default-image

১৭ বছরের কিশোরী আঁখি। এখন সে ছোট আকারের একটি কারখানা দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আর সেখানে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করবেন সুবিধাবঞ্চিত অন্য নারীরা। সরকারসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও আঁখির স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের এগিয়ে আসার পেছনের কারণ, সম্প্রতি জাতিসংঘের ‘সত্যিকারের নায়ক’ (রিয়েল লাইফ হিরো) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে আঁখি।

১৯ আগস্ট ছিল বিশ্ব মানবতা দিবস৷ দিবসটি উপলক্ষে মানবতাবাদী ও মানবিক সহায়তার সম্মুখযোদ্ধাদের বিশেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘রিয়েল লাইফ হিরোস’ নামের ক্যাম্পেইন করে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থা ইউএনওসিএইচএ। এর উদ্দেশ্য, মানবিক কাজের স্বীকৃতি ও মানুষকে মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ করা।

টেলিফোনে কথা হলো আঁখির সঙ্গে। সে হাসতে হাসতে জানাল, জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়ে সে খুব খুশি। এখন সে ও তার পরিবারের সদস্যরা আগের চেয়ে ভালো আছে। বড় বড় মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। বিভিন্নভাবে সহায়তাও করছেন। ছোট একটি কারখানা চালু করতে চায় বলেও আঁখি জানায়।

খুলনার পূর্ব রূপসার বাগমারায় থাকে আঁখিরা। তার মা আনোয়ারাও বললেন, জাতিসংঘের স্বীকৃতির বিষয়টি তিনি প্রথম দিকে তেমন ভালোভাবে বুঝতে পারেননি। এখনো তেমন বুঝতে পারেন না। শুধু জানেন, তাঁর ছোট মেয়েটি বড় কোনো কাজ করে ফেলেছে। গ্রামের সবাই খুশি, সবাই তাঁর মেয়ের জন্য দোয়া করেন। জানালেন, আগে ছেলে-মেয়ে নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে, খাবার ও কাপড় চেয়ে এনে, চিংড়ি কোম্পানিতে কাজ করে কোনোভাবে টিকে ছিলেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সূত্রে আঁখির টেইলারিংয়ের কাজ শেখা এবং মেশিন পাওয়ার পর তাতে সেলাই শুরু করা এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতি তাঁদের জীবনটাই পাল্টে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আনোয়ারা বললেন, পিঠের হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানিতে আগের মতো কাজ করতে পারেন না। আঁখির বাবাও একই কাজ করতে গিয়ে এখন বেশ অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। আঁখির বড় বোনের ছোট বয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন ২০১৫ সালে। তবে সেই মেয়ে এক মাসও স্বামীর সংসার করতে পারেননি, আবার ফিরে এসেছেন। এখন বড় বোন মরিয়ম আঁখির কাজে সহায়তা করেন। আর আঁখির ভাই বিল্লাল মোল্লা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

আনোয়ারা জানালেন, আঁখি, মরিয়ম এবং তিনি—তিনজনই চিংড়ি পরিষ্কার করে নাড়ি বের করার কাজ করতেন। ২০১৮ সালে এ কাজ করার সময়ই ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কর্মীরা আঁখিকে দেখেন। তাঁরা আঁখিকে টেইলারিংয়ের প্রশিক্ষণ দেন। মেশিন দেন সঙ্গে গজকাপড়ও কিনে দেন। তাই দিয়েই আঁখি কাজ শুরু করে। বাড়ির সামনে ড্রেনের ওপর ছোট একটি মুদিদোকান চালু করে। বাবা মাসুদ মোল্লা সেখানে বসেন। দিন ফিরতে শুরু করে তাদের। তবে এর মধ্যেই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। আঁখি অন্যান্য সেলাইয়ের পাশাপাশি মাস্ক বানানো শুরু করে। একেকটি মাস্ক ১০ টাকা। ১০ টাকা দেওয়ার সামর্থ্যও যাদের নেই, তাদের বিনা মূল্যে মাস্ক দেওয়া হয়। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ আঁখির গল্পটি আঞ্চলিক অফিসে পাঠায়। তারপর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ কাজের জন্য বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান সৈকত, প্রকৌশলী রিজভী হাসান, ধাত্রী তানিয়া আক্তার, অনুবাদক সিফাত নূরের সঙ্গে আঁখিও ‘সত্যিকারের নায়ক’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আনোয়ারা হাসতে হাসতে বললেন, ‘এলাকার এমপি স্যার ১৩টা মেশিন দিছেন। চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সরকারি স্যারেরা খাসজমি দেওয়ার কথা জানাইছেন। থাকনের এবং এমপি স্যারের দেওয়া মেশিন রাখনের লাইগ্যাও ঘর বানাইয়া দিতে চাইছেন। কাজও চলছে।’

কথা হলো খুলনা-৪ আসনের (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) সাংসদ আব্দুস সালাম মুর্শেদীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘একদম ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমার স্ত্রী শারমিন সালাম আঁখিকে ১৩টি অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক সেলাই মেশিন দিয়েছেন। রূপসা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে সালাম মুর্শেদী সেবা সংঘের মাধ্যমে আঁখির হাতে এসব মেশিন তুলে দেওয়া হয়। মেশিনগুলো দিয়ে ছেলেদের প্যান্ট, মেয়েদের পোশাকসহ সব সেলাইয়ের কাজ করা সম্ভব।’

জাতিসংঘের স্বীকৃতির বিষয়টি তিনি প্রথম দিকে তেমন ভালোভাবে বুঝতে পারেননি। এখনো তেমন বুঝতে পারেন না। শুধু জানেন, তাঁর ছোট মেয়েটি বড় কোনো কাজ করে ফেলেছে। গ্রামের সবাই খুশি, সবাই তাঁর মেয়ের জন্য দোয়া করেন। জানালেন, আগে ছেলে-মেয়ে নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে, খাবার ও কাপড় চেয়ে এনে, চিংড়ি কোম্পানিতে কাজ করে কোনোভাবে টিকে ছিলেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সূত্রে আঁখির টেইলারিংয়ের কাজ শেখা এবং মেশিন পাওয়ার পর তাতে সেলাই শুরু করা এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতি তাঁদের জীবনটাই পাল্টে দিচ্ছে।
আনোয়ারা, আঁখির মা
বিজ্ঞাপন

আব্দুস সালাম মুর্শেদী বললেন, ‘ছোট আঁখির আন্তর্জাতিক যে অর্জন, তা শুধু খুলনার নয়, এটা পুরো বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছে। ব্যক্তিগত দায় থেকেই তার এ অর্জন যাতে টিকে থাকে, সে জন্য সহায়তা করতে চেয়েছি। এখন সে বাটারফ্লাই মেশিন দিয়ে সেলাই করে। এ মেশিন দিয়ে সে বেশি কিছু করতে পারবে না। তাই অত্যাধুনিক মেশিন দিয়েছি। এ মেশিন চালানোর জন্য তাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। আঁখিদের নিজেদের ঘর নেই। তাই তাদের থাকার ব্যবস্থা এবং মেশিন রাখার জন্য শেড তৈরিসহ অন্যান্য কাজেও সহায়তা করা হবে। আঁখি যাতে সরকারি খাসজমি পায়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি চাই আঁখি মেশিনগুলো দিয়ে একটি ছোট কারখানা গড়ে তুলুক। সে হবে নারী উদ্যোক্তা। অন্যান্যরা তার কারখানায় কাজ করবে।’

আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ‘জীবনের জন্য’ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের আবেদা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, আঁখি চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। বয়স বেশি বলে তাকে স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। সে নিজেই টেইলারিং প্রশিক্ষণ নিতে চায়।

আবেদা সুলতানা বললেন, ‘আঁখি কাজ খুব দ্রুত শিখে ফেলে। আমাদের শেখানোর পাশাপাশি সে নিজেই বাচ্চাদের ফ্রকসহ অন্যান্য পোশাকও তৈরি করা শুরু করে। মেশিন ও গজকাপড় দেওয়া হলে সে ব্যবসা শুরু করে। তার বড় বোন ও মা এ কাজে সহায়তা করেন। আর করোনার সময় তার মাস্ক তৈরির উদ্যোগ প্রশংসিত হয়। তারপর তো তার এ স্বীকৃতি। আঁখি এখন কারখানার লিডার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে তার বাড়িতে গণমাধ্যমের লোকসহ বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তির আনাগোনা লেগেই আছে।’

জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার পর আঁখি সম্পর্কে ইউএনওসিএইচএর ওয়েবসাইটেও আঁখির জীবনের গল্পটি তুলে ধরা হয়েছে।

মন্তব্য পড়ুন 0