বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: এবার দুর্গাপূজার সময় বাংলাদেশের কয়েকটি জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এরপর বিজেপি এবং কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে দুই দশক ধরে আমরা এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি। সর্বশেষ এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?

বিক্রম দোরাইস্বামী: ঘটনার পরপরই ভারত সরকার বিবৃতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে। যা ঘটেছিল, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে আমরা লক্ষ করেছিলাম, লোকজন যাতে উৎসব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যা যা করা দরকার, তার সবটাই করেছিল। ফলে লোকজন দুর্গাপূজা পালন করতে পেরেছিলেন। বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের সরকার গ্রেপ্তার করেছিল। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা অবহিত রয়েছি এবং কোনো কিছু বলার বিষয়েও সতর্ক রয়েছি।

একটা বিষয় স্পষ্ট করেই বলতে চাই, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যেটা বলে, সেটা ভারতেরই অবস্থান। তবে এটাও ঠিক যে দুই দেশেই গণতন্ত্র আছে। দুই দেশের জনগণের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তার মানে এটা নয় যে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই সরকারের অবস্থান।

প্রথম আলো: দুর্গাপূজার সময়কার এসব সহিংসতার বিষয়ে কি বাংলাদেশের সঙ্গে আপনাদের আলোচনা হয়েছে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র এবং ভৌগোলিকভাবে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের অন্যতম। স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের (সাম্প্রদায়িক সহিংসতা) পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে নিবিড় আলোচনা হয়। কিন্তু এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা জনসমক্ষে কথা বলি না। বাংলাদেশের কী করা উচিত, এটা বলার জন্য আমরা এখানে আসিনি। দেশটা যখন আপনাদের, লোকজনের দেখভালের দায়িত্বটাও বাংলাদেশের। যেমনটা আমাদের লোকজনের দেখভালের দায়িত্ব ভারতের। তবে আমরা একে অন্যের সঙ্গে তথ্য আদান–প্রদান করি। এখানে আমাদের অনেক বন্ধু রয়েছেন। ফলে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা একে অন্যকে যথাযথভাবে অবহিত করতে পারি। সম্পর্কের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও তথ্য বিনিময় করে থাকি।

প্রথম আলো: শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জেরে ভারতের অন্যান্য স্থানেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। এ বিষয়গুলো সুরাহার উপায় কী?

বিক্রম দোরাইস্বামী: এ জন্যই তো আমরা একে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করি। মিথ্যা খবর যাতে সবকিছুকে ছাপিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের পথ খুঁজে বের করতে হবে। অধিকাংশ সময় মিথ্যা খবরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

ত্রিপুরার ঘটনা নিয়ে প্রচুর মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে দেখা গেছে খবরগুলো ঠিক নয়। ত্রিপুরা রাজ্য সরকার দ্রুত এ বিষয়ে আমাদের তথ্য দিয়েছিল। আমরা এসব তথ্য শুধু সরকার ও ধর্মীয় নেতাদের কাছেই নয়, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও দিয়েছি। যাতে তাঁরা লোকজনকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে বাস্তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এটা ঠিক যে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের নাগরিকদের দেখভালের দায়িত্ব আমাদের ওপর পড়ে।

যারা সংবেদনশীলতা উসকে দিতে চায়, তাদের রোধ করাটাও আমাদের দায়িত্ব। তাই তথ্য আদান–প্রদানের সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই আমরা করি। মুষ্টিমেয় উসকানিদাতাদের কারণে নিরীহ ও সাধারণ লোকজন যাতে দুর্ভোগের শিকারে পরিণত না হন, সেটা নিশ্চিত করতে আমরা সম্ভাব্য চেষ্টাটাই করি।

default-image

প্রথম আলো: জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কে এটি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি। তবে এটি নতুন কোনো প্রক্রিয়া নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন, পঞ্চাশের দশকে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এটি তারই অংশ। কাজেই আসামের বর্তমান সরকার কিংবা দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার এটি নতুন করে শুরু করেনি।

সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জের ধরে আসামে সত্তরের দশকের আন্দোলনের বিষয়টি আপনাদের নিশ্চয় জানা আছে। রাজ্যের বাইরে থাকা আসা লোকজনকেও ‘বিদেশি’ অভিহিত করে ওই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ওই আন্দোলনের ইতিহাসটা বেশ দীর্ঘ এবং সহিংসও বটে। শেষ পর্যন্ত যারা আসামে তাদের পূর্বপুরুষের অবস্থানের প্রমাণ দিয়েছিলেন, তারা রাজ্যটিতে স্থায়ীভাবে থাকার বিষয়টি সুরাহা করতে পেরেছিলেন। আদালতের নির্দেশে এটি ঘটেছিল। প্রক্রিয়াটি যে জটিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বিষয়টিকে অনেকে ভুলভাবে দেখেন। নাগরিকপঞ্জির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করার কোনো চেষ্টা নেই। কাজেই ডেটা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়েছে, সেটি এক ভিন্ন বিষয়। এখন নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সেটা আইন এবং আদালতের নির্দেশনা মেনে সংসদ ঠিক করবে। তবে এতে বাংলাদেশে কোনো প্রভাব পড়বে না। যা কিছুই করা হোক, তা ভারতীয় আইন, নাগরিকত্ব আইন এবং আদালতের নির্দেশনার মধ্যেই সীমিত থাকবে। প্রক্রিয়াটির নিজস্ব কিছু জটিলতা রয়েছে, যা মূলত রাজনৈতিক ইস্যু এবং আমাদেরই এর সুরাহা করতে হবে।

default-image

প্রথম আলো: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছিলেন তাঁদের মেয়াদকালে তিস্তা চুক্তি সই হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। বাংলাদেশের জনগণ মনে করছে, তিস্তা চুক্তি থেকে ভারত ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, যা তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। তবে কি তিস্তা চুক্তি সই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারতও তিস্তা চুক্তি সই করতে চায়। এ বিষয়টি সুরাহার বিষয়ে ভারতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে বন্ধু হিসেবে বলতে চাই, বাংলাদেশের বন্ধুরা যেমন আমাদের বলে বাংলাদেশকে বুঝতে হবে; আমিও বলতে চাই, ভারতকে বোঝাটাও জরুরি। আমাদের কিছু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা একতরফাভাবে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।

সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি করে দেওয়া আছে। পানির বিষয়ে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে অনেক জটিলতা রয়েছে। আমরা সমস্যাটির সমাধান চাই না, তা কিন্তু নয়। আমরা সব পক্ষকে নিয়েই এটির সুরাহা করতে চাই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক। এটির সুরাহা হওয়া উচিত। বাংলাদেশের বন্ধুদের বোঝা উচিত, আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব নেই। কিন্তু কোনো বিষয় সুরাহার ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে এটি আমাদের অন্য অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনের বিষয় থেকে সরিয়ে রাখবে না। কারণ, আমাদের অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫২। তাই অন্য নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কীভাবে করতে পারি, সেটি দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে।

প্রথম আলো: ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল সই হলেও ফেনী নদীর সীমানা চিহ্নিত করার বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। কর্মকর্তা পর্যায়ে বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় রাজনৈতিক পর্যায়ে এর সমাধান হওয়ার কথা ছিল। বিষয়টির সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?

বিক্রম দোরাইস্বামী: ফেনী নদীর ওই ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার সীমানা সুরাহার জন্য এক বছরের বেশি সময় ধরে আমরা আলোচনা করছি। দুই পক্ষই স্থল সীমান্ত চুক্তির নীতিমালা অনুসরণ করে সমস্যার সমাধানের বিষয়ে একমত আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সময়ে নদীর সীমানা মাপা হবে? অতীতে যৌথভাবে নদীর পানি পরিমাপের পর সীমানা দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে নদীর গতিপথ বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, নদীর কোন গতিপথকে বিবেচনায় নেওয়া হবে? কারণ, এর সঙ্গে ভূমি ব্যবহারের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। কোভিডের কারণে এতে দেরি হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত প্রক্রিয়াগুলো ত্বরান্বিত করে এর সুরাহা করতে পারব। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আমাদের এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে, যাতে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি না হয়। কাজেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমাধানের একটি পথ খুঁজে বের করাটা এখন দুই পক্ষের জরিপকারী ও আমলাদের দায়িত্ব। কাজটিকে আমার অসম্ভব মনে হয়নি। নিজে দুবার সেখানে গিয়ে এবং মানচিত্র দেখে বুঝেছি এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। স্থল সীমান্ত চুক্তির প্যাকেজের আওতায় আমাদের এর সমাধান করতে হবে।

প্রথম আলো: ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বারবার সীমান্তে জীবনঘাতী অস্ত্র ব্যবহার বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। এরপরও সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি হত্যা থামছে না। সীমান্তে হত্যা বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?

বিক্রম দোরাইস্বামী: আমাকে এই প্রশ্নটা করার জন্য ধন্যবাদ। প্রথমত, যাঁদের হত্যা করা হচ্ছে, তাঁরা নিরস্ত্র নন—এ বিষয়টি আমাদের স্পষ্ট করা দরকার। সীমান্তে কী ঘটছে, সেটাও বুঝতে হবে।

সীমান্তে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটছেই। প্রতিদিনই ফাঁকা গুলি ছোড়ার বিষয়টি কয়েকবার ঘটে এবং এগুলো ঘটে রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত। প্রশ্ন ওঠে, কারা এসব ঘটনায় জড়িত? প্রথমত, এসব ঘটনার সঙ্গে ভারতীয় ও বাংলাদেশিরা জড়িত। ফলে এটি নিশ্চয় অবৈধ অভিবাসন নয়। দ্বিতীয়ত, এসব লোকজনের ৯৯ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। গরু চোরাচালানসহ এদের সবাই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত। এটি যদি ইয়াবার মতো ছোটখাটো জিনিস পাচারের বিষয় হয়ে থাকে, তবে তা সীমান্তের এক পাশ থেকে অন্য পাশে ছুড়ে দিলেই চলে। এত লোকজন জড়ো করার তো প্রয়োজন নেই!

প্রাণহানির এসব ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং বিয়োগান্ত হলেও সীমান্তে নিরস্ত্র লোকজনের অবৈধ পারাপারের সঙ্গে একে মিলিয়ে বিভ্রান্ত হওয়াটা উচিত হবে না। কারণ, সাধারণ মানুষ যখন দুর্ঘটনাবশত কিংবা পরিকল্পিতভাবে অনুপ্রবেশের সময় ধরা পড়ে যান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা আটক লোকজনের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা নিয়মিতভাবেই করেন। অনুপ্রবেশের সময় আটক হওয়া লোকজনের পর্যাপ্ত বৃত্তান্ত না থাকলে তাঁদের ফেরত পাঠানো হয় না। এসব লোকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য তাঁদের স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪৬০ জন বাংলাদেশিকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আর সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের কারণে হস্তান্তর করা হয়েছে ১২৪ বাংলাদেশিকে।

সীমান্তে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সহিংসতার যে ঘটনাগুলো ঘটে, এবার সেগুলোকে যাচাই করা যাক। সীমান্তে আমাদের অংশে মোতায়েনকৃত বিপুলসংখ্যক সীমান্তরক্ষী নিয়মিত টহল দেন। সাধারণত রাতে চারজনের একটি দল টহলে থাকেন। আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সীমান্তে সহিংসতা কমানো এবং সুরক্ষার স্বার্থে একজনের কাছে জীবনঘাতী অস্ত্র থাকে। অন্যদের কাছে থাকে প্যালেট গান (জীবনঘাতী নয় এমন অস্ত্র)।

আমাদের অংশে সীমান্তের চিত্রটা এমন। সীমান্তে কোনো রকম চাপ সৃষ্টি হলে আমরা সমন্বয় করে থাকি। ভারতীয় অংশ থেকে একটি দল এসে সীমান্তে জড়ো হয়। বাংলাদেশ অংশ থেকে একটি দল এসে জড়ো হয়। চোরাকারবারিরা কাঁটাতারের বেড়া কেটে গরু পার করার চেষ্টা করে। সীমান্তের দুই পাশে লম্বা কাঁটাতারের বেড়া থাকায় তারা দ্রুত তা কাটতে পারে না। এ জন্য কখনো কখনো তারা কাঁটাতারের ওপর দিয়ে গরু পার করে দিতে ক্যান্টিলিভারসহ ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে আসে। এখন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী যখন আমাদের অংশে চোরাচালানকারীদের বাধা দেয়, তারা সহিংসতা শুরু করে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তুলনায় সংখ্যা বেশি থাকা এসব লোকজনের হাতে দা, ধারালো অস্ত্র ও লাঠি থাকে। এ কারণে সীমান্তরক্ষীদের জন্য জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

