বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আত্মহত্যার চেষ্টা করা ২০৮ জন রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন। এর মধ্যে ১১৪ জন নারী ও ৯৪ জন পুরুষ।

জেলার সচেতন নাগরিকেরা আত্মহত্যার এই প্রবণতাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলছেন। তাঁরা এই প্রবণতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন।

জয়পুরহাট মহাবিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, করোনার কারণে সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। পারিবারিক কলহ বেড়েছে। এ কারণে সব মিলিয়ে আত্মহত্যা বেড়ে গেছে। আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, জয়পুরহাটে মানসিক রোগ ও পারিবারিক কলহে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। গত আট মাসে জেলায় মানসিক রোগ থেকে ২৩ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক কলহে ২২ জন, পরিবারের ওপর অভিমান করে ১১ জন, অভাব ও ঋণের দায়ে ৩ জন, প্রেমঘটিত কারণে ২ জন, মাদক না পেয়ে ২ জন, হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামি হওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ২ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া চাকরি না হওয়ায় অভিমান করে জন ও অসুস্থতায় ১ জন আত্মহত্যা করেছেন। সন্তান না হওয়ায় আত্মহত্যা করেছেন এক নারী। তবে ২ জনের আত্মহত্যার কারণ জানা যায়নি। তিনজনের আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মাছুম আহম্মেদ ভূঞা আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর জন্য প্রধানত তিনটি কারণকে দায়ী করছেন। তাঁর মতে, করোনাকালে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের মানসিক বৈকল্য তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া মা–বাবার সঙ্গে সন্তানের বোঝাপড়ার দূরত্ব বেড়ে গেছে। এসব কারণে আত্মহত্যা বাড়ছে।

জয়পুরহাটে গত আট মাসের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আত্মহত্যার প্রবণতা কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেশি। আত্মহত্যা করা ৩২ নারীর মধ্যে অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের মধ্যে। পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবক আত্মহত্যা করেছেন ১৫ জন। কিশোর আত্মহত্যা করেছে ৭ জন। অধিকাংশই গলায় ফাঁস ও কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করেছেন।

কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ডিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক মাহবুবা সরকার দিন কয়েক আগের একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২ সেপ্টেম্বর তাঁর পরিচিত ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন, মোবাইল ফোন চালানো নিয়ে ওই কিশোরীর বড় ভাই তাকে বকাঝকা করেছিলেন। এ জন্য সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার এক প্রতিনিধি বলেন, করোনাকালে জয়পুরহাটে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। বিয়ের পরের পরিবেশ-পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার সক্ষমতা কিশোরীদের নেই। এতে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনাবনি না হওয়ায় পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। এসব কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা আত্মহত্যা রোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু জেলায় আত্মহত্যা রোধে সরকারি-বেসরকারি কোনো কর্মসূচি নেই। তবে ব্র্যাকসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতা রোধে কাজ করছে। জেলায় আত্মহত্যার কোনো ঘটনা ঘটলে তারা কারণ বিশ্লেষণ করে।

জেলায় গত দেড় বছরে প্রায় ৫০টি আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করেছে ব্র্যাক। ব্র্যাকের সিনিয়র জেলা ব্যবস্থাপক সেলিম মিয়া বলেন, পারিবারিক নির্যাতন, দারিদ্র্য, প্রেমঘটিত ব্যাপার, অসুস্থতা ও সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। বেশ কিছু আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগে থেকে কাউন্সেলিং করলে তাঁরা বেঁচে যেতেন।

জয়পুরহাটে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে মানসিক রোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। কিন্তু জেলায় সরকারিভাবে মানসিক রোগের চিকিৎসা নেই। জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) মো. শহীদ হোসেন অবশ্য বলেন, ‘আত্মহত্যাকারীর বেশির ভাগ মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন, ঠিক এভাবে বলা যাবে না।’

শহীদ হোসেনের মতে, কিশোর-কিশোরীরা আত্মহত্যা করে আবেগের বশে। দেখা যায়, মা–বাবার সঙ্গে অভিমান করে, প্রেমের সম্পর্কে ফাটল ধরলে বা ব্যর্থ হলে কিংবা অন্য কোনো তুচ্ছ কারণে তারা আত্মহত্যা করে। এ ক্ষেত্রে সন্তানদের প্রতি বাবা, মা ও অভিভাবকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

পাঁচবিবি উপজেলার দরগাপাড়ার ষাটোর্ধ্ব নাসির উদ্দিন দুই মাস আগে মানসিক রোগ থেকে আত্মহত্যা করেন। তাঁকে কয়েকবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা করা হয়েছিল। নাসির উদ্দিনের ছেলে মজুর আলী বলেন, যাতায়াতের সমস্যার কারণে তাঁর বাবার চিকিৎসা ঠিকমতো করাতে পারেননি।

জয়পুরহাটের সিভিল সাজন ওয়াজেদ আলী বলেন, দিন দিন মানসিক চাপ বাড়লেও মানসিক চিকিৎসার বিষয়টি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। জেলাপর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় গুরুত্বের সঙ্গে মানসিক রোগের চিকিৎসক দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন