বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঝুমন দাশের (২৭) বড় ভাই নূপুর দাশ বলেন, ‘ভাত-কাপড় জোগাড় করাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর এখন ভাইয়ের মামলার পেছনে টাকা খরচ করতে হয়। কত দিন এভাবে চলবে, তা জানি না।’

সুইটি-নূপুরসহ পরিবারের সবাই আশায় আছেন, ঝুমন দাশ শিগগির জামিন পাবেন। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে পরিবারের হাল ধরবেন।

ঝুমন দাশের উপার্জনে সংসার চলত। কিন্তু তিনি ছয় মাস ধরে কারাগারে থাকায় সংসারের অভাব-অনটন পিছু ছাড়ছে না বলে জানান সুইটি। তার ওপর ছেলে সৌম্যের পেছনে আছে নানান খরচ।

গত শুক্রবার দুপুরে সুইটি টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই দিন পরপর ছেলের জ্বর, সর্দি হয়। ছেলের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সেখানে ওষুধ কিনতে হলে তো আর কথাই নেই। শ্বশুরবাড়িতে থাকি। তাই ছেলেকে নিয়ে কোথায় থাকব, সেই চিন্তা নেই। মানবাধিকারকর্মীসহ কয়েকজন কিছু সহায়তা দেন। কিন্তু তা দিয়ে চলে না। টাকা ধার করে চলতে হয়। লোকেই-বা আর কত দিন ধার দেবে?’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে গত ১৫ মার্চ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা শহরে আয়োজিত এক সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী ও মামুনুল হক বক্তব্য দেন। মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেন বলে অভিযোগ ওঠে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হাবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক ঝুমন দাশের বিরুদ্ধে। ১৬ মার্চ ঝুমনকে আটক করে পুলিশে দেন গ্রামবাসী। তাঁকে ১৭ মার্চ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এদিকে, ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ১৭ মার্চ নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেদিন শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের প্রায় ৯০টি বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালায়।

নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার ঘটনায় শাল্লা থানায় মামলা হয়। অন্যদিকে, ঝুমন দাশের বিরুদ্ধে শাল্লা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। এই মামলার বাদী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবদুল করিম।

ঝুমনের স্ত্রী সুইটি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে হামলা করার অভিযোগে যাঁরা গ্রেপ্তার হলেন, তাঁরা সবাই জামিন পেয়েছেন। আর আমার স্বামী এখনো কারাগারে।’

default-image

সুনামগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী দেবাংশু শেখর দাশ ঝুমনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার আইনজীবী। তিনি টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঝুমনের জামিন আবেদন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আছে। মানবিকতার খাতিরে হলেও ঝুমনের জামিন পাওয়ার অধিকার আছে। এবারেরটি নিয়ে মোট সাতবার তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করা হলো।’

আইনজীবী দেবাংশু শেখর বলেন, গ্রামে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগে পুলিশের করা মামলার আসামিরা এখন জামিনে আছেন। অথচ ঝুমন ছয় মাস ধরে কারাগারে আছেন।

পাল্টে গেছে সুইটির জীবন

ঝুমনকে পছন্দ করে ২০১৯ সালের মে মাসে বিয়ে করেন সুইটি। পছন্দের এই বিয়ে মানতে পারেনি সুইটির পরিবার। ঝুমন ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছিলেন। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে না থাকলেও সুখে ছিলেন বলে জানান সুইটি। কিন্তু হুট করে ঝুমন কারাগারে যাওয়ায় সুইটি জীবন পাল্টে গেছে।

default-image

স্বামীর কারাগারে যাওয়া প্রসঙ্গে সুইটি বললেন, ‘ঝুমন কী অপরাধ করেছেন, কেন তাঁকে ছয় মাস ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

ঝুমনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে পরিবারের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছে বলে জানান সুইটি। তিনি বলেন, ‘কোর্ট-কাছারিতে যাওয়ার জন্য গাড়িভাড়ার টাকাও মানুষের কাছ থেকে ধার করতে হয়।’

সুইটি বলেন, ‘ঢাকার বড় আইনজীবী জেড আই খান পান্না স্যার বলেছেন, বিনা পয়সায় আমার স্বামীর জামিনের জন্য তিনি চেষ্টা করবেন। এখন আমি আমার স্বামীর জামিনের জন্য অপেক্ষায় দিন গুনছি। ঝুমনের জামিন না হলে আমাকে আর আমার ছেলেকেও কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।’

সুইটি বলেন, ‘আমি আর আমার ছেলে কারাগারের বাইরে থাকলেও পৃথিবীটা কারাগারের মতোই মনে লাগছে। আমি এখন শুধু আমার স্বামীর নিঃশর্ত মুক্তি চাই। আমার স্বামীকে নাকি তাঁর নিরাপত্তার জন্যই কারাগারে আটকে রাখা হচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে শুনছি। আমাদের কি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকারটুকুও নেই?’

সুইটি জানান, তাঁর স্বামী ব্যবসার জন্য ৪০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন। মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা করে ঋণ শোধ করতে হয়। কিন্তু এখন তাঁদের সামনে-পেছনে সবদিকেই বিপদ। চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।

সুইটি বলেন, ‘আমি এখনো আশাবাদী যে ঝুমন ন্যায়বিচার পাবেন। সত্য ধ্বংস হয় না। একদিন না একদিন সত্য বেরিয়ে আসেই।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আদালতে ঝুমন দাশের মামলায় আইনি সহায়তা দেবেন।

default-image

মামলায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঝুমন দাশের মামলায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হওয়ার কথা। মামুনুল হককে নিয়ে বিতর্ক, পুলিশের তড়িঘড়ি করে ঝুমন দাশকে গ্রেপ্তার করা, ভাঙচুরের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিন, ঝুমন দাশের এখনো জামিন না হওয়া—সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, আইনের প্রয়োগ করা হয়েছে বিশেষ অবস্থান বিবেচনা করে, যা আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। আইনের ভাষায় যে পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা, তা না করে আইন প্রয়োগ করা হলে তা হবে আইনের চরম বরখেলাপ।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু ঝুমন দাশের ক্ষেত্রেই নয়, সবার ক্ষেত্রেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার সময় সব নিয়ম মেনেই করা উচিত। মামলা করার প্রক্রিয়া যথাযথ না হলে বা কোনো ব্যত্যয় হলে তা আদালত দেখবেন।’

ঝুমনের মুক্তির দাবি

ঢাকা, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিতে ঝুমন দাশের মুক্তির দাবি জানানো হচ্ছে।

গত ২৩ মার্চ রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছেলের মুক্তি চান নীভা রানী দাশ।

গত ৪ জুন এক বিবৃতিতে ঝুমন দাশের মুক্তি দাবি করেন দেশের ২৪ বিশিষ্ট নাগরিক।

১৩ সেপ্টেম্বর ঝুমন দাশের মুক্তি দাবি করেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা। অবিলম্বে ঝুমনকে মুক্তি দেওয়া না হলে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন তাঁরা।

১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর মতামত পাতায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল ‘নিরাপত্তার জন্য ঝুমন দাশকে বন্দীই রাখতে হবে?’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ লেখেন।

রাজধানীর শাহবাগে ঝুমন দাশের মুক্তি দাবিতে একাধিক দিন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

ঝুমন দাশের বড় ভাই নূপুর দাশ বলেন, ‘ঝুমনের স্ত্রী ও ছেলে এখন আমাদের বাড়িতে আছে। বাড়ির সবাই আতঙ্কে আছেন। ঘটনার প্রথম দিকে সরকারের লোকজনসহ অনেকেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আস্তে আস্তে তা কমে আসছে। আমরা দ্রুত ঝুমনের মুক্তি চাই।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন