ছাত্রনেতা থেকে জামায়াতের অর্থের জোগানদাতা

১৯৭০ সালে মীর কাসেম আলী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর। ধীরে ধীরে এই ছাত্রনেতা হয়ে ওঠেন একাত্তরের গুপ্তঘাতক কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর অন্যতম প্রধান সংগঠক। স্বাধীন বাংলাদেশেও জামায়াতের ছাত্ররাজনীতি শুরু হয় তাঁর হাত ধরে। বর্তমানে তিনি জামায়াতের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা, অর্থের জোগানদাতা। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষায়, তিনি জামায়াতের খাজাঞ্চি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য মীর কাসেমকে গতকাল রোববার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া ৩৫১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে এসেছে ছাত্রনেতা থেকে আলবদরের অন্যতম সংগঠকে পরিণত হওয়া মীর কাসেমের রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধকালে কীভাবে তাঁর নেতৃত্বে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে চট্টগ্রামের আলবদর বাহিনী।
রায়ে বলা হয়, ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার মুন্সিডাঙ্গি সুতালরি গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মীর কাসেমের ছাত্রজীবন কাটে চট্টগ্রামে। ১৯৬৯ সালে তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে একই কলেজে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁকে কলেজ শাখার সভাপতি থেকে চট্টগ্রাম শহর শাখার সভাপতি করা হয়। ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ওই পদে থাকা মীর কাসেম গড়ে তোলেন আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম শাখা।
একাত্তরের ৭ নভেম্বর রাজনৈতিক জীবনে আবার পদোন্নতি পান মীর কাসেম। তাঁকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। স্বাধীনতার পর জামায়াত ও এর ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। ওই সময়ে মীর কাসেম অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে ছিলেন। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তাঁরই হাত ধরে আবার যাত্রা শুরু করে ছাত্র সংঘ, তবে এবার নাম বদল করে রাখা হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। সেই থেকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি চলছে বাংলাদেশে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, জামায়াতকে শক্ত আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ১৯৭৭ সাল থেকে কাজ শুরু করেন মীর কাসেম। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলে হাজার হাজার মুসলমান শহীদ হয়েছে, মসজিদ-মাদ্রাসা ভেঙে ফেলা হয়েছে ইত্যাদি তথ্য দিয়ে সৌদি আবর সরকার, বিভিন্ন ইসলামি দেশ ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ এনেছেন।
১৯৮০ সালে জামায়াতে যোগ দেন মীর কাসেম। ওই বছর তিনি সৌদিভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর এদেশীয় পরিচালক হন। তবে ১৯৮৩ সালে মীর কাসেমের প্রাতিষ্ঠানিক উত্থান হয় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল) গঠনের মাধ্যমে। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান তিনি। ব্যাংক গঠনের পর চিকিৎসাসেবা, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যম ও শিক্ষা—সব খাতেই বিচরণ তাঁর এবং এতে সব সরকার থেকেই পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন। যেসব খাতের সঙ্গে মানুষের নৈমিত্তিক সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলোকে বিনিয়োগের জন্য বেছে নেন মীর কাসেম। ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া তিনি ইবনে সিনা ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য, যার অধীনে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, ডায়াগনিস্ট সেন্টার, হাসপাতাল প্রভৃতি। দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি, এর অধীনে রয়েছে দৈনিক নয়া দিগন্ত নামের একটি পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত টিভি। টিভি চ্যানেলটি বর্তমানে বন্ধ আছে। এ ছাড়া নামের আগে ‘কেয়ারি’ রয়েছে—এমন ১০টি কোম্পানির পরিচালক মীর কাসেম। এ ছাড়া কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার জন্য রয়েছে তাঁর একক মালিকানাধীন বিলাসবহুল পাঁচটি প্রমোদতরী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ-আল-মালুম প্রথম আলোকে বলেন, মীর কাসেম আলী হলেন জামায়াতের ‘খাজাঞ্চি’। জামায়াত-শিবির যে আজ একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, মীর কাসেম হলেন এর নেপথ্যের কারিগর।