সাধারণত চোরাচালানকারীরা আগে থেকেই জানে কোন সীমান্তরক্ষীর হাতে জীবনঘাতী অস্ত্র রয়েছে। তাই শুরুতেই অস্ত্র বহনকারী সীমান্তরক্ষীর ওপর তারা হামলা চালায়। সীমান্তের দুই পাশ থেকে আসা লোকজনই এটা করে। গভীর রাতের অন্ধকারে এটি ঘটে বলে আপনি বুঝতে পারবেন না এদের মধ্যে ভারতীয় কে আর বাংলাদেশি কে। তা ছাড়া দেখতে তো এদের সবাই একই রকম। সীমান্তে সহিংসতার সব ঘটনায় বিএসএফের সদস্যরা ধারালো অস্ত্রের হাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, কারও হাত কাটা পড়েছে, কেউ কবজি হারিয়েছেন। বিষয়টি এমন নয় যে সীমান্তরক্ষীরাই শুরুতে লোকজনের ওপর গুলি চালাতে চেয়েছেন।

default-image

এ যুক্তির পক্ষে কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে ভারতীয় ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ১২৪ বাংলাদেশি প্রাণ দিয়েছেন। একই সময়ে এসব ঘটনায় নিহত ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ৯০। এ সময়ে সহিংস এসব ঘটনায় ১৭ জন বিএসএফ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ১ হাজার ৩৯ জন বিএসএফ সদস্য আহত হয়েছেন।

কাজেই সীমান্তে আমাদের অংশে বিয়োগান্ত সহিংসতার শিকার হওয়া লোকজন অবৈধ অভিবাসী নন। কাজের জন্য অবৈধ পারাপার দুই পার থেকে ঘটে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রটোকলটা অনেক মানবিক। সীমান্ত পারাপারের সময় লোকজনের প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটে না। তবে সহিংসতা এবং মৃত্যু একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বলা চলে বিষয়টি আলাদা; যা অবৈধ অভিবাসন নয়। লোকজন ভারতে কিংবা বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার জন্য এটা করে না। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যেই তারা এটা করছে।

লোকজন গরিব এবং তাঁদের জীবিকার পথ খুঁজতে হয়—এ বিষয়ে সহানুভূতিশীল থাকার পরও যা ঘটছে তাকে অজুহাত হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। আপনি এঁদের গরু ব্যবসায়ী বলতে পারেন না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বৈধভাবে কোনো গরু ব্যবসা হয় না। গরুর ব্যবসা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে বৈধ হতে পারে। কিন্তু আন্তসীমান্ত গরু ব্যবসা বৈধ নয়। যাঁরা এসব করছে, তাঁরা বিষয়টি জানেন। তা না হলে তাঁরা রাত তিনটায় সীমান্তে যাবেন কেন? তাঁরা যদি বৈধ গরু ব্যবসায়ীই হন, তাঁদের তো দিনের বেলা যাওয়ার কথা। জনগণকে বিষয়টি বুঝতে হবে। এসব লোকজনকে থামাতে হবে। এটা বন্ধ করতেই হবে।

সীমান্তের দুপারেই অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো এবং বৈধ বাণিজ্য উৎসাহিত করার জন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ৭৫ বছর ধরেই লোকজনের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। তাদের এ উদ্‌যাপনে সমর্থন না দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করার তো কোনো কারণ নেই। যে দেশটা আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে আমাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব উসকে দিতে যাব কেন? এর তো কোনো মানেই হয় না। দরিদ্র লোকজন সহজ পথে উপার্জন করতে চায়। ভারতে গরুর তেমন দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে ভালো দাম পাওয়া যায়। এটা সত্যি যে পশু উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক ভালো করছে। ফলে আপনাদের গরুর খুব একটা দরকার নেই। কিন্তু ভারত থেকে নামমাত্র মূল্যে কিনে এখানে যদি ভালো দামে বিক্রি করা যায়, তবে সবাই তো এ পথে আয় করতে চাইবে।

প্রথম আলো: সাম্প্রতিক ভারতের ঋণচুক্তি বা এলওসির আওতায় সর্বোচ্চ সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে এলওসির আওতায় থাকা প্রকল্প বাস্তবায়নে যে দেরি হচ্ছে, সেটা দুই দেশই স্বীকার করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সর্বশেষ পরিস্থিতি কেমন?

বিক্রম দোরাইস্বামী: দুই পক্ষই বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে চায়। এলওসির আওতায় এ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশকে ৭৮০ কোটি ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছি; যা আমাদের বৈশ্বিক সহায়তার প্রায় ২৮ শতাংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে যে শর্তে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তার তুলনায় অনেক নমনীয় শর্তে তা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশকে। ১ শতাংশ সুদে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর চেয়ে ভালো শর্তে এই সহায়তা দেওয়ার সুযোগ অন্য কারও নেই বললেই চলে। বাজার থেকে ঋণ নিলে যে হার এবং আমরা যে হারে ঋণ দিচ্ছি, তার মাঝে যে তফাতটা থাকছে, সেটা আমরাই বহন করছি। কাজেই মূল টাকাটা যেহেতু আমরাই দিচ্ছি, স্বাভাবিকভাবে আমাদের চাওয়া থাকবে প্রকল্প ত্বরান্বিত হোক, তা না হলে তো প্রকল্পের খরচ বাড়তে থাকবে।

এরই মধ্যে দুই পক্ষ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী কী সেটা বুঝতে পেরেছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, এলওসির আওতায় কেনাকাটার প্রকল্প দ্রুত এগোচ্ছে। কেনাকাটা তুলনামূলকভাবে সহজ। আপনি কোন জিনিসটি কিনতে চান, এর ধরন কেমন হবে, যেমন বাস কিংবা নির্মাণসামগ্রী; এরপর দরপত্র আহ্বান করে বাজার যাচাই করে ভালো দামে সেটি কিনে ফেললেন।

দামের বিষয়ে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেই হয়। ভালো দামে পণ্য কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাই বলে আমরা ভারতের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ না করে যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো দামে পাওয়া যায়, সে জন্য কাজ করছি। ফলে সম্ভাব্য দামের চেয়ে সস্তায় কেনাকাটা করা গেছে। তাতে দুই পক্ষের জন্য অর্থের সাশ্রয় হয়েছে।

default-image

এলওসির আওতায় এখন পর্যন্ত ৬৯০ কোটি ডলারের ৪৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১৪টি শেষ হয়েছে, ১৮টি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে এবং ১১টির খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) নিয়ে কাজ হচ্ছে। আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে বলা যেতে পারে, প্রকল্পের মধ্যে ৭২ শতাংশ পরিকল্পনা বা ডিপিপি এবং দরপত্রের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ডিপিপির বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। তাই এখানে আমাদের বলার সুযোগ নেই কাজটি এভাবে হওয়া উচিত। কিছু কিছু প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব তিন থেকে চার বছর আগের। ফলে ডিপিপি চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্পের ব্যয় স্বাভাবিকভাবে আগের চেয়ে বেড়ে যায়। তবে গত বছর সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে চিহ্নিত হওয়ার পর কাজে গতি এসেছে।

গত বছর পর্যন্ত আমরা প্রায় ৭০ কোটি ডলার খরচ করতে পেরেছি। এ বছর আমরা খরচ করেছি ১২ কোটি ডলার। আমরা আশা করছি, দরপত্র এবং প্রকল্প বাস্তবায়নসহ খরচ ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এতে বাকি প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে। এলওসির কিছু প্রকল্প আমাদের দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এর মধ্যেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি দরপত্র পর্যায়ে এলে প্রকল্পের কাজ সম্পূরকভাবে চলবে। আমরা সম্পূরক প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেব, এক্সিম ব্যাংক দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্পের চুক্তি সই এবং প্রকল্পের শর্ত চূড়ান্ত করার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে করতে থাকবে। এখানে একটার পর অন্যটা করার প্রয়োজন নেই। জাপান এভাবে কাজ করে। আমরা এখানে জাপানের প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করছি। কাজের বিলের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, তারা সময়মতো বিল না পেলে কাজ করবে না। সামগ্রিকভাবে পুরো প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার স্বার্থে ডিপিপি চূড়ান্ত করার কাজে গতি আনতে হবে।

আগামীকাল পড়ুন সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন