জমে উঠেছে সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলা

গ্রামীণ মেলায় কারুপণ্যের বেচাকেনা l ফাইল ছবি
গ্রামীণ মেলায় কারুপণ্যের বেচাকেনা l ফাইল ছবি

বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হলো মেলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা উপলক্ষে মেলার আয়োজন হয়ে থাকে বহুকাল থেকে। মিলন শব্দ থেকে এসেছে মেলা। গ্রামীণ সমাজ জীবনের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল একসময়। মেলাকে কেন্দ্র করে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ আসে মেলায়। সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই পারস্পরিক যোগাযোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব তো রয়েছেই।
স্থানীয় কারুশিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য এবং কৃষিপণ্যই থাকে গ্রামীণ মেলার মূল বেচাকেনার জিনিস। বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, ধাতব, মৃৎ, চামড়া, তন্তুজাত হরেক রকমের কারুপণ্য ও বাচ্চাদের খেলনার বিপুল সমাবেশ গ্রামীণ মেলাকে বর্ণাঢ্য করে তোলে। এর পাশাপাশি থাকে খাজা, গজা, মওয়া এসব খাদ্যসামগ্রীর সমাবেশ। থাকে নাগরদোলা, পুতুলনাচ, গাজির গান, যাত্রাপালা, সংযাত্রা, সার্কাস, লাঠিখেলা—এসব হরেক রকমের আয়োজন।
কালের প্রবাহে মানুষের রুচি-পছন্দ অনেক বদলেছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে শহরের সঙ্গে গ্রামের ব্যবধানও ঢের ঘুচে গেছে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিস্তার ঘটেছে প্রত্যন্ত জনপদে। ফলে রূপান্তর এসেছে মেলার আঙ্গিকেও। লুপ্ত হয়েছে অনেক মেলা। এখন চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখেই গ্রামীণ মেলার আয়োজন হয় বেশি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এমন কয়েকটি মেলার বিবরণ পাঠিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা।
নন্দীগ্রামের জামাই মেলা: শহর থেকে দূরে। গ্রামীণ জনপদ। জনপদজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। নাইওর এসেছেন ৪০ গ্রামের নববধূ ও মেয়েরা। শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণে এসেছেন জামাইয়েরা। উপলক্ষ দুই দিনের মেলা।
চৈত্রসংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার পাঠান গ্রামে এ মেলা বসছে আনুমানিক ২০০ বছর ধরে। প্রাচীন এ মেলায় লোকসমাগম বেড়ে যাওয়ায় পাশের নিমাইদীঘিতেও আরেকটি মেলা বসছে এক দশক ধরে। মেলা উপলক্ষে শ্বশুরবাড়িতে জামাইদের নিমন্ত্রণের রেওয়াজ চালু আছে বলে স্থানীয়ভাবে এই দুটি মেলা ‘জামাই মেলা’ নামে পরিচিত। মেলায় কারুশিল্পের সমারোহের পাশাপাশি থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

িশল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা পরিচালিত সংগীত সংগঠন সুরের ধারা গতকাল বাংলা বর্ষবিদায় উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু্ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল পঞ্চকবির গান দিয়ে l ছবি: প্রথম আলো
িশল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা পরিচালিত সংগীত সংগঠন সুরের ধারা গতকাল বাংলা বর্ষবিদায় উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু্ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল পঞ্চকবির গান দিয়ে l ছবি: প্রথম আলো

নড়াইলের বৈশাখী মেলা: লোহাগড়ার ব্রাহ্মণডাঙ্গা, চরব্রাহ্মণডাঙ্গা, হান্দলা, বাড়িভাঙা—এই চার গ্রামের মানুষ আয়োজন করে ব্রাহ্মণডাঙ্গা বৈশাখী মেলা। নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের ব্রাহ্মণডাঙ্গা বাজারসংলগ্ন খেলার মাঠে বহুকাল থেকে এই মেলা হচ্ছে। কবে থেকে শুরু—এলাকার প্রবীণেরাও তা বলতে পারেননি। প্রতিবার চৈত্রসংক্রান্তির দিনে মেলা শুরু হয়। পরের দিন পয়লা বৈশাখেও চলে। ইদানীং কোনো কোনো বছর মেলার মেয়াদ এক দিন বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ঘোড়দৌড়। এ ছাড়া থাকে জারিগান, লাঠিখেলা, দড়ি-টানাটানি, হাঁড়িভাঙা প্রতিযোগিতা, সাইকেল রেস, সাঁতার প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন গ্রামীণ খেলার প্রতিযোগিতা। মেলায় ওঠে বাঁশ-বেত, বাঁশি, ধাতব কারুপণ্য ও মৃৎশিল্প। ২০০-এর মতো দোকান বসে। সমাগম ঘটে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের।
বাঘার মেলা: রাজশাহীর বাঘা উপজেলা সদরে শাহ মখদুম ডিগ্রি কলেজ মাঠে প্রায় ২০ বছর ধরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলা উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, লাঠিখেলা, জারিগান ও বাউলগানের ব্যবস্থা থাকে। মেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হরেক রকম মিষ্টি ও আসবাবের দোকান আসে। এ ছাড়া চন্দ্রগাতি ও বেলগাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ, পীরগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ তেপুকুরিয়া উচ্চবিদ্যালয় ও কামারপাড়া বাজারে এবার মেলার আয়োজন করা হয়েছে। অন্যান্য বছরও এসব জায়গায় মেলার আয়োজন করা হয়। তবে নিয়মিত নয়। তানোর উপজেলা সদরে এবার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে।