বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বন্যায় আমন খেত নষ্ট হলে দেড় বিঘা জমি বন্ধক রেখে দেড় লাখ টাকা নিই। সেই টাকাও শোধ করতে পারিনি। জমিও উদ্ধার হয়নি।
শহিদুল ইসলাম, কৃষক, গাইবান্ধা

গাইবান্ধা সদর উপজেলার দাঁড়িয়াপুরের কৃষক শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এখনো তিনি আমন চাষ নিয়ে সিদ্ধান্তহীন। বললেন, তাঁর তিন বিঘা আবাদি জমির মধ্যে দুই বিঘায় বোরো ও আমনÑদুই ফসলই হয়। কিন্তু বন্যায় বারবার ক্ষতির কারণে তিনি আমন চাষের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

কৃষি বিভাগের করা কৃষকের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী, শহিদুল একজন ক্ষুদ্র কৃষক। জেলায় মোট কৃষক আছেন ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬০৬ জন। শহিদুলের মতো ৫০ থেকে ১৪৯ শতাংশ জমির মালিক ক্ষুদ্র কৃষক আছেন ২ লাখের কিছু বেশি।

শহিদুল বলেন, ২০১৯ সালের বন্যায় আমন খেত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেড় বিঘা জমি বন্ধক রেখে দেড় লাখ টাকা নেন। গত বছর আমন চাষ না করলেও সংসারের টানাপোড়েনে একটি এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ করেছেন।

৫ বিঘা জমি থেকে এখন মাত্র ১৭ শতাংশ জমি আছে সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নের মীরের বাগান গ্রামের কৃষক আবদুর জলিলের। তিনি মাঝারি কৃষক থেকে হয়েছেন প্রান্তিক কৃষক। এখন দিনমজুরিও করেন। তিনি বলেন, ‘বন্যায় ধান খায়া গেছে। খুউব ক্ষতি হইছে। সুদের ওপর টাকা নিছি, জমি বন্ধক রাখছি। আর কুলাতে পারি নাই।’

করোনার কারণে গত দেড়-দুই বছরে কৃষকদের একটি বড় অংশ গভীর সংকটে পড়েছে। তারা টিকে থাকার জন্য চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছে।
জহরুল কাইয়ুম, সভাপতি, সনাক

একই ইউনিয়নের বামনীপাড়ার বর্গাচাষি কায়েস, সাজু, রফিক ও রশিদুল জানান, তাঁরা অগ্রহায়ণ থেকে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত কেরানীগঞ্জের ইটভাটায় কাজ করেন। এবার টাকার অভাবে পড়ে স্থানীয় সরদারের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার করে টাকা নিয়েছেন। শর্ত অনুযায়ী, মাসখানেক পর তাঁরা সরদারের নির্দেশমতো ইটভাটায় কাজ করতে যাবেন। সেখানে টানা ছয় মাস কাজ করবেন। অন্য কোথাও কাজ করা যাবে না।

কয়েকজন দাদনগ্রহীতা ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমি ধান বাবদ এবং মাসিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক ও হাটরা সুদের ভিত্তিতে এসব সুদের ব্যবসা হয়। ধানের হিসাবে এক লাখ টাকা নিলে বোরো মৌসুমে ২০ মণ ধান ও আমন মৌসুমে ১০ মণ ধান দিতে হয়।

মাসিক টাকার ভিত্তিতে ১০ হাজার টাকা নিলে মাসে ১ হাজার টাকা সুদ দিতে হয়। বার্ষিক সুদের হার দাঁড়ায় ১২০ শতাংশ। এ ছাড়া ‘কারেন্ট’ সুদের ওপর নিলে ১ হাজার টাকায় দিনে ১০০ টাকা সুদ দিতে হয়। ‘হাটরা’য় প্রতি সপ্তাহে হাটে ১ হাজার টাকায় সুদ দিতে হয় ১৬০ টাকা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাগজপত্রের ঝামেলা ও হয়রানির কারণে তাঁদের ব্যাংকঋণ নিতে আগ্রহ কম।

গত বছর বন্যায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ ৯৬ কোটি টাকা।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুর মতিন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার নামমাত্র সুদে করোনাকালে প্রণোদনা ঋণ ও কৃষিঋণ দিচ্ছে। কিন্তু ঋণগ্রহীতারা অভ্যাসগত কারণে কেউ কেউ চড়া সুদে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন ও ঋণের জালে আটকে পড়ছেন। এ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষকেরা কেন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা তাঁরা ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না কিংবা বরাদ্দ কম কি না, জানতে চাইলে মো. আবদুর মতিন বলেন, ‘সরকার জেলার চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের সার ও বীজ দিচ্ছে। বরাদ্দ অনুযায়ী কৃষকদের এসব বিতরণ করা হয়।। এ ক্ষেত্রে সরকারের কৃপণতা নেই।’

১৯টি ব্যাংক ও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) থেকে গত অর্থবছরে সারা জেলায় কৃষিঋণ দিয়েছে ২১৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। জেলা কৃষিঋণ কমিটির সদস্যসচিব ও জনতা ব্যাংক গাইবান্ধা এরিয়া অফিসের সহকারী উপব্যবস্থাপক গোলাম ফারুক হোসেন জানান, কমিটির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের সুদহার ৮ শতাংশ।

জেলায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালায় আশা, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, এসকেএস, বীজ, এসএসএস, টিমএসএস, গাক, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র, আরডিআরএস, ব্যুরো বাংলাদেশসহ ১৮-২০টি এনজিও রয়েছে। এসব এনজিওর সুদের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। স্বাভাবিক সময়ে গাইবান্ধায় প্রতিবছর এনজিওগুলো এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করে। তবে কোভিডের কারণে গত অর্থবছরে ঋণ বিতরণের পরিমাণ কিছু কম হয়েছে।

জেলা সদর উপজেলায় বেশির ভাগ এনজিওর শাখা রয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশার দাড়িয়াপুর ব্রাঞ্চের ব্যবস্থাপক শহিদুর রহমান বলেন, এলাকাটি নদী অঞ্চল হওয়ায় এখানকার ৬০ ভাগ লোক ঢাকাসহ বাইরে কাজ করেন। কিন্তু করোনার কারণে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের বেশি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। অনেকে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার জন্য যেটুকু সময় প্রয়োজন, সেটি দিতে চান না। এঁরা দাদন ব্যবসায়ীর কাছে যাচ্ছেন। চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন।

অবশ্য এনজিওগুলো ঋণ দিলেও কৃষকদের জন্য আলাদাভাবে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কর্মসূচি নেই।

কামারজানি ইউনিয়নের বাসিন্দা ইমদাদুল হক তাঁর এলাকার ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আগে তিন-চার লাখ টাকা হলে ব্যবসায়ীরা ধান ও পাটের ব্যবসা করতেন। এখন যাঁর টাকা হয়েছে, তিনি সুদের ব্যবসা করছেন। বিভিন্ন হাটবাজার ও পাড়া–মহল্লায় ঋণ দেওয়ার নামে অসংখ্য অবৈধ সমিতি গড়ে উঠেছে। খোলাহাটি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর এলাকার কয়েকজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি দাদন ব্যবসায়ীদের ভয়ে গ্রামে আসতে পারছেন না। গত ১৭ আগস্টও দাঁড়িয়াপুর বাজারে একজন ঋণগ্রহীতার ছেলের অটোরিকশা এক দাদন ব্যবসায়ী আটক রেখেছিলেন। এ রকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

অবশ্য জেলার কৃষকেরা ঋণের জালে পড়েছেন, এমনটা মনে করেন না জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাসুদুর রহমান। তাঁর দাবি, সরকার বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সহায়তা করে। এ ছাড়া ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠিত এনজিওগুলোও স্বল্প সুদে ঋণ দেয়। ফলে কৃষকেরা আষ্টেপৃষ্ঠে ঋণের জালে পড়েছেন, এ রকম সংখ্যা কম।

সরকার গাইবান্ধায় সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্প থেকে প্রায় ১৫ হাজার সদস্যকে সেলাই, এমব্রয়ডারি, টিভি, ফ্রিজ মেরামত, ওয়েল্ডিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার সুবিধাভোগীকে ২০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুস সবুর প্রথম আলোকে বলেন, ঋণগ্রস্তদের মহাজনি সুদের কারবার থেকে বের করতে হলে তাদের চাহিদামতো ঋণ দিতে হবে।

জেলার সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি জহরুল কাইয়ুম বলেন, করোনার কারণে গত দেড়-দুই বছরে কৃষকসহ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ গভীর সংকটে পড়েছে। তারা টিকে থাকার জন্য চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র সহায়তা করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন