বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আপনি শিক্ষকতা করতে করতে বিজ্ঞান গবেষণায় চলে এলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী হিসেবে এ সিদ্ধান্ত কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

ফেরদৌসী কাদরী: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম। যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। ছয় বছর শিক্ষকতা করেছি। এরপর আইসিডিডিআরবিতে পোস্ট ডক্টর‌াল করার সুযোগ পেলাম। এরপর এখানে কাজেরও সুযোগ এল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দেব, এটা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ছিল। অনেকেই শিক্ষকতার পাশাপাশি এখানে গবেষণা চালিয়ে নিতে বলল। কিন্তু আমি যেখানে কাজ করব, সেখানে শতভাগ দিতে চেয়েছি। আইসিডিডিআরবিতে যোগ দিলাম ১৯৮৮ সালে। তখন দেশে গবেষণার প্রতিষ্ঠান ছিল হাতে গোনা। পেশা হিসেবে গবেষণাকে বেছে নেওয়া বড় সিদ্ধান্তই ছিল। আইসিডিডিআরবির কাছে আমি ঋণী। ‘তুমি খুঁজে নাও, তুমি পাবে’—এটাই আমার জীবনের মূলমন্ত্র। এভাবেই হাসপাতাল, পরীক্ষাগার, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা—সব নিয়ে আমি আজকের ফেরদৌসী কাদরী।

প্রথম আলো: বাংলাদেশে নারীদের বিজ্ঞানচর্চার পরিস্থিতি এখন কেমন?

ফেরদৌসী কাদরী: কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাড়েনি। পুরুষের ক্ষেত্রেও বেড়েছে, তা–ও কিন্তু নয়। বিজ্ঞানের পথ দুর্গম। এখানে বিশেষ অর্থকড়িও নেই। কিন্তু এখন বাস্তবতার কারণেই অর্থকড়ি নিয়ে ভাবতে হয়। এখন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থী অনেক আছে। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করাই সবকিছু না। নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসতে হবে। নারীদের জন্য পরামর্শ, পছন্দ ঠিক করতে হবে আগে। ব্যর্থতা আসতে পারে। কিন্তু সাহস দেখাতে হবে। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব, বিজ্ঞানকে উৎসাহিত করা।

* কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি অনেক বেড়েছে, কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণার শাখায় বাড়েনি। * বিজ্ঞান গবেষণার ইতিবাচক ফল সম্পর্কে শিশুদের জানাতে হবে, উদাহরণ দিতে হবে। * মাস্ক টিকার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। * যত দিন বেঁচে থাকব, মানুষের কল্যাণে টিকা এবং এর গবেষণা চালিয়ে যাব।

প্রথম আলো: কলেরার টিকা নিয়ে গবেষণা, সাশ্রয়ী দামে টিকা সহজলভ্য করা, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে কলেরার সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা করা—এসব কাজের সফল বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব কাজের পেছনে আপনার অনুপ্রেরণার উৎস কোথায়?

ফেরদৌসী কাদরী: আমি আসলে বাংলাদেশকে অনেক ভালোবাসি। সৌভাগ্য, আমার এ দেশে জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন করেছে। কিন্তু এখনো রোগ নিরাময়, টিকা, গবেষণা—এসবের ঘাটতি আছে। মানুষের এই অমিত চাহিদাই আমাকে কাজে উৎসাহ জোগায়। এসব নিয়ে আমি একা না, আমার পুরো দল একসঙ্গে কাজ করছি।

রোহিঙ্গাদের কলেরার টিকা দেওয়ার কাজ বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে হয়েছে। আমরা জানতাম, কক্সবাজার এলাকাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে কলেরাপ্রবণ এলাকার একটি। আমরা আইইডিসিআরের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করছিলাম। রোহিঙ্গারা আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিষয়টি সরকারকে জানিয়েছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে এসব তথ্য দিয়েছি। এরপর চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে চার্টার্ড বিমানে ছয় দিনের মধ্যে টিকা এল। বিমানবন্দর থেকেই কক্সবাজারে গেল বেশির ভাগ টিকা। ছয় দিনের মধ্যে বিপুল মানুষকে টিকা দেওয়া হলো।

প্রথম আলো: র‌্যামন ম্যাগসাইসাই কমিটির আয়োজনে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আপনি বলেছেন, কাজের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঘরের দায়িত্ব উপেক্ষা করা যাবে না। ঘর-বাহির একসঙ্গে মেলানোর উপায় কী?

ফেরদৌসী কাদরী: নারীরা নানা কাজ একসঙ্গে করতে পারে। এটা তাদের জন্মগত এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। আমিও পারি। এখন আমি অনেকটা সফল, তাই হয়তো মনে হয় জীবনে সবকিছু সহজে হয়ে গেছে। আসলে তা না। অনেক কাজে বাধা পেয়েছি। কিন্তু পরিবারের সহযোগিতা ছিল। আমার দৈনন্দিন জীবনটা ছিল, সকালে বাচ্চাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে আসতাম। আমার স্বামী ওদের বাড়ি নিয়ে যেত। চেষ্টা করতাম, একটি সেকেন্ডও যেন নষ্ট না হয়। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সন্তানদের শিখিয়েছিলাম, যা দেবে তা–ই খেতে হবে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে এসে আমরা একেবারে রাতের খাবার খেয়ে নিতাম। এরপর খাবার টেবিলটা পরিষ্কার করে সেখানেই বাচ্চাদের নিয়ে পড়তে বসে যেতাম। ওদের পড়াতাম, গল্প করতাম। রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তাম।

হয়তো আমি অত বেশি ভালো রান্না করিনি, ঘর গোছাইনি। কিন্তু কাজটা বেশি করেছি। নারীদের বলি, ‘তুমি মনে করবে না সবটা খুব ভালো করে করতে পারবে। নিজের দায়িত্বটা পালন করবে। আর সন্তানদের ঘনিষ্ঠ থাকবে, আগলিয়ে রাখবে। পরিবার খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ আমি যখন আইসিডিডিআরবির ভেতরে ঢুকতাম তখন মনে করতাম, জীবনটা আলাদা। এখানে কাজ ছাড়া কোনো ভাবনা নেই।

এভাবে জীবনযাপনে অনেকের অনেক কথা শুনেছি। প্রতিবেশীরা বলত, আপনার বাচ্চারা কীভাবে মানুষ হবে। আপনি তো সময়ই দেন না। কষ্ট লাগত এসব শুনে। কিন্তু বাচ্চারা মানুষ হলো, পরিবার ঠিক থাকল। আমার কাজও তো হলো। এখনো চলছে।

প্রথম আলো: বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার কথা আপনি বলে থাকেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান-গবেষণাকে গণমুখী করার জন্য কী করা দরকার?

ফেরদৌসী কাদরী: বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা এখানে কম। বিজ্ঞান নিয়ে শিশুদের মধ্যে স্বপ্ন তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞান গবেষণার ইতিবাচক ফল সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে, উদাহরণ দিতে হবে। শুধু টাকাপয়সার লাভ নয়, বিজ্ঞান জানলে বা বুঝলে কী লাভ, সেটা তাদের বোঝানো দরকার।

আমাদের ছোটবেলার জীবনে চাহিদা এত বেশি ছিল না। জীবন এত ব্যয়বহুল ছিল না। বড় বিনোদন ছিল খালা-ফুফুর বাড়িতে যাওয়া। কক্সবাজার বছরে একবার গেলে বিশাল ব্যাপার মনে হতো। এখন চাহিদাটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন আমরা সবচেয়ে ভালো জিনিস, দামি জিনিস কিনতে চাই। আমরা ঈদে একটি-দুটি কাপড় পেতাম। বছরে ওই একবারই। আমাদের মূল্যবোধটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। এমন জীবনযাপনে শিশুদেরও মাথায় বড় হয়ে শুধুই উপার্জনের চিন্তা ঢুকে থাকে। এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। এর পরিবর্তন দরকার।

প্রথম আলো: ধনী-দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল ও উন্নত বিশ্বের মধ্যে দূরত্বের বিষয়টি এই করোনাকালে আবারও অনুভূত হলো, বিশেষ করে টিকার ক্ষেত্রে। আবার টিকার ন্যায্য বণ্টনে বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মতো উদাহরণও আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিজ্ঞানীদের কি এসব ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কোনো ভূমিকা রাখার আছে?

ফেরদৌসী কাদরী: বিজ্ঞানীদের এ ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব আছে। উন্নয়নশীল দেশের বিজ্ঞানীরা শুধু নয়, উন্নত দেশের বিজ্ঞানীরাও টিকাকেন্দ্রিক বৈষম্য নিয়ে সরব হয়েছেন। কিছু উন্নত দেশ টিকা ফেলে দিচ্ছে। টিকা নিয়ে পশ্চিমা কিছু দেশ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এটি সহ্য করা যায় না। এতে পাশ্চাত্যের ওপর আমাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। একটি বিষয় বুঝতে হবে, যদি একটি মানুষেরও কোভিড-১৯ থাকে, তবে বিশ্বের কোনো প্রান্তের মানুষ ভালো থাকবে না। আমাদের সরকার এটা বুঝতে পারছে। তারা টিকা সংগ্রহের জোর চেষ্টা করছে। আমরা পোশাক খাতে, কৃষিতে যত ভালো করেছি, টিকার ক্ষেত্রেও তা করতে হবে।

প্রথম আলো: দেশে করোনার প্রকোপ কমছে। সরকার ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার কথা বলছে, কোন সময়সীমার মধ্যে এই টিকা দিতে পারলে তা বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করেন?

ফেরদৌসী কাদরী: আমি আশাবাদী মানুষ। তবে ৮০ ভাগ মানুষকে এত দ্রুত টিকা দেওয়া সম্ভব কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। করোনা সংক্রমণ
কমে যাওয়াটা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু করোনার ডেলটা ধরনের ভয়াবহতার পর আমি আর আশাবাদী নই। যদি টিকা দেওয়ার হার না বাড়াই, তবে নতুন কোনো ঝড় আসতে পারে।

প্রথম আলো: ফেব্রুয়ারিতে গণটিকাদান শুরু হলো। শুরুতে টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বয়স্ক। তাঁদের কি এখন বুস্টার ডোজ দেওয়ার প্রয়োজন আছে?

ফেরদৌসী কাদরী: সবাইকে দুটি ডোজ আগে দিতে হবে। তারপর বুস্টারের প্রশ্ন। যাঁদের রোগ প্রতিরোধের শক্তি কম, বয়স্ক ব্যক্তি, তাঁরা বুস্টারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। সবার আগে অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হবে। এখনো কোনো গবেষণায় বলছে না, যাঁরা দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন, তাঁরা অরক্ষিত থাকছেন। নতুন ধরন এলে সেটা তো ভিন্ন বিষয়। কোনো টিকা নিয়েই বলা যায় না তা করোনার নতুন ধরনের সঙ্গে লড়তে পারবে।

প্রথম আলো: আপনি বলেছেন, করোনার ডেলটার মতো ধরন আর যে আসবে না, এর নিশ্চয়তা নেই। নতুন বিপদ সামলাতে আমাদের দেশে বা আন্তর্জাতিকভাবে কী করা প্রয়োজন?

ফেরদৌসী কাদরী: প্রথম কথা হলো সবাইকে টিকা দিতে হবে। অন্তত ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত। আর মাস্কের ব্যবহার অবশ্যই ভুললে চলবে না। মাস্ক টিকার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামাজিক দূরত্বটা মেনে চলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বড় বড় দাওয়াতে যাওয়া আপাতত বন্ধ করে দেওয়া উচিত। নিয়মগুলো মানতে হবে।

প্রথম আলো: আমৃত্যু বিজ্ঞানের গবেষণায়, মানুষের মঙ্গলে কাজ করার জন্য আপনি আপনার প্রত্যয়ের কথা বলেছেন। জনস্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো কী? এ ক্ষেত্রে আপনার নিজের স্বপ্ন কী?

ফেরদৌসী কাদরী: জনস্বাস্থ্য নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের জনসংখ্যা। মানুষ বেশি, তাই অসুখের আশঙ্কাও বেশি। আর আছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বড় সমস্যায় টিকা দিয়ে সুরক্ষা দিতে হবে। দেশের মানুষকে সুস্থ রাখাটা দরকার, নইলে তারা কাজ করতে পারবে না। চাই উন্নততর গবেষণা ও গবেষণার যন্ত্রপাতি, যাতে পাশ্চাত্যের মুখাপেক্ষী থাকতে না হয়। নতুন প্রজন্মকে সেদিকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমি আছি তাদের সঙ্গে।

আমার স্বপ্ন হলো, যত দিন বেঁচে থাকব, মানুষের কল্যাণে টিকা এবং এর গবেষণা চালিয়ে যাব। আমি চাই, আমাদের দেশে উন্নতমানের রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা ভালো হলে মানুষের স্বাস্থ্যের মানও উন্নত হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন