নতুন বেতনকাঠামো: প্রজ্ঞাপন জারি

টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ছাড়াই নতুন বেতন

বিজ্ঞাপন
default-image

বিজয় দিবসের ঠিক আগের দিন গতকাল মঙ্গলবার দেশের সকল পর্যায়ের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করল সরকার। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপনও জারি হলো। বহুল আলোচিত টাইম স্কেল ও সিলেকশন বাদ রেখেই জারি করা হলো এ প্রজ্ঞাপন।
সচিবালয়ে রাত আটটার দিকে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আলী খান প্রজ্ঞাপনের কপি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের হাতে তুলে দেন। অর্থমন্ত্রী এ সময় তা সাংবাদিকদের দেখান। সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিজয় দিবসের শুভেচ্ছাস্বরূপ গতকাল তা প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিক্রিয়া জানান অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করতে এবার একটু দেরি হয়েছে এবং এটা তাঁর কারণেই হয়েছে। তিনি জানান, বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি কিছুদিন পরে জারি করা হবে।
নতুন কাঠামোতে প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত) ও সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা করা হয়েছে। এত দিন সরকারি চাকরিজীবীরা সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন ৪ হাজার ১০০ টাকা মূল বেতন পেয়ে আসছেন।
নতুন কাঠামো কার্যকর করতে চলতি বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানান মুহিত।
অর্থমন্ত্রী বলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদই থাকল। তবে যাঁরা এ সুবিধা আশা করেন, তাঁদের হতাশ হওয়ারও কারণ নেই। ব্যাখ্যা দিয়ে মুহিত বলেন, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং ১০ বছর পর একটি ও ১৬ বছর পর আরেকটি পদোন্নতি দেওয়া হবে তাঁদের। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, এবারের বেতন কাঠামোর মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীরা খুশি হবেন।
নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হবে গত ১ জুলাই থেকে। অর্থমন্ত্রী বলেন, চাকরিজীবীরা ডিসেম্বরের বেতন নতুন কাঠামোতে পাবেন। এর সঙ্গে তাঁরা পাঁচ মাসের বকেয়া বেতনের অর্ধেক পাবেন। বেতনের বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে তাঁদের জানুয়ারির বেতনের সঙ্গে। আর ভাতা দেওয়া হবে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথা ছিল যাঁরা কম বেতনে চাকরি করেন, তাঁদের জন্য। সেটা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বেতনকাঠামো করার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে তাঁরা নমনীয় হন। নতুন বেতনকাঠামোতে তাঁদের সুযোগ-সুবিধাও কমানো হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন ২০টি গ্রেডে বেতন দেওয়া হলেও দিনে দিনে এটি থাকবে না। ভবিষ্যতে এই গ্রেড কমবে বলে তিনি নিশ্চিত।
গত ৭ সেপ্টেম্বর এই নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। তার আগে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেয় মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন ও চাকরি কমিশন। সর্বশেষ ছয় বছর আগে ২০০৯ সালের ২ ডিসেম্বর জাতীয় বেতনকাঠামো ২০০৯-এর প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়।
নতুনকাঠামো অনুযায়ী চলতি বছরে শুধু মূল বেতন পাবেন চাকরিজীবীরা। গ্রেড-১-এর কর্মকর্তাদের মূল বেতন হলো ৭৮ হাজার টাকা, গ্রেড-২-এর ৬৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৩-এর ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-৪-এর ৫০ হাজার টাকা, গ্রেড-৫-এর ৪৩ হাজার টাকা, গ্রেড-৬-এর ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-৭-এর ২৯ হাজার টাকা, গ্রেড-৮-এর ২৩ হাজার টাকা, গ্রেড-৯-এর ২২ হাজার টাকা, গ্রেড-১০-এর ১৬ হাজার টাকা, গ্রেড-১১-এর ১২ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-১২-এর ১১ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৩-এর ১১ হাজার টাকা, গ্রেড-১৪-এর ১০ হাজার ২০০ টাকা, গ্রেড-১৫-এর ৯ হাজার ৭০০ টাকা, গ্রেড-১৬-এর ৯ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৭-এর ৯ হাজার, গ্রেড-১৮-এর ৮ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-১৯-এর ৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-২০-এর মূল বেতন হলো ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এত দিন সবার মূল বেতন কমবেশি নতুন কাঠামোর অর্ধেক ছিল।
নতুন বেতনকাঠামোতে ২০টি গ্রেড ছাড়াও দুটি বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবদের মূল বেতন হবে ৮৬ হাজার টাকা এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের বেতন হবে ৮২ হাজার টাকা। তিন বাহিনীর প্রধানেরা মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের সমান বেতন পাবেন। আর জ্যেষ্ঠ সচিবের সমান বেতন পাবেন লে. জেনারেল ও সমপদমর্যাদার সামরিক কর্মকর্তারা। জাতীয় অধ্যাপকেরা জ্যেষ্ঠ সচিবদের সমান বেতন পাবেন।

এ ছাড়া বিসিএস গ্যাজেটেড কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে অষ্টম গ্রেডে বেতন পাবেন। এটা নতুন চালু করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা নবম গ্রেডে চাকরিজীবন শুরু করেন। নতুন কাঠামোতে বিসিএস নন-গেজেটেড কর্মকর্তারা বেতন পাবেন নবম গ্রেড থেকে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ক্ষেত্রে নতুন বেতনকাঠামো প্রযোজ্য হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা আগের মতোই থাকবে। আর এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেবে, এরপর অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
নতুন বেতনকাঠামোতে শ্রেণি (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ নিজ গ্রেড দিয়েই পরিচিত হবেন। নতুন স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ওপর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবছরের ১ জুলাই সবার জন্য একই সঙ্গে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে। এর মধ্যে ২০ থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে মূল বেতনের ৫ শতাংশ। পঞ্চম গ্রেডে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৪ শতাংশ। ৩ ও ৪ নম্বর গ্রেডে প্রবৃদ্ধি হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড ২-এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে ১ নম্বর গ্রেডে প্রবৃদ্ধি হবে না। এই হিসাবে কারও মূল বেতন ১০ হাজার টাকা হলে এক বছরে তাঁর ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে ৫০০ টাকা। প্রথম বছর শেষে ওই ব্যক্তির প্রবৃদ্ধিসহ বেতন দাঁড়াবে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। যেহেতু চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে, তাই দ্বিতীয় বছরে ওই ১০ হাজার ৫০০ টাকার ওপর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে। এভাবে প্রতিবছরই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
নতুন কাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, শিক্ষক, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের জন্য বাংলা নববর্ষ ভাতা চালু করা হয়েছে। এই ভাতা হবে মূল বেতনের ২০ শতাংশ। প্রেষণ ভাতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, সব কর্মচারী প্রতি মাসে এক হাজার ৫০০ টাকা হারে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও এ ভাতা পাবেন ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। তবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী অবসরভোগীরা চিকিৎসা ভাতা পাবেন ২ হাজার ৫০০ টাকা করে।
সরকারি বাসায় যাঁরা থাকেন, বর্তমানে মূল বেতনের ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ তাঁদের কাছ থেকে বাড়ি ভাড়া কেটে নেওয়া হয়। এই পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। তবে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সরকারি চাকরিজীবী হলে যাঁর নামে বাসা বরাদ্দ রয়েছে, তাঁর বেতন থেকে বাড়িভাড়া কেটে নেওয়া হবে। অন্যজন বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া পাবেন।
কর্মচারীদের সন্তানদের মাসে ৫০০ টাকা করে শিক্ষা-সহায়ক ভাতা দেওয়া হবে (অনধিক ২ সন্তানের জন্য ১ হাজার টাকা)। প্রতিষ্ঠান থেকে দুপুরের খাবার বা লাঞ্চ ভাতা দেওয়া না হলে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের মাসে ২০০ টাকা হারে টিফিন ভাতা দেওয়া হবে।
আয়করের আওতায় থাকা কর্মচারীদের আয়কর পরিশোধ ও আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
মাসিক নিট পেনশনপ্রাপ্ত অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগী ৬৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের নিট পেনশনের পরিমাণ ৫০ শতাংশ এবং অন্যদের পেনশন ৪০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের নিট পেনশনের পরিমাণ হবে সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা। আপ্যায়ন ভাতা প্রতি মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ২ হাজার, জ্যেষ্ঠ সচিব ১ হাজার, অতিরিক্ত সচিব ৯০০ এবং যুগ্ম সচিবেরা ৬০০ টাকা করে পাবেন।
অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব জিনিসের দাম কম থাকায় এবং দেশীয় বাজারও ভালো থাকায় এই বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আর নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের জন্য নতুন করে টাকারও সংস্থান করতে হবে না। কারণ, বাজেটেই এই টাকা বরাদ্দ রাখা আছে।
এক প্রশ্নের জবাবে অর্থসচিব বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ কারও জন্যই স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো করার পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন