ষণও হয়েছে।

এ ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বা সুরক্ষার জন্য আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে আছে হেঁটে দায়িত্ব পালন কমানো, গাড়ির ভেতর দূরত্ব রেখে বসার ব্যবস্থা, দায়িত্ব পালনের সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং বসবাসের স্থানে জনঘনত্ব কমানো। সোহেল রানা বলেন, জেলা পর্যায়ের পুলিশ হাসপাতালগুলোতে সেবার মান বাড়ানো হয়েছে, রাজধানীর কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি বেসরকারি হাসপাতালকে পুলিশের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র বলছে, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) বা কোয়ারেন্টিনের (সঙ্গনিরোধ) জন্য ১১টি হোটেল ভাড়া করা হয়েছে।

গণমাধ্যমকর্মীদের ঝুঁকি

করোনা পরিস্থিতির বিষয় দেশবাসীকে জানানোর জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা শুরু থেকেই কাজ করছেন। গণমাধ্যমকর্মীরা বিমানবন্দর, কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র, হাসপাতাল, পরীক্ষাকেন্দ্র—এসব জায়গায় নিয়মিত ঘোরাঘুরি করেন। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

গণমাধ্যমকর্মীদের ফেসবুকভিত্তিক উদ্যোগ‘আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের অধিকার’ শুরু থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের সংক্রমণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। তাদেরহিসাবে গতকাল পর্যন্ত ৫৩৬ জন গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত ছিলেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১১ জন। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ২ দশমিক শূন্য শতাংশ। এ ছাড়া আরও ৮ জন গণমাধ্যমকর্মী করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পরীক্ষা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেছে জাতীয় প্রেসক্লাব।’ তিনি বলেন, অনেক পেশাজীবী পৃথক হাসপাতাল বা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। সাংবাদিকদের জন্য এ রকম সুবিধা থাকা উচিত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন