default-image

নাদিয়া সিদ্দিকা অনির মাথায় ১৬ ইঞ্চি লম্বা চুল ছিল। ভাবছিলেন, চুল কেটে ছোট করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেখা একটি পোস্টে বদলে যায় তাঁর ভাবনা। পোস্টে দেখেন, কেমোথেরাপিতে ক্যানসারে আক্রান্ত যেসব নারীর চুল পড়ে গেছে, তাঁদের জন্য পরচুলা (উইগ) বানাতে চুল দান করা যায়।

নাদিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। খোঁজখবর করতে থাকেন কীভাবে মাথার চুল দান করতে পারেন। ফেসবুকেই একটি গ্রুপের সন্ধান পান, যাঁরা এ চুল সংগ্রহ করার কাজটি করছেন। নাদিয়া জানতে পারেন, কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ ইঞ্চি লম্বা চুল দান করলে তা দিয়ে পরচুলা বানানোর কাজটি সহজ হয়। তাই নাদিয়া একদম গোড়া থেকে চুল কেটে ফেলেন। চুলের এ ছাঁট ভালো না লাগায় পরে পুরো মাথা ন্যাড়া করে ফেলেন তিনি।

সম্প্রতি নাদিয়া ফেসবুকে হাসিমুখে তাঁর ন্যাড়া মাথার ছবি দিয়েছেন। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু নাদিয়া নন, এ পর্যন্ত তিন নারী বাংলাদেশ হেয়ার ডোনেশন ফেসবুক পেজে ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের জন্য চুল দান করেছেন। অন্যরা অবশ্য নাদিয়ার মতো পুরো মাথা ন্যাড়া করেননি। আরও ২০ জন চুল দানের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

মাত্র কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ হেয়ার ডোনেশন পেজটি চালু করেন পার্থ অধিকারী, সীমান্ত মিত্র, প্রিয়াতা সাহা, রাজু মাতুব্বর ও অপরাজিতা মণ্ডল। পাঁচজনই শিক্ষার্থী। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছে তাঁদের এ উদ্যোগ।

default-image

টেলিফোনে কথা হয় পার্থ অধিকারী ও সীমান্ত মিত্রের সঙ্গে। খুলনার সীমান্ত মিত্র জানালেন, তাঁরাও ফেসবুকের মাধ্যমেই এভাবে চুল দান করার বিষয়টি জেনেছিলেন। সমমনা কয়েকজন মিলে নতুন ধরনের উদ্যোগটি নেন। এর মধ্যেই বেশ ভালো সাড়া পেয়েছেন। তিন নারী নিজেদের চুল কেটে কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরচুলা বানায় এ রকম কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেজের পক্ষ থেকে যোগাযোগও হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

নাদিয়া সিদ্দিকা সাভারে থাকেন। তিনি এখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। উদ্যোক্তা হিসেবে অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। তিনি বললেন, পছন্দ করে তাঁদের বিয়ে হয়েছে। ব্যবসায়ী স্বামী সাদাত উল্লাহ কাউসার বা পরিবারের অন্যদের চুল কেটে দান করার বিষয়ে আপত্তি নেই। নিজের মা–বাবাকেও বিষয়টি বলেছেন তিনি। নিজেদের পরিবারে কোনো ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী নেই। তবে ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপির পর চুল পড়ে যায় এবং এতে অনেক নারীই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। এই নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই উদ্যোগটি নিয়েছেন।

নাদিয়া সিদ্দিকা জানান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চুল দান করার কাজ করে। দেশে এ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করে তা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। পরে ফেসবুকে বাংলাদেশ হেয়ার ডোনেশন পেজটির সন্ধান পান তিনি। এ উদ্যোগও নতুন। চুল দান করার সিদ্ধান্ত যেহেতু নিয়েই ফেলেছেন, তাই পেজের অ্যাডমিনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কুরিয়ারে চুল পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। ফেসবুকে তাঁর পোস্ট দেখে অনেকেই এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

default-image

নাদিয়ার স্বামী সাদাত উল্লাহ কাউসার বললেন, ‘আমার স্ত্রী তাঁর চুল দান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সব শুনে আমারও মনে হয়েছে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। আর আমার স্ত্রী তাঁর চুল কাটবেন কি কাটবেন না, তা তো তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত, সেখানে আমার বাধা দেওয়ার তো কিছু নেই।’

বাংলাদেশ হেয়ার ডোনেশন পেজের উদ্যোক্তা সীমান্ত মিত্র বললেন, ‘নাদিয়া সিদ্দিকা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আমরা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানিয়েছি। আমাদের উদ্যোগটি যেহেতু নতুন, তাই বিশ্বস্ততার প্রসঙ্গটি আসতেই পারে। আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, যাতে উদ্যোগটি নিয়ে হোঁচট খেতে না হয়। তাই আমরাও তড়িঘড়ি করছি না। রাজধানীর উত্তরায় পরচুলা বানিয়ে বিদেশে রপ্তানি করেন ব্যবসায়ী মিলন মাহমুদ। তাঁর সঙ্গে আমাদের কথা এগোচ্ছে। সব ঠিক হলে পেজে ঘোষণা দিয়েই চুল সংগ্রহ শুরু করব।’

কথা হলো পরচুলা ব্যবসায়ী মিলন মাহমুদের সঙ্গে। তিনি পাঁচ বছর ধরে বিভিন্নজনের কাছ থেকে চুল (আঁচড়ানোর পর যে চুল পড়ে বা পারলারে কেটে ফেলা চুল) সংগ্রহ করে পরচুলা বানানোর কাজ করছেন। তিনি জানান, চুল লম্বা হলে ভালো পরচুলা বানানো যায়। একেকটি পরচুলায় চুলের ঘনত্ব অনুযায়ী ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম চুল প্রয়োজন হয়। চুলের গুণগতমান, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর ভিত্তিতে পরচুলার দাম নির্ধারণ করা হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

মিলন মাহমুদ বললেন, ‘ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের জন্য পরচুলা বানাতে চান জানিয়ে কয়েকজন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আমার প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তবে তাঁরা যে উদ্যোগের কথা বলেছেন, তা অবশ্যই একটি মহৎ উদ্যোগ। সব দিক মিলে গেলে আমি হয়তো কোনো লাভ না রেখে পরচুলা বানানোর কাজটি করে দেব।’

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যানসার রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপির সময় স্বল্পসংখ্যক ওষুধে চুল পড়ে যায়। কেমোথেরাপি শেষ হলে শতভাগ ক্ষেত্রেই চুল গজায়। অনেকের এ সময় আগের চেয়েও ঘন চুল ঘন হয়। তবে কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং যে নারীরা চুল দান করছেন, তাঁদের মানবিক উদ্যোগকে অবশ্যই আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি।’

চিকিৎসক হাবিবুল্লাহ তালুকদারের মতে, জীবনে চুল খুব বড় বিষয় নয়। ক্যানসার রোগীদের কাউন্সেলিং জরুরি। রোগীদের মানসিক প্রস্তুতি ও সাহসী হতে পাশে থাকতে হবে। তারপরও বিকল্পভাবে কেউ যদি পরচুলা পরতে চান বা এতে সাময়িক স্বস্তি পান, তাহলে চুল দানের মতো এ ধরনের উদ্যোগও সহায়তা করবে।

যশোরের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপরাজিতা মণ্ডল ইউটিউবে চুল কাটার বিভিন্ন ভিডিও দেখত। সেখান থেকেই চুল দান করার বিষয়টি জানতে পেরে উৎসাহী হয়ে বাংলাদেশ হেয়ার ডোনেশন পেজের অ্যাডমিনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুল দান করে। এখন সে নিজেও অ্যাডমিনদের একজন। সে বলল, কেমোথেরাপি শেষে আবার চুল গজায় তা সে–ও জানে এবং প্রচারের সময় এ বিষয়গুলোও জানানো হবে। সে জানায়, ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের সাময়িক স্বস্তি দিতেই সে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন