default-image

একুশের ছাত্র আন্দোলন যেন এক জাদুমন্ত্রে পরদিন গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতার প্রাণদানের প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে সেই অভাবিত জাদু। ঘাতক শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়েছিল আমজনতা। যেমন শহর ঢাকায়, তেমনি দেশের অন্যত্র। এমনকি সে ঢেউ দূর গ্রামের শিক্ষায়তন কেন্দ্র করে জনমনে ছড়িয়ে পড়েছিল। আপাতবিচারে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এই ছিল একুশের ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

দিনটা ছিল শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি। অনন্য এ দিনটির সূচনা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে একুশের শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজার মধ্য দিয়ে। পুলিশ দুই শহীদের লাশ গুম করার ফলে বাধ্য হয়ে ছাত্র-যুব নেতৃত্বকে বিকল্প হিসেবে গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করতে হয়। কয়েক হাজার শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে জানাজার পর ইমাদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় সংক্ষিপ্ত শোকসভা। এরপর হোস্টেল প্রাঙ্গণ থেকে মিছিলের যাত্রা শুরু। মিছিলে এবার আসে নতুন স্লোগান ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’। সেই সঙ্গে ক্রুদ্ধ উচ্চারণ—‘খুনি নুরুল আমিনের বিচার চাই’, ‘রক্তের বদলে রক্ত চাই’ ইত্যাদি।

শুক্রবারের বিস্ফোরক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে বাধ্য হয়। জারি করে সান্ধ্য আইন। তবু অবস্থা আয়ত্তে আসেনি। ছোট-বড় মিছিলে ক্রুদ্ধ জনতার পদচারণে ঢাকা সেদিন মিছিলের শহরে পরিণত হয়। লাল কালিতে লেখা পোস্টার-ফেস্টুন আর উড়ন্ত কালো পতাকা মিলে লাল-কালোর এক আশ্চর্য প্রকাশ। মিছিলে মিছিলে সয়লাব শহরে সেদিন স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল। অনেকটা ওই কবিতার পঙ্ক্তির মতো—‘আজ হরতাল। আজ চাকা বন্ধ।’ সত্যি ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশনে রেলের চাকা বন্ধই ছিল।

বিজ্ঞাপন

সেদিন শুধু বাজারহাট, দোকানপাটই বন্ধ থাকেনি, অফিস-আদালতের কর্মচারী এবং কারখানার শ্রমিক (অবশ্য অবাঙালি বাদে) সবাই বিনা আহ্বানে মিছিলে শামিল হয়েছে, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। মসজিদে মসজিদে মানুষ গায়েবানা জানাজা আদায় করে, সেই সঙ্গে মোনাজাত। ক্ষুব্ধ জনতার উত্তাল ঢেউ লক্ষ করেও পুলিশ-ইপিআর বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। চলে লাঠিচার্জ আর গুলি। ফলে দ্বিতীয় দিনও হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবু মিছিল চলতেই থাকে।

সেদিনের পরিস্থিতি বুঝতে আজাদ পত্রিকার দু-একটা ছোট্ট খবরই যথেষ্ট। ‘শুক্রবার শহরের অবস্থার আরও অবনতি। সামরিক বাহিনী তলব। পুলিশ ও সেনাদের গুলিতে চারজন নিহত। শতাধিক ব্যক্তি আহত।’ এই সঙ্গে আরও লেখা হয়: ‘সমস্ত ঢাকা শহরে উত্তেজনাময় পরিস্থিতি বিরাজ করিতে থাকে। সারা শহরটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সামরিক ছাউনি বলিয়া প্রতীয়মান হইতে থাকে’ ( আজাদ , ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। হ্যাঁ, শহর ঢাকা সেদিন সামরিক ছাউনির মতোই মনে হচ্ছিল। কারণ, শহরের পথে পথে সশস্ত্র পুলিশের টহল, বড় রাস্তাগুলোতে সেই সঙ্গে ইপিআরের সেনা মোতায়েন। সামরিক যানগুলোতে অস্ত্রসজ্জিত সেনা-জওয়ান লড়াইয়ের জন্য প্রস্ত্তত। তাদের ধাতব মুখে হিংস্রতার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি।

default-image

ক্ষুব্ধ জনতার মিছিল মেডিকেল হোস্টেল থেকে বেরিয়ে হাইকোর্ট-কার্জন হলের পাশ দিয়ে নাজিমুদ্দিন রোড, চকবাজার, ইসলামপুর, সদরঘাট পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেকবার লাঠিচার্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বাস করা কঠিন যে এ সময় মিছিলে স্থানীয় লোকজন, দোকানদার স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে যোগ দেওয়ায় মিছিল ক্রমেই আয়তনে বড় হয়েছে। এতে বহুসংখ্যক সরকারি কর্মচারীকে যোগ দিতে দেখা যায়। মিছিলের সামনে গুলিতে নিহত-আহতদের রক্তমাখা জামাকাপড়ের অংশবিশেষ লাঠির মাথায় পতাকার মতো উড়ছিল। মূল মিছিল অবশ্য ভিন্ন পথে এগিয়েছে।

নবাবপুর রোডে সেই মিছিল একইভাবে ব্যানার-ফেস্টুন ও স্লোগানসহ মানসী সিনেমা হলের পাশ দিয়ে রথখোলা, ভিক্টোরিয়া পার্ক হয়ে সদরঘাটের দিকে যায়। এ মিছিলেরও আয়তন ছিল বিশাল। আর এ মিছিলে সামরিক যান থেকে একাধিক স্থানে গুলি চালানো হয়। তবু মিছিলের পথচলা বন্ধ করা যায়নি। এ ছাড়া লালবাগ ও সলিমুল্লাহ হলের সামনে থেকেও মিছিল স্লোগান সহকারে পথ চলেছে। এককথায়, গোটা শহরের পথে পথে মিছিল। অন্যদিকে পরিষদ ভবনের সামনে ছিল একাধিক মেশিনগান। হোস্টেলের সামনে টহল চলেছে অস্ত্রধারী জওয়ানদের।

বিজ্ঞাপন

২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনা জওয়ানদের গুলিতে শহীদ হন হাইকোর্টের কর্মচারী সফিউর রহমান, রিকশাচালক আবদুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ, তাঁতীবাজারের যুবক সিরাজউদ্দিন এবং নাম না-জানা আরও কয়েকজন, যাদের সামরিক যানে ও পুলিশ ভ্যানে তুলে নিতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে দৈনিক আজাদ সেই খবর ছাপে। কাজেই ২২ ফেব্রুয়ারি গুলিতে, বেয়নেটের আঘাতে ঠিক কতজন হতাহত হয়েছিলেন, সে খবর কখনোই জানা যাবে না।

ছাত্র আন্দোলন ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়ে পরিস্থিতি সরকারের জন্য এমনই বিপজ্জনক করে তুলেছিল যে আজাদ -এর মতো রক্ষণশীল পত্রিকায়ও লিখতে হয়। ‘গত দুই দিন ধরিয়া ঢাকা শহরের বুকে যেসব কাণ্ড ঘটিতেছে, সে সমস্ত শুধু শোকাবহ নয়, বর্ব্বরোচিত বটে।’ তা ছাড়া মন্ত্রিসভার পদত্যাগের দাবিও জানায় আজাদ । রাষ্ট্রভাষা বাংলা সম্পর্কে তখন ওই পত্রিকার মন্তব্য: ‘এ যদি এখানকার জনমতের দাবি হয়, তবে পাকিস্তানকে ইহা মানিয়া লইতে হইবে।’ অবশ্য পরে আজাদ তার অবস্থান পাল্টে বিপরীতমুখী হয়েছিল।

তবু প্রথম দু-তিন দিন আজাদ -এর প্রতিবেদন ও ঘটনাদৃষ্টে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা চলে। এবং চলে কুখ্যাত মর্নিং নিউজ পত্রিকার ছাপাখানা ‘জুবিলি প্রেস’ পুড়ে ছাই হওয়ার ঘটনা থেকে। ঢাকাইয়া তরুণদের ক্ষোভ এভাবে প্রকাশ পায়। তারা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি প্রেসের কাছে আসতে দেয়নি। এর কারণ রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে মর্নিং নিউজ -এর সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার ও মিথ্যা খবর পরিবেশন, এককথায় আন্দোলনের বিরোধিতা।

পুলিশের যুক্তিহীন গুলিবর্ষণের কারণে ঢাকার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ এতটা ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে যে সশস্ত্র পুলিশের লাঠিচার্জ, সেনা জওয়ানদের বেয়নেট চার্জ এবং যত্রতত্র মিছিলের ওপর সেনা ও পুলিশের গুলিবর্ষণ ছাত্র-জনতাকে সাময়িক ছত্রভঙ্গ করেছে, কিন্তু পথ থেকে সরাতে পারেনি। জওয়ানদের বেপরোয়া মনোভাব সম্পর্কে আজাদ (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) লেখে: ‘গতকল্যকার ঘটনার বিশেষত্ব হইল সৈন্যগণকে অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গিনের খোঁচায় বিক্ষোভকারিগণকে ঘায়েল করিতেও দেখা যায়।’ এত সব সত্ত্বেও ছাত্র-জনতার মিছিল দিনভর ঢাকার ছোট-বড় সব রাস্তাই দখল করে রেখেছিল।

গণ-আন্দোলনের বিপদ আঁচ করে সরকার দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করে। কারণ, একদিকে ছাত্র-জনতার অনমনীয় সরকারবিরোধিতা, অন্যদিকে ঘাতক পুলিশ বাহিনীসহ সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিচারের দাবি, যেমন পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে, তেমনি বিভিন্ন প্রতিবাদ সভায় এবং কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতার কণ্ঠে। এটা মুখ্যমন্ত্রীর জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিল না। তা ছাড়া সেদিন মিছিলে ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই’ স্লোগানও হয়তো তাঁর কানে গিয়ে থাকবে।

তাই সরকার আন্দোলনের মোকাবিলায় যেমন পুলিশসহ ব্যাপক সেনা টহলের ব্যবস্থা করে, রাতে কারফিউ জারি করে, তেমনি পূর্ববঙ্গ আইনসভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সুপারিশ প্রস্তাব পাস করে। আবার একই সঙ্গে নানা ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের চরিত্র হননের চেষ্টা করে। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রেরণা ও শক্তি ভারত থেকে এসেছে, রাষ্ট্রদ্রোহী ও কমিউনিস্টরা পাকিস্তানকে ধ্বংসের জন্য ভাষার নামে আন্দোলনে নেমেছে, এমন প্রচারও শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রীর বেতার ভাষণে ওই মিথ্যাচার নিলর্জ্জভাবে প্রকাশ পায়।

শুরু থেকে পাকিস্তানি শাসন এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতি বরাবর চালিয়ে এসেছে। ভারত-বিদ্বেষ পুঁজি করে যেকোনো ধরনের আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তান এখনো ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে সরে আসতে পারেনি। আর পারেনি বলে ঘর সামলাতে ও ঠিকঠাক রাখতে একুশ শতকে পৌঁছেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সামরিক-বেসামরিক উভয়বিধ শাসনে।

সূত্র: ভাষা আন্দোলন, আহমদ রফিক, প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন