ছুটির দিনে ছোটগল্পের জয়
শুক্রবার ছুটির দিনে অমর একুশে বইমেলার নিরাপত্তা গেট অতিক্রমই ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। এরপর যেন সবার মুক্তি। ভিড় ঠেলেও হাসিমুখেই নির্দিষ্ট বইয়ের দোকান খুঁজে বের করেছেন পাঠক, ক্রেতা। তথ্যকেন্দ্র জানাল, ছুটির দিনে ভিড় বাড়ে প্রায় চার গুণ। এত মানুষের মধ্যে লিটলম্যাগ চত্বরের দিকে কিছুটা কম ভিড় থাকায় দেখা গেল সেদিকে ক্লান্তজনেরা বিশ্রাম নিচ্ছেন মাটিতে বসেই। এর মধ্যে আকাশি টি-শার্ট গায়ে একদল তরুণ এল মেলায়। তাঁদের শার্টে লেখা বই সিন্ধু। নিজেদের টাকায় বই কিনে অথবা লেখকদের কাছ থেকে পেলে এই স্বেচ্ছাসেবী তরুণ দলটি পড়ে পড়ে শোনায় অন্যদের।
মেলার মাঠে বই সম্পাদনা নিয়ে পাওয়া গেল ভিন্ন ভিন্ন মতামত। অনেক সিরিয়াস পাঠক বলেছেন, অসম্পাদিত বই মানুষকে বইবিমুখ করতে পারে। শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবীন আহসান বললেন, ‘সম্পাদনার যেমন খরচ আছে, তেমনি আবার লেখকদের ইগো কাজ করে। লেখায় হাত দিলেই মনে করেন নষ্ট হলো। তবু অনেক প্রকাশকই এখন চেষ্টা করেন সম্পাদনা করে বই আনতে।’
বরাবরের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তুলনায় কিছুটা মানুষ কম বাংলা একাডেমি চত্বরে। চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন যাত্রাবাড়ী থেকে আসা আফসা বেগম। তিন সন্তানকে নিয়ে এবারের মেলায় প্রথম এসেছেন ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করা এই মা। বললেন, ‘যত দিন বাঁচি, ভালো থাকার চেষ্টা করছি। মেলায় এলে আমার সন্তানদের মন ভালো হয়।’
মন যে ভালো থাকে, প্রমাণ পাওয়া গেল বাংলা একাডেমি চত্বরের উন্মাদ রম্য পত্রিকার স্টলে। ভিড়ভাট্টা পাত্তা না দিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন সবাই। সম্পাদক আহসান হাবীব বললেন, মেলা নিয়ে তিনি আশাবাদী। শিশুপ্রহর নিয়ে জানতে চাইলে বললেন, ‘শিশুপ্রহর হলেও ওখানে শিশুদের আসতে হয় মা–বাবার সঙ্গে। ফলে শুধু শিশুপ্রহর আর বলা যাচ্ছে না।’
গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত শিশুপ্রহরের জন্য দুবার উপস্থিত হয় সিসিমপুরের প্রিয় চরিত্র হালুম, টুকটুকি, ইকরি ও শিকু। শিশুরা আবার তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে, কথা বলতেও ছিল উদ্গ্রীব। এবারের মেলায় গতকালই প্রথম আয়োজিত হলো শিশুপ্রহর। বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ এবং বিদ্রোহী কবিতা ও ৭ মার্চের ভাষণ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
মন ভালো করা এ মেলায় এ বছর ১১তম দিনে নতুন বইয়ের সংখ্যা ২৪৯। এ বছরের মেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা গতকালই প্রথম হাজার অতিক্রম করে ১ হাজার ২৪২টিতে পৌঁছাল। গতকাল গল্পের বই এসেছে ৪৮টি। বৃহস্পতিবারও এ সংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধেক। উপন্যাস ৩৬টি আর কবিতার বই এসেছে ৭০টি। সে তুলনায় প্রবন্ধ যথারীতি পিছিয়ে, ১৫টি।
আজ শনিবার ছুটির দিনে মেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
নতুন বই
গতকাল আসা নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ শিক্ষা নিয়ে চিন্তা ও দুশ্চিন্তা, সংবেদ এনেছে পারভেজ হোসেনের উপন্যাস সুবর্ণপুরাণ, অনিন্দ্য এনেছে ইকবাল খন্দকারের গল্প তুলকালাম হাসি।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস
সুন্দরবন নিয়ে বাংলায় বেশ কিছু বই আছে। তবে প্রাণপ্রকৃতির ইতিহাস নিয়ে বইয়ের তেমন খবর পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মকেও সুন্দরবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতেই এম এ আজিজের গবেষণামূলক কাজ এনেছে প্রথমা প্রকাশন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রিটিশ আমলের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, ঐতিহাসিক জেলা গেজেটিয়ারের তথ্য-উপাত্ত। ঐতিহাসিক সুন্দরবনের নানা দিক—বনজীবীদের জীবনযাত্রা, বৈচিত্র্যময় গাছপালা, অতীত-বর্তমান সুন্দরবনের নানা বন্য প্রাণী সম্পর্কে জানতে সব আগ্রহী পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস।
লেখক এম এ আজিজ বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিষয়ের অধ্যাপক। ২০০৯ সালে শুরু করেন সুন্দরবনের বাঘ ও প্রাণপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা। এরপর কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টে পিএইচডি গবেষণার শুরু। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নির্ণয়সহ বাঘের জিনভিত্তিক নানা রহস্য উন্মোচন করে ২০১৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ডারেল ট্রাস্ট ফর কনজারভেশন বায়োলজি পুরস্কার। ২০১৯ সালের জাতীয় বাঘশুমারির তথ্য বিশ্লেষণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।