আমাদের পতাকার রং লাল-সবুজ। কিন্তু প্রতিটি রঙেরই মাত্রাগত বেশ পার্থক্য রয়েছে। একই রং দেখতে কখনো গাঢ়, কখনো হালকা, আবার অনেক ক্ষেত্রে ফিকে। ফলে পাশাপাশি রাখলে প্রতিটি আলাদা দেখায়। যেমন সবুজ রঙের ক্ষেত্রেই বলা যায়, গাঢ় বা কালচে সবুজ, আবার কলাপাতা সবুজ, টিয়ে সবুজ, ফিকে সবুজ—এমন। লাল রঙের ক্ষেত্রেও এমন ভিন্নতা আছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির সভাপতি বিশিষ্ট কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় পতাকা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সংবিধিবদ্ধ নির্দেশিকা অনুসারেই জাতীয় পতাকা তৈরি করা উচিত। এর ব্যত্যয় করা হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করছি। এখন সঠিক মাপ ও রঙে জাতীয় পতাকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কীভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে? রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের জাতীয় পতাকা বিক্রেতা আইয়ুব চৌধুরীর সঙ্গে কথা হলো। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামে। ১৫ বছর ধরে তিনি জাতীয় পতাকা, নানা ধরনের ব্যাজ, পদক—এসবের ব্যবসা করেন। তিনি জানালেন, জাতীয় পতাকা তৈরির জন্য তাঁরা প্রধানত সুতি ও পলিয়েস্টার—এই দুই ধরনের কাপড় ব্যবহার করেন। রং তো সবাই জানে—লাল ও সবুজ। ইসলামপুরের পাইকারি বাজার থেকে থান কাপড় কিনে দরজির কাছ থেকে পতাকা তৈরি করান। একেক থানে রঙের কিছু পার্থক্য থাকে। আবার সুতি কাপড়ের সবুজ একটু গাঢ়, অর্থাৎ কালচে সবুজ হয়। তবে মোটের ওপর পতাকার রং লাল-সবুজই থাকে। সবাই এভাবেই তৈরি করে।

রাজধানী তো বটেই, সারা দেশে গ্রামগঞ্জে দরজির দোকানে যেভাবে জাতীয় পতাকা তৈরি হয়, তাতে রঙে হেরফের হচ্ছে—এটা বাস্তবতা বলে মন্তব্য করলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তিনি প্রথম আলোকে বললেন, জাতীয় পতাকার সঠিক মাপ ও রং নির্দিষ্ট করা আছে। সেভাবেই তৈরি হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এ বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো জনসচেতনতাই সৃষ্টি হয়নি। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে জাতীয় পতাকা তৈরির জন্য দরজিদের নিয়ে একটি কর্মশালা করা যেতে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান বা সদস্যরা এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ অনুযায়ী জাতীয় পতাকার মাপ ও রঙের সুনির্দিষ্ট বিবরণ রয়েছে। সেটিই অনুসরণ করা প্রয়োজন। এতে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় পতাকা গাঢ় সবুজ রঙের হবে এবং ১০: ৬ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তক্ষেত্রাকার সবুজ রঙের মাঝখানে একটি লাল বৃত্ত থাকবে। লাল বৃত্তটি পতাকার দৈর্ঘ্যের এক-পঞ্চমাংশ ব্যাসার্ধবিশিষ্ট হবে।’ এই পরিমাপের পাশাপাশি রঙের মাত্রা কেমন হবে, তা–ও নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। ‘পতাকার সবুজ পটভূমি হবে প্রতি হাজারে প্রোসিয়ন ব্রিলিয়ান্ট গ্রিন এইচ-২ আর এস ৫০ পার্টস এবং লাল বৃত্তাকার অংশ হবে প্রতি হাজারে প্রোসিয়ন ব্রিলিয়ান্ট অরেঞ্জ এইচ-২ আর এস ৬০ পার্টস।’

জাতীয় পতাকার মাপটি এখন প্রায় সবাই জানেন। লম্বা ১০ ফুট হলে প্রস্থ হবে ৬ ফুট বা লম্বা ১০ ইঞ্চি হলে প্রস্থ ৬ ইঞ্চি। লাল বৃত্ত পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক মফিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পতাকার মাপ নিয়ে এখন তেমন তারতম্য নেই। জাতীয় পতাকা কেমন হবে, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইতে তা সচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে রঙের ক্ষেত্রে অনেক সময় হেরফের হয়। এটা এড়াতে কেমন কাপড়, কোন মাত্রার রং ব্যবহার করতে হবে, তা সহজ করে প্রচার করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে তা নয়, বরং এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজেদেরই সচেতন হতে হবে। নাগরিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

জাতীয় পতাকার সঠিক রঙের প্রয়োগ নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।

অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন প্রথম আলোকে বললেন, জাতীয় পতাকায় রঙের সমন্বয় করা জরুরি। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে রঙের মাত্রার পরিবর্তন হয়। যেমন কাগজে ছাপা লাল রং দেখতে ম্যাজেন্টা মনে হয়। এতে হলুদের পরিমাণ কম থাকে।

রক্তিম লালের জন্য এতে হলুদের প্রাধান্য দিতে হয়। আবার কাপড়ের ভিন্নতায় রঙের ভিন্নতা আসে। সে কারণে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে রঙের ব্যবহার পরীক্ষা করতে হবে। বিধিবদ্ধভাবে যে নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেই রংটি কোন কাপড়ে সঠিক হচ্ছে, তা বাছাই করে পতাকার জন্য সেই কাপড় নির্ধারণ করতে হবে।

নিসার হোসেন বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাগুলোতে এই সঠিক রঙের পতাকার প্রচলন করা যেতে পারে। পরে ধাপে ধাপে সব ক্ষেত্রে সঠিক রং প্রয়োগের বিষয়ে কাজ করতে হবে। এ নিয়ে চারুকলা অনুষদ রং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টসের সঙ্গে কাজ করছে। তিনি জানালেন, এ বিষয়ে একটি গণসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালানো হবে। প্রথম আলো এতে সহযোগী ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